Ajker Patrika

মন যখন কাঁদে, শরীর তখন কেমন থাকে

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
মন যখন কাঁদে, শরীর তখন কেমন থাকে
তীব্র শোকের সময় মানসিক যন্ত্রণার চেয়ে শারীরিক উপসর্গগুলো অনেক সময় বেশি প্রকট হয়ে ধরা দেয়। ছবি: পেক্সেলস

হুমায়ূন আহমেদের লেখা একটি জনপ্রিয় গান, ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়...’। বর্ষাকাল না হলেও চলছে বৃষ্টি। এসব মেঘলা দিনে মানুষের মন অকারণেই খারাপ হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ রোমান্টিকতাও অনুভব করেন। এই তো গেল ঋতুভিত্তিক মন খারাপের গল্প। তবে, মন যখন কাঁদে, শরীর তখন কেমন থাকে— ভেবে দেখেছেন কখনো?

আবহাওয়ার সঙ্গে যেমন মনের ভালো-খারাপ থাকা মিশে থাকে, তেমনই মন খারাপের সঙ্গে শরীর খারাপের একটা যোগসূত্র আছে। শোক বা প্রিয়জন হারানোর বেদনাকে আমরা সাধারণত নিছক এক মানসিক যন্ত্রণা হিসেবে দেখে থাকি। কিন্তু সত্য এই যে শোক কেবল মনের কোণে জমা হওয়া কোনো দীর্ঘশ্বাস নয়, এটি আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে আছড়ে পড়া এক তীব্র ঝড়ের নাম। যখন আমরা কোনো গভীর মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যাই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীর কিছু প্রতিক্রিয়া দেখায়; যা নিয়ন্ত্রণ করা সাধারণ অবস্থায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের ভাষায়, তীব্র শোকের সময় মানসিক যন্ত্রণার চেয়ে শারীরিক উপসর্গগুলো অনেক সময় বেশি প্রকট হয়ে ধরা দেয়।

শরীরের ওপর শোকের নীরব আক্রমণ

শোক যখন দেহে বাসা বাঁধে, তখন সেটি বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এর প্রভাবগুলো শুধু ক্লান্তি বা চোখের জলে সীমাবদ্ধ নয়। শরীরে যা হয়—

পেশি ও হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথা

মানসিক ব্যথার সময় আমাদের শরীর অবচেতনভাবে একধরনের আত্মরক্ষামূলক ভঙ্গি গ্রহণ করে। ফলে পেশিতে প্রচণ্ড টান তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই টান বা টেনশন থাকার ফলে ঘাড়, পিঠ এবং হাড়ের বিভিন্ন জোড়ায় দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা দেখা দেয়।

মাইগ্রেন ও তীব্র মাথাব্যথা

ট্র্যাজেডি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম ফর সারভাইভার্সের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপের কারণে আমাদের রক্তসংবহনতন্ত্র রক্তনালিগুলোকে অতিরিক্ত প্রসারিত করে ফেলে। এর ফলে পার্শ্ববর্তী টিস্যুগুলোতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপ থেকে শুরু হয় অসহ্য মাইগ্রেন। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব কিংবা আলো ও শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতাও দেখা দিতে পারে।

প্রদাহ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শোক শরীরে ইনফ্লামেশন বা প্রদাহের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে রক্তে কর্টিকোস্টেরয়েড নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যাওয়ায় শ্বেত রক্তকণিকার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি খুব সহজে সাধারণ সর্দি-কাশি বা ভাইরাসে আক্রান্ত হন।

হৃৎপিণ্ডের ঝুঁকি ও ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম

হার্ভার্ড হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শোকের কারণে হৃৎপিণ্ডের পেশি কোষ বা ধমনিতে এমন পরিবর্তন আসে, যা হৃৎপিণ্ডের বাম ভেন্ট্রিকলকে সঠিকভাবে সংকুচিত হতে বাধা দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে স্ট্রেস-ইনডিউসড কার্ডিওমায়োপ্যাথি বা ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম বলা হয়। এর উপসর্গ অনেকটা হার্ট অ্যাটাকের মতো; যেমন বুকে ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট।

পরিপাক ও জীবনযাত্রার ছন্দপতন

শোকের প্রভাব আমাদের প্রাত্যহিক রুটিন এবং শারীরিক বিপাকপ্রক্রিয়াকেও ওলটপালট করে দেয়। তীব্র মানসিক চাপের সময় শরীরের ফাইট-অর-ফ্লাইট প্রতিক্রিয়ার কারণে রক্ত পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর দিকে ধাবিত হয়। এর ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া কিংবা পাকস্থলীতে একধরনের শূন্যতা বা বমি ভাব অনুভূত হয়। কেউ কেউ শোকের সময় অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলেন, আবার কেউ একেবারে রুচি হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে শরীরের ওজনে হঠাৎ হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। অনিদ্রা শরীরকে প্রাত্যহিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয় না। এটি দীর্ঘ মেয়াদে মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি ও শারীরিক সমন্বয় নষ্ট করতে পারে। অন্যদিকে, অনেকে শোক থেকে বাঁচতে ঘুমের মাঝে আশ্রয় খোঁজেন, যা শরীরকে আরও অলস ও নিস্তেজ করে তোলে।

যেভাবে শরীর ও মন সুস্থ রাখা সম্ভব

শোকের শারীরিক রেশ কত দিন থাকবে, তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ পর থেকে উপসর্গগুলো কমতে শুরু করে এবং এক থেকে দুই বছরের মধ্যে শরীর তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করে। কিন্তু প্রায় ৭ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এটি ‘কমপ্লিকেটেড গ্রিফ’-এ রূপ নিতে পারে, যেখানে তীব্র উপসর্গগুলো দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যায়। শোক যখন আসে, তখন মন আর শরীরের মাঝে কোনো বিভেদ থাকে না। তাই আরোগ্য লাভের জন্য শুধু মনকে সান্ত্বনা দিলেই হবে না। শরীরের প্রতিটি স্পন্দনকেও পরম মমতায় লালন করতে হবে। সুস্থ মন যেমন সুস্থ শরীরের আধার, তেমনি শরীরের আরোগ্যই মনে বয়ে আনে প্রশান্তির হাওয়া।

শারীরিক যত্ন: শোকের সময়েও পর্যাপ্ত পানি পান করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চার চেষ্টা করা উচিত। এগুলো শরীরে ভেতর থেকে শক্তি জোগায়।

মানসিক সংযোগ: একা না থেকে প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলা কিংবা থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া মেডিটেশন বা ডায়েরি লেখার অভ্যাস মনের অব্যক্ত যন্ত্রণাকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে।

সূত্র: হার্ভার্ড হেলথ, ভেরি ওয়েল মাইন্ড

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত