Ajker Patrika

বাইশের রসনাবিলাস

রজত কান্তি রায়
আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২২, ১৫: ৪০
বাইশের রসনাবিলাস

‘যেখানে খাবার ভালো সেখানে হাসি সবচেয়ে সুন্দর’ আইরিশ প্রবাদ।

ভালোবাসতে গেলে, ভালো হাসতে গেলে, ভালো থাকতে গেলে খাবারের কোনো বিকল্প নেই। সে জন্যই সম্ভবত এই নির্বিকল্প জিনিসটি নিয়ে প্রতিবছর গড়ে ওঠে অনেক ধরনের ট্রেন্ড। সেগুলো আবার সামনের দিনগুলোকে প্রভাবিত করে তৈরি করে আরও নতুন নতুন ট্রেন্ড।

২০২১ আমাদের জীবনকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে। অবশ্য এর শুরু হয়েছিল ২০২০-এ। আর রেশ এখনো রয়ে গেছে। আরও কত দিন সে রেশ টানতে হবে, পৃথিবীর মানুষ সেটা জানে না। সে না জানুক, বেঁচে থাকতে গেলে মানুষ খাবার ভুলবে না। আর যত সংকটই থাক না কেন, খাবার নিয়ে নতুন নতুন ট্রেন্ড গড়ে উঠবেই। ২০২১ সালকে যদি পরতে পরতে খুঁজে দেখি, বিপুল দুর্দশার মধ্যেও বিপুল ট্রেন্ডি ছিল খাবারের জগৎ। এ জগৎ এমনিতেই বর্ণিল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। করোনাসংকট সে বৈচিত্র্যে যোগ করেছে নতুন ট্রেন্ড। সে ট্রেন্ডের ট্রেন যে সামনের বছরও চলবে, সেটা ভালোই বোঝা যাচ্ছে।

ফুলকপির মাঞ্চুরিয়ান

জানের মায়ায় হোক বা যে কারণেই হোক, করোনা অতিমারিতে স্বাস্থ্যকর খাবারের ট্রেন্ড বেগবান হয়েছে। স্বল্প তেল-মসলায় রান্না করা খাবার ছিল প্রায় সবার পাতে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ভেষজ গুণসম্পন্ন জিনিসপত্র খাওয়ার প্রচলন। কে কবে রোজেলা, অর্থাৎ মেস্তাফুলের চা খেয়েছিলেন আগে? করোনাকালে এই মেস্তাফুল অনেকের কাছেই ছিল জীবনদায়ী কোরামিন ট্যাবলেটের মতো। ৬০০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হয়েছে কাঁচা মেস্তাফুল, ঢাকা শহরে। বেড়েছিল গাজর, লেবু, পুদিনা পাতার কদর, স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। মাংস কম খেয়ে ডিম খাওয়ার অভ্যাস কে করেনি সে সময়? স্বাস্থ্যকর খাবারের কদর সব সময় থাকলেও করোনাকালে সেটা ট্রেন্ডে দাঁড়িয়ে যায়। অনেকের অভ্যাস হয়ে গেছে বিষয়টি। ফলে সহসা স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস যাচ্ছে না আমাদের জীবন থেকে।

খাবারে স্বাস্থ্যসচেতনতার বিষয়টি আরও বুঝবেন রাসায়নিকমুক্ত খাবারের কথা শুনলে। চারদিকে প্রচুর ‘খাঁটি মধু’ আর ‘খাঁটি সরিষার তেলে’র রমরমা চলছে। সবকিছুই নাকি এখন খাঁটি! এই নেতি প্রচারেরও একটা ইতিবাচক দিক আছে। সেটা হলো, মানুষ খাঁটি জিনিসটা খুঁজছে। এখন রাসায়নিকমুক্ত শুঁটকি, মাছ, শাকসবজি সবই মোটামুটি পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মানুষ ফাইবার সমৃদ্ধ দেশীয় লাল চাল খাচ্ছে এখন। এটাও কম নয় কিন্তু।

চিংড়ি-মাখা

দেশীয় খাবার বেশখানেক উপেক্ষিতই থাকে আমাদের কাছে। কিন্তু করোনাকালের অনাকাঙ্ক্ষিত অবসরে নস্টালজিয়া থেকেই হোক, আর বাড়ির বাইরে যাওয়ার ভয় থেকেই হোক, দেশীয় খাবার রান্না ও খাওয়ার একটা ধুম পড়ে গিয়েছিল। সেটা এখনো ভালোভাবেই আছে। বুঝবেন কীভাবে? অনলাইনে অর্ডার করলেই আপনার বাসায় উপস্থিত হয়ে যাবে ডাল-ভর্তা-ভাজি-ঘণ্ট বা সবজি। অর্ডার করেই দেখুন। হ্যাঁ, বিখ্যাত সব অ্যাপেও সেগুলো অর্ডার করা যায়। ফেসবুককেন্দ্রিক কোনো কোনো খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জনপ্রিয় আঞ্চলিক খাবারও পরিবেশন করে। অনেককে আগে থেকে অর্ডার নিয়ে তারপর দেশীয় খাবার পাঠায় ভোক্তার কাছে। ভাবতেই ভালো লাগে, এখন ছুটির দিনে চিকেন বিরিয়ানি, চিকেন বারবিকিউ, চিকেন শর্মা, চিকেন তন্দুরি, চিকেন রাইস ইত্যাদি চিকেনের রাজত্ব থেকে চিকনে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব। বেরিয়ে গিয়ে ঝিরিঝিরি করে কাটা আলু-করলার ভাজা, ভর্তা, ঘণ্ট, ডাল আর মাছ দিয়ে চারটে ভাত খাওয়ার সুযোগ ঘটছে।

একসময় শুধু দিনের বেলা বা রাতের খাবার হোম ডেলিভারি পাওয়া যেত। কিন্তু এখন ঢাকা শহরে অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গভীর রাতেও খাবার ডেলিভারি দেয়। ফলে রাত ৩টায় ক্ষুধা পেটে নিয়ে আর ঘুমাতে যাওয়ার দরকার নেই। বরং যা খেতে চান, তা খেয়ে ঘুমাতে যেতে পারবেন। জানা যায়, রোম এক্সপ্রেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান রাতভর খাবার ডেলিভারি দেওয়া শুরু করে প্রথম। তার পর আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সেটা শুরু করে। রোম এক্সপ্রেস, বাই হিয়ার নাও, মাঞ্চিস, ন্যাক ও গ্রাব’স—এ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রাতজাগা মানুষের জন্য খাবার হোম ডেলিভারি দেওয়ার কাজ করে। সামনের দিনে এই প্রবণতা যে বেশ খানিক বাড়বে, সেটা বলাই যায়।

 করোনা অতিমারিতে শুরু হয়েছিল টেক অ্যাওয়ে। মানে রেস্তোরাঁয় বসে আপনি খেতে পারবেন না। কিন্তু প্রিয় খাবার পছন্দের রেস্তোরাঁ থেকে কিনতে পারবেন। খেতে হবে বাসায় এনে। মন্দ ছিল না সে ব্যবস্থা। সেটি কমলেও এখনো বন্ধ হয়নি। এর বেশ ভালো কিছু দিক আছে। প্রথমত, এ ধরনের রেস্তোরাঁগুলোর জায়গা দরকার খুব কম। সে জন্য সে দোকানগুলোয় ভাড়াও যে কম দিতে হয়, সেটা না বললেও চলে। আবার ব্যবসায় লাভ কিন্তু ঠিকই থাকে।

ঠিকঠাক খাবার না পেলে নাকি মানুষ ঠিকমতো ভালোবাসতে পারে না। আমার কথা নয়। বলেছেন ভার্জিনিয়া উলফ। যে ট্রেন্ডগুলো গড়ে উঠেছে, তার অনেকগুলোই সামনের দিনে বহাল থাকবে। তাই ট্রেন্ডি থেকে ভালো ভালো খাবার খান। নতুন বছরে ভালো খাবারের সঙ্গে ভালোবাসাও আসুক পৃথিবীতে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত