Ajker Patrika

‘মিসইনফোডেমিক’-এ আটকে যাচ্ছেন না তো? জেনে নিন পরিত্রাণের উপায়

ফিচার ডেস্ক
‘মিসইনফোডেমিক’-এ আটকে যাচ্ছেন না তো? জেনে নিন পরিত্রাণের উপায়
সোশ্যাল মিডিয়ার বেশির ভাগ ভিডিওতে সানস্ক্রিনের বাহ্যিক উপকারিতার ওপর জোর দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের মতে, মূল আলোচনা হওয়া উচিত স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে। ছবি: পেক্সেলস

‘ট্রেন্ড’ শব্দটির সঙ্গে এখন কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ সবাই পরিচিত। টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন ত্বকের যত্নে নেওয়া বিষয়ক তথ্য অনুসরণের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সেখানে কিছুদিন পরপর তৈরি হচ্ছে নতুন ট্রেন্ড। তবে প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঘুরে বেড়ানো সব তথ্যই যে বিজ্ঞানসম্মত নয়, তা নিয়ে সতর্ক করছেন ত্বক বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী পিএলওএস ডিজিটাল হেলথে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সানস্ক্রিন নিয়ে সঠিক তথ্যের চেয়ে বিভ্রান্তিকর বা ভুল তথ্য ছড়ানো ভিডিওগুলো মানুষের বেশি মনোযোগ কাড়ছে। এমনকি সেগুলোতে লাইক ও কমেন্টের সংখ্যাও অনেক বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ার এই বিভ্রান্তিকর প্রচারণাকে বিশেষজ্ঞরা আখ্যা দিয়েছেন ‘মিসইনফোডেমিক’ বা ভুল তথ্যের মহামারি বলে।

যে কারণে ছড়াচ্ছে এই ভুল তথ্য

প্লাস্টিক ও কসমেটিক সার্জন এবং ত্বক বিশেষজ্ঞ পল ব্যানওয়েল জানান, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা এমন কনটেন্টকে বেশি প্রচার করে, যেগুলো বিতর্কিত বা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। যখন কোনো ইনফ্লুয়েন্সার দাবি করেন, সানস্ক্রিন ক্ষতিকর বা সানস্ক্রিন থেকেই ক্যানসার হয়, তখন মানুষের মনে ভয় বা কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। ফলে ভিডিওটিতে দ্রুত ভিউ ও কমেন্ট বাড়ে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ইলিউশরি ট্রুথ ইফেক্ট’ বলা হয়। অর্থাৎ, একটা মিথ্যা কথা যখন বারবার মানুষের চোখের সামনে আসতে থাকে, তখন মানুষ একসময় সেটাকেই সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। ২০২৪ সালের আমেরিকান একাডেমি অব ডারমাটোলজির একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জেন-জি প্রজন্মের প্রায় ৫৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী বিশ্বাস করেন যে, ‘ট্যানিং বা ত্বক তামাটে করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো’।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ত্বক বিশেষজ্ঞদের মত

সোশ্যাল মিডিয়ার এসব ভিত্তিহীন দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ত্বক বিশেষজ্ঞরা কিছু অকাট্য বৈজ্ঞানিক সত্য সামনে এনেছেন:

  • ত্বক বা স্কিন ক্যানসারের প্রায় ৯০ শতাংশ নন-মেলানোমা ও ৮৬ শতাংশ মেলানোমা ক্যানসার হয়ে থাকে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আসার কারণে।
  • অতিবেগুনি রশ্মি মানুষের শরীরে ক্যানসার সৃষ্টির জন্য সরাসরি দায়ী।
  • নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার সূর্যের এই ক্ষতিকর রশ্মিকে বাধা দেয় এবং স্কিন ক্যানসারের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে আনে। সানস্ক্রিন ক্যানসার তৈরি করে, এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

সানস্ক্রিন কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, এটি স্বাস্থ্যের অংশ

সোশ্যাল মিডিয়ার বেশির ভাগ ভিডিওতে সানস্ক্রিনের কসমেটিক বা বাহ্যিক উপকারিতার ওপর জোর দেওয়া হয়। যেমন: বলিরেখা দূর করা, পিগমেন্টেশন কমানো বা ত্বকের অকাল বার্ধক্য় রোধ করা ইত্যাদি। এই গুণগুলো সত্যি হলেও চিকিৎসকদের মতে, মূল আলোচনা হওয়া উচিত স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে। সূর্যের আলো থেকে ত্বকের যে ক্ষতি হয়, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে জমতে থাকে। বিশেষ করে, শৈশব বা কৈশোরে যদি কেউ তীব্রভাবে রোদে পুড়ে যায়, তবে পরে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই দাঁত ব্রাশ করার মতোই প্রতিদিন বাইরে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন ব্যবহারকে একটি নিয়মিত অভ্যাস হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।

রাসায়নিক ও খনিজ উপাদানে তৈরি সানস্ক্রিন কি একসঙ্গে মেশানো যাবে

সানস্ক্রিন মূলত দুই ধরনের হয়। রাসায়নিক ও খনিজ উপাদানে তৈরি সানস্ক্রিন। প্রথমটি রাসায়নিক ফর্মুলার সাহায্যে অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে, অন্যদিকে খনিজ সানস্ক্রিন জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডের সাহায্যে ত্বকের ওপর একটি স্তর তৈরি করে রোদকে প্রতিফলিত করে। আন্তর্জাতিক ফটোক্যামিকেল অ্যান্ড ফটোবায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রাসায়নিক উপাদানসমৃদ্ধ সানস্ক্রিনের সঙ্গে খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ সানস্ক্রিন সরাসরি মিশিয়ে ফেললে রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে এর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে, যেগুলোয় জিংক অক্সাইড রয়েছে, সেগুলো এই ফলাফল দেয়।

ত্বকে রোদ লাগার ২ ঘণ্টার মধ্যে জিংক অক্সাইড অন্য উপাদানগুলোর ইউভিএ প্রোটেকশন ক্ষমতা ৮৪ থেকে ৯১ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে পারে। তবে মাউন্ট সিনাই হাসপাতাল ও লেনক্স হিল হাসপাতালের সিনিয়র অ্যাফিলিয়েটেড ডার্মাটোলজিস্ট ড. মিশেল গ্রিন এবং এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন হেলথের ডার্মাটোলজি বিভাগের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মেরি স্টিভেনসনের মতে, এই একটি গবেষণা দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, সব সানস্ক্রিনই প্রতি ৯০ মিনিট বা ২ ঘণ্টা পরপর নতুন করে ত্বকে লাগানোর নিয়ম রয়েছে। তাই আলাদা করে দুটি সানস্ক্রিন একসঙ্গে না মিশিয়ে সরাসরি জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ যেকোনো একটি ভালো সানস্ক্রিন বেছে নেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর তা পুনরায় ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

অনলাইন পরামর্শ যাচাইয়ের ৩ উপায়

সোশ্যাল মিডিয়ার সব পরামর্শ অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা যেতে পারে।

  • যোগ্যতা যাচাই করুন। যিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, তিনি কোনো প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য পেশাদার বা বিশ্বস্ত কোনো স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কি না, তা নিশ্চিত হোন।
  • যেকোনো চমকপ্রদ বা চাঞ্চল্যকর দাবি যেমন: কোনো নির্দিষ্ট পণ্যকে টক্সিক বা বিষাক্ত বলা হলেই তা বিশ্বাস করবেন না। দেখুন তারা কোনো গবেষণার সূত্র দিচ্ছে কি না।
  • যেসব কনটেন্ট ভয়, ক্ষোভ বা আতঙ্ক তৈরি করে ভিউ পাওয়ার চেষ্টা করে, সেগুলোকে এড়িয়ে চলুন।

সূত্র: হেলথ লাইন ও স্কিন ক্যানসার ফাউন্ডেশন অবলম্বনে

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত