Ajker Patrika

বাবার আপন খালুর সঙ্গে নিজ মেয়ের বিয়ের বিধান: একটি ফিকহি পর্যালোচনা

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
বাবার আপন খালুর সঙ্গে নিজ মেয়ের বিয়ের বিধান: একটি ফিকহি পর্যালোচনা
নারী-পুরুষের জৈবিক চাওয়া পূর্ণ করার হালাল পদ্ধতি হলো বিয়ে। ছবি: সংগৃহীত

ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বংশীয় পবিত্রতা এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার স্বার্থে সুনির্দিষ্ট বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোরআন-হাদিসে স্থায়ী ও সাময়িক নিষিদ্ধ নারীদের (মাহরাম) যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তার আলোকে ফিকহের ইমামগণ প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয়ের সমাধান প্রদান করেছেন।

শরিয়তের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো মেয়ের সঙ্গে তার বাবার আপন খালুর রক্তের বা দুধের কোনো সম্পর্ক নেই। বাবার খালু বৈবাহিক সূত্রে একজন আত্মীয় মাত্র। ফলে তিনি ওই মেয়ের জন্য স্থায়ী মাহরাম (চিরতরে নিষিদ্ধ) আত্মীয় নন।

তবে এই বিবাহের ক্ষেত্রে একটি আবশ্যিক শর্ত রয়েছে, যা সাময়িক নিষেধাজ্ঞার (جمع بين المحارم) অন্তর্ভুক্ত। বিধানটি নিম্নরূপ—

নিষেধাজ্ঞা (হারাম হওয়ার সুরত): যদি ওই মেয়ের বাবার আপন খালা (যিনি বর্তমানে ওই ব্যক্তির স্ত্রী) জীবিত থাকেন এবং তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক বলবৎ থাকে, তবে একই সময়ে ওই ব্যক্তি তাঁর বর্তমান স্ত্রী এবং স্ত্রীর ভাগনের মেয়েকে নিজের বিবাহে একত্র করতে পারবেন না। এই অবস্থায় বিবাহ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং অবৈধ।

বৈধতা (জায়েজ হওয়ার সুরত): যদি কোনো কারণে বাবার ওই খালা ইন্তেকাল করেন কিংবা শরিয়ার নিয়মে তাঁদের মধ্যে চিরতরে বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক) ঘটে এবং খালার ইদ্দত (অপেক্ষার সময়) সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়, তবে রক্তের কোনো বন্ধন না থাকায় ওই ব্যক্তি (বাবার খালু) চাইলে এই মেয়েকে সম্পূর্ণ নতুন আকদ ও মোহরানার মাধ্যমে বিয়ে করতে পারবেন।

হাদিস শরিফের নিষেধাজ্ঞা

রাসুলুল্লাহ (সা.) একই সময়ে কোনো পুরুষকে তাঁর স্ত্রীর এমন কোনো নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে নিষেধ করেছেন, যার ফলে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হয়। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, ‘কোনো নারীকে তার ফুফুর সঙ্গে এবং কোনো নারীকে তার খালার সঙ্গে (একই স্বামীর বিবাহে) একত্র করা যাবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫১০৯)

মুজতাহিদ ফকিহগণ এই হাদিসের পরিধি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্ত্রীর পরবর্তী প্রজন্ম, যেমন স্ত্রীর ভাগনির মেয়ে বা ভাতিজির মেয়ের একত্রীকরণকেও এর আওতাভুক্ত করেছেন।

ফিকহি কায়েদা বা আইনি মূলনীতি

ইসলামি ফিকহে দুই নারীকে একই পুরুষের বিবাহে একত্র করার বৈধতা ও অবৈধতা যাচাইয়ের জন্য একটি মূলনীতি বা ‘উসুল’ নির্ধারণ করা হয়েছে। হানাফি মাজহাবের বিশ্বকোষ ‘আল-হিদায়া’তে ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.) লিখেন, ‘এমন দুই নারীর মধ্যে একত্রীকরণ (একসঙ্গে বিবাহ) করা যাবে না, যাদের একজন যদি পুরুষ হতো, তবে তার জন্য অপরজনকে বিবাহ করা বৈধ হতো না।’ (আল-হিদায়া শরহু বিদায়াতিল মুবতাদি: ৩/১৪, ইদারাতুল কোরআন ওয়াল উলুমিল ইসলামিয়া, পাকিস্তান, ১৪১৭ হিজরি)

এই মাসআলায় আইনের প্রয়োগ

এখানে দুজন নারী হলেন—১. বাবার খালা (বর্তমান স্ত্রী), এবং ২. বাবার ভাগনের মেয়ে (প্রস্তাবিত স্ত্রী)।

যদি আমরা বাবার খালাকে পুরুষ কল্পনা করি, তবে তিনি হবেন ওই মেয়ের বাবার মামা। আর বাবার মামা মানে মেয়ের নানা। কোনো পুরুষ তার নিজের ভাগনের মেয়েকে বিয়ে করতে পারেন না। কারণ, সে তাঁর নাতনি সমতুল্য বংশীয় মাহরাম। যেহেতু একজনকে পুরুষ ধরলে অপরজনের সঙ্গে বিয়ে হারাম বা অবৈধ হচ্ছে, সেহেতু এই দুই নারীকে একই স্বামী তাঁর বৈবাহিক বন্ধনে একত্র করতে পারবেন না।

ফিকহি কিতাবের সুস্পষ্ট দলিল

হানাফি ফতোয়ার অন্যতম প্রধান আকর গ্রন্থ ফাতাওয়ায়ে আলমগিরিতে এই নাতনি বা ভাগনের মেয়ের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘এমন দুজন নারীকে একত্রে বিবাহ করা জায়েজ নয় যাদের মাঝে এমন আত্মীয়তা রয়েছে যে তাদের একজনকে পুরুষ ধরলে অপরজনকে বিবাহ করা হারাম হতো...সুতরাং, কোনো নারী এবং তার বোনের ছেলের মেয়েকে (ভাগনের মেয়ে) একই সঙ্গে বিবাহে একত্র করা জায়েজ নয়।’ (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১ / ২৭৭, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৯১)

এসব দালিলিক পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, কোনো মেয়ে তার বাবার খালুকে সরাসরি বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই, যদি না ওই খালুর সংসারে মেয়ের বাবার আপন খালা স্ত্রী হিসেবে জীবিত থাকেন। খালা জীবিত থাকা অবস্থায় এই বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল ও হারাম। বিয়ে হলেও তা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ হবে না। তবে খালার মৃত্যুর পর বা চূড়ান্ত তালাকের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর এই বিবাহ শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ এবং হালাল।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত