মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম হিজরিতে যখন নামাজের জন্য মানুষকে ডাকার উদ্দেশ্যে আজানের রীতি প্রবর্তিত হয়, তখন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই পবিত্র ও গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য সর্বাগ্রে বেছে নিয়েছিলেন এক কৃষ্ণাঙ্গ সাহাবিকে। তিনি আর কেউ নন, ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মুয়াজ্জিন হজরত বেলাল ইবনে রাবাহ (রা.)। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অসামান্য বলিষ্ঠ ও সুমধুর। মদিনার অধিবাসীরা প্রতিদিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন বেলালের সেই হৃদয়স্পর্শী আজান শোনার জন্য।
বংশসূত্রে হাবশি (আবিসিনিয়া বা বর্তমান ইথিওপিয়া) ও মক্কায় জন্ম নেওয়া হজরত বেলাল (রা.) ছিলেন ইসলামের উষালগ্নে প্রকাশ্যে ইমানের ঘোষণা দেওয়া প্রথম সাতজন সাহাবির অন্যতম। আর এই অপরাধে তাঁর ওপর নেমে এসেছিল তৎকালীন কুরাইশ নেতা ও তাঁর নিষ্ঠুর মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফের অমানুষিক নির্যাতন।
মক্কার তপ্ত বালুকাধামে উত্তপ্ত দুপুরে বেলালকে শুইয়ে রেখে তাঁর বুকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো ভারী পাথরখণ্ড। চাবুকের নির্মম আঘাতে শরীর রক্তাক্ত হলেও বেলালের ঠোঁট থেকে কেবল একটি ধ্বনিই উচ্চারিত হতো—‘আহাদ, আহাদ’ (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)। বেলালের এই অবিচল ইমান দেখে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) বিপুল অর্থের বিনিময়ে উমাইয়ার কাছ থেকে তাঁকে কিনে নেন এবং দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে চিরতরে মুক্ত করে দেন।
মুক্তির পর বেলাল (রা.) নবীজি (সা.)-এর সার্বক্ষণিক সাহচর্য গ্রহণ করেন। তাঁর নিঃসঙ্গতা দূর করতে রাসুল (সা.) তাঁকে হজরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর সঙ্গে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। মদিনার রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে প্রায় প্রতিটি যুদ্ধে অংশ নেওয়া বেলাল (রা.) অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দিনে রাসুল (সা.)-এর আদেশে পবিত্র কাবাঘরের ছাদের ওপর উঠে দাঁড়ান। এরপর মক্কার আকাশে-বাতাসে প্রথমবারের মতো উচ্চকণ্ঠে তাওহিদের বাণী তথা আজান প্রতিধ্বনিত করেন তিনি। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামের ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধ—বদর যুদ্ধের ময়দানে বেলালের তরবারির আঘাতেই তাঁর সেই সাবেক অত্যাচারী মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফের মৃত্যু হয়েছিল।
হজরত বেলাল (রা.) প্রিয় নবীর সেবায় সর্বদা নিজেকে উৎসর্গ করে রাখতেন। শত অভাব ও দারিদ্র্য সত্ত্বেও হাতে কিছু এলে তার একটি অংশ তিনি নবীজিকে উপহার দিতেন। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মদিনার অলিগলি বেলালকে কেবলই প্রিয় নবীর স্মৃতি মনে করিয়ে দিত। রাসুলবিহীন মদিনায় বসবাস করা তাঁর জন্য মানসিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। বেদনাকাতর বেলাল (রা.) মদিনা ছেড়ে সিরিয়ার দামেস্কে চলে যান এবং একপর্যায়ে আজান দেওয়ার আগ্রহই হারিয়ে ফেলেন।
পরে খলিফা হজরত উমর (রা.) যখন সিরিয়া সফরে যান, তখন তাঁর বিশেষ অনুরোধে দীর্ঘবিরতির পর বেলাল (রা.) একবার আজান দিয়েছিলেন। সেই চেনা কণ্ঠের আজান শুনে উপস্থিত সাহাবি ও মুসলমানদের চোখ অশ্রুতে প্লাবিত হয়েছিল এবং হজরত উমর (রা.) আবেগে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।
৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে, নবীজি (সা.)-এর মৃত্যুর দুই বছর পর এক রাতে হজরত বেলাল (রা.) স্বপ্নে প্রিয় নবীকে দেখেন। এরপর ব্যাকুল হয়ে দামেস্ক থেকে মদিনায় রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারকের উদ্দেশে ছুটে আসেন। সেখানে গিয়ে নবীজির দুই নাতি হজরত হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.)-কে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
নবীজির স্নেহের দুই নাতি সেই দিন সুবহে সাদিকের সময় বেলাল (রা.)-কে ফজরের আজান দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। তাঁদের অনুরোধ ফেলতে না পেরে দীর্ঘ বছর পর বেলাল (রা.) আবারও মসজিদে নববির ছাদে দাঁড়িয়ে আজান দেন। মদিনার অলিগলিতে যখন বেলালের সুমধুর কণ্ঠের ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন ঘর ছেড়ে দলে দলে লোক মসজিদে নববির দিকে ছুটে আসেন। আবেগবিহ্বল মানুষের তকবির ধ্বনিতে সেদিন মদিনার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছিল। এটিই ছিল বেলালের জীবনের শেষ আজান।
পরে তিনি আবার সিরিয়ায় ফিরে যান এবং সেখানে ইসলামের বাণী প্রচারে অবদান রাখেন। অবশেষে ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্কে এই মহান সাহাবি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর শয্যায় তাঁর শেষ কথা ছিল, ‘প্রিয় নবী (সা.)-এর সঙ্গে পুনর্মিলনেই আমার পরম আনন্দ।’ দামেস্কের ‘বাবুস সাগির’ কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। খলিফা হজরত উমর (রা.) বলতেন, ‘আবু বকর আমাদের সাইয়েদ এবং তিনি আমাদের আরেক সাইয়েদকে (বেলাল) মুক্ত করেছেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবদ্দশায় হজরত বেলাল (রা.)-কে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন।

আরবি নববর্ষ ১৪৪৮ হিজরির প্রথম রাতেই পবিত্র কাবা শরিফে পরানো হচ্ছে নতুন গিলাফ (কিসওয়া)। আজ সোমবার (১৫ জুন) এশার নামাজের পর মক্কার মসজিদুল হারামে শুরু হবে এই ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক আয়োজন, যেখানে প্রতিস্থাপিত হবে কাবার নতুন গিলাফ। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সৌদির ঐতিহ্য অনুযায়ী, প্রতি হিজরি বছরের...
১৮ মিনিট আগে
ঘর হলো মানুষের ক্লান্তি দূর করার ও মানসিক প্রশান্তি লাভের প্রধান আশ্রয়স্থল। নিজের ঘর হোক কিংবা অন্যের; সেখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইসলামের সুন্দর কিছু নিয়ম রয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন...
১০ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
১৫ ঘণ্টা আগে
‘দোয়া’ শব্দটি মূলত আরবি ‘দাআ’ ধাতু থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। যার অর্থ—সম্বোধন করা, কাউকে ডাক দেওয়া, আহ্বান করা, প্রার্থনা বা অনুরোধ করা। সহজ কথায়, মহান আল্লাহ তাআলাকে পরম আকুতিতে সম্বোধন করে ডাকা এবং তাঁর কাছে নিজের অভাব-অভিযোগ ও প্রয়োজন পেশ করাই হচ্ছে মূলত দোয়া।
১ দিন আগে