Ajker Patrika

অবশেষে আবরাহার নকল কাবার কী হয়েছিল?

আরওয়া তাসনিম
অবশেষে আবরাহার নকল কাবার কী হয়েছিল?

ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক উদ্ধত শাসকের নাম পাওয়া যায়, যারা খোদায়ী শক্তির সঙ্গে দম্ভ দেখিয়ে চরমভাবে পরাজিত হয়েছে। এমনই এক অহংকারী শাসক ছিল আবরাহা। পবিত্র মক্কার কাবা শরিফের সমকক্ষ একটি স্থাপনা তৈরি করে সে মানুষের মন জয় করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার সেই হীন প্রচেষ্টা এমন শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়—আজ সেই স্থানটি মানুষের কাছে কেবল একটি ডাস্টবিন বা আবর্জনার স্তূপ হিসেবে পরিচিত। তাফসিরে ইবনে কাসিরের বরাতে আমরা পাই সেই চাঞ্চল্যকর সত্য কাহিনি।

আবরাহার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

ইসলামের আগমনের অনেক আগে ইয়েমেনের শাসনকর্তা ছিল আবরাহা আল-আশরাম। আবিসিনিয়ার (বর্তমান ইথিওপিয়া) খ্রিষ্টান সম্রাটের প্রতিনিধি হিসেবে সে ইয়েমেন শাসন করত। একবার তার সম্রাট কোনো কারণে তার ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে কঠোর শাস্তির হুমকি দেন। নিজের গদি রক্ষা এবং সম্রাটকে খুশি করতে আবরাহা এক অভিনব ফন্দি আঁটে। সে ভাবে, সম্রাট যেহেতু খ্রিষ্টান, তাই এমন কিছু করা উচিত, যা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিকভাবে তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

নকল কাবা: আকাশচুম্বী কুল্লাইস

আবরাহা ইয়েমেনের সানায় এক বিশাল এবং জাঁকজমকপূর্ণ গির্জা নির্মাণ করে। এর উচ্চতা এতই বেশি ছিল যে কেউ ওপরের দিকে তাকালে তার মাথার টুপি পড়ে যেত। ইতিহাসে এটি ‘কুল্লাইস’ নামে পরিচিত। আবরাহার মূল পরিকল্পনা ছিল আরবের হজযাত্রীদের মক্কা থেকে সরিয়ে ইয়েমেনে নিয়ে আসা। সে চাইল—আরবের মানুষ মক্কার কাবার বদলে তার তৈরি এই জৌলুশপূর্ণ গির্জায় এসে তীর্থ পালন করুক।

আবরাহা যখন ঘোষণা করল যে এখন থেকে মক্কার বদলে ইয়েমেনের এই গির্জাই হবে হজের প্রধান কেন্দ্র, তখন আরবের গোত্রগুলো ক্ষোভে ফেটে পড়ল। তারা তাদের পবিত্র কাবার প্রতি এতই অনুরক্ত ছিল যে কোনো জৌলুশই তাদের মন ভোলাতে পারল না। বিশেষ করে কাবার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কুরাইশ বংশের এক ব্যক্তি এই অপমান সহ্য করতে না পেরে গোপনে ইয়েমেনে পাড়ি জমায়। সে রাতের অন্ধকারে আবরাহার সেই সাজানো গির্জায় ঢুকে সেটিকে অপবিত্র ও নোংরা করে পালিয়ে আসে।

আবরাহার অভিযান ও আসমানি আবাবিল

নিজের স্বপ্নের গির্জার এই দশা দেখে আবরাহা রাগে ফেটে পড়ল। সে সিদ্ধান্ত নিল এর চরম প্রতিশোধ নেবে। ৬০ হাজার সৈন্য এবং বিশাল আকৃতির সব হাতি নিয়ে সে মক্কার পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে রওনা হলো। আরবরা সংখ্যায় ও শক্তিতে কম হওয়ায় তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল এবং পবিত্র ঘর রক্ষার জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতে লাগল।

যখন আবরাহার বাহিনী কাবার একদম কাছে পৌঁছে গেল, তখন অলৌকিকভাবে একঝাঁক পাখি (আবাবিল) আকাশে উদিত হলো। তাদের প্রত্যেকের মুখে ও পায়ে ছিল ছোট ছোট কঙ্কর বা পাথর। আল্লাহর নির্দেশে তারা সেই পাথরগুলো সৈন্যবাহিনীর ওপর বর্ষণ করতে শুরু করল। সেই পাথরগুলো কোনো সাধারণ পাথর ছিল না; সেগুলো যার গায়ে লেগেছে, তাকেই খড়কুটোর মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আবরাহার বিশাল বাহিনী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো এবং আবরাহা নিজে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পালিয়ে গিয়ে শোচনীয়ভাবে মৃত্যুবরণ করল।

পবিত্র কাবা বনাম ঘৃণার স্তূপ

আজ শত শত বছর পেরিয়ে গেছে। আজও পৃথিবীর প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে মক্কার কাবা শরিফে হজ পালন করতে যায়। কিন্তু আবরাহা যেখানে তার ‘নকল কাবা’ বানিয়েছিল, ইয়েমেনের সানার সেই গির্জাটির বর্তমান অবস্থা কী?

বিস্ময়কর হলেও সত্য, ইয়েমেনের স্থানীয় মানুষ আজ সেই জায়গাটিকে ময়লা-আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করে! যে জায়গাটিকে আবরাহা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, তা আজ ইতিহাসের এক ঘৃণিত আস্তাকুঁড়েয় পরিণত হয়েছে। আবরাহা ভুলে গিয়েছিল ভক্তি কোনো পাথরের দেয়ালে থাকে না, থাকে অন্তরে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত