Ajker Patrika

খেলাধুলায় ইসলামের উৎসাহ ও নীতিমালা

তাসনিফ আবীদ
খেলাধুলায় ইসলামের উৎসাহ ও নীতিমালা

ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গের বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা দেয়। এখানে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতিও সমান গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। খেলাধুলাকে শরীরচর্চা, সুস্থ মনন ও প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে ইসলাম। জীবনের মহৎ লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ইসলাম নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে খেলাধুলার অনুমতি দিয়েছে।

যে কারণে খেলাধুলায় উৎসাহ দেয় ইসলাম

খেলাধুলা মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। ইসলামের দৃষ্টিতে এর প্রধান উদ্দেশ্য ও সুফলগুলো হলো:

১. শারীরিক সুস্থতা অর্জন: একজন মুমিনের সুস্থ ও সবল দেহ থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ, দুর্বল দেহের চেয়ে শক্তিশালী ও সুস্থ দেহ আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। খেলাধুলা শরীরকে কর্মক্ষম রাখে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়।

২. রণ-কৌশলের প্রশিক্ষণ: ইসলামের প্রাথমিক যুগে তির নিক্ষেপ, ঘোড়দৌড় ও বর্শা চালনার মতো খেলাগুলো ছিল যুদ্ধের পরোক্ষ প্রস্তুতি। এর মাধ্যমে মুসলিমরা প্রতিরক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা তাদের (শত্রুদের) মোকাবিলার জন্য সাধ্যমতো শক্তি ও অশ্ব প্রস্তুত করো।’ (সুরা আনফাল: ৬০)

৩. প্রফুল্লতা ও সজীবতা: সুস্থ বিনোদন মানুষের মনকে আনন্দিত ও সতেজ করে তোলে। এতে কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক অবসাদ দূর হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মাঝে মাঝে হৃদয়কে বিশ্রাম ও আরাম দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ)

নবীজি (সা.)-এর যুগে প্রচলিত কিছু খেলাধুলা

  • ইসলাম সেসব খেলাধুলাকেই সমর্থন করে, যার পেছনে কোনো দ্বীনি বা দুনিয়াবি বৈধ কল্যাণ রয়েছে। এই নীতির আলোকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের যুগে প্রচলিত প্রধান কিছু খেলা ছিল:
  • ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা: রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন ও তদারকি করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণহীন ঘোড়ার মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছেন। (সহিহ বুখারি: ২৮৭০)
  • তির নিক্ষেপ: তিরন্দাজিকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ একটি তিরের উসিলায় তিনজন লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন—তির নির্মাতা, তির নিক্ষেপকারী এবং তা নিক্ষেপে সাহায্যকারী।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা তিরন্দাজি করো ও ঘোড়দৌড় শেখো। তবে ঘোড়দৌড়ের তুলনায় তিরন্দাজি শেখা আমার কাছে বেশি পছন্দের।’ (জামে তিরমিজি: ১৬৩৭)
  • মল্লযুদ্ধ বা কুস্তি: এটি তৎকালীন আরবের একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খেলা ছিল। দ্বীনের দাওয়াতের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও একবার মক্কার বিখ্যাত ও অপরাজেয় মল্লযোদ্ধা রুকানা বিন ইয়াজিদকে কুস্তিতে পরাজিত করেছিলেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
  • সাঁতার ও অন্যান্য শরীরচর্চা: সাঁতার শেখার প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বিষয় যাতে আল্লাহর স্মরণ নেই তা অর্থহীন, চারটি বিষয় ছাড়া—হাতের নিশানা ঠিক করার উদ্দেশ্যে তির খেলা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্ত্রীর সঙ্গে হাসি-কৌতুক করা এবং সাঁতার শেখা।’ (সুনানে কুবরা লিন-নাসায়ি: ৮৯৪০)। এ ছাড়া তৎকালীন সমাজে ভারোত্তোলন এবং দ্রুত হাঁটার প্রতিযোগিতাও প্রচলিত ছিল।

ইসলামে খেলাধুলার নীতিমালা

  • খেলাধুলা মূলত বৈধ হলেও তা চর্চার ক্ষেত্রে কিছু সুস্পষ্ট শরয়ি সীমারেখা মেনে চলতে হয়। এই মূলনীতিগুলো কোনো খেলায় লঙ্ঘিত হলে, সেই খেলা আর জায়েজ থাকে না:
  • জুয়া ও বাজি: যেসব খেলায় আর্থিক বাজি বা জুয়ার শর্ত থাকে, তা সম্পূর্ণ হারাম। জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তিরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা মায়েদা: ৯০)
  • ইবাদতে উদাসীনতা: খেলাধুলা কোনোভাবেই যেন মানুষকে নামাজসহ আল্লাহর মৌলিক হুকুম পালন থেকে বিরত না রাখে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন, ‘মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে, যারা আল্লাহর পথ থেকে (মানুষকে) বিচ্যুত করার জন্য অবান্তর কথাবার্তা (বা বিনোদন) ক্রয় করে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সুরা লোকমান: ৬)
  • পর্দা ও শালীনতার বিধান রক্ষা: খেলাধুলার পোশাক ও পরিবেশে অবশ্যই শালীনতা বজায় রাখতে হবে। পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত (সতর) এবং নারীদের জন্য শরিয়তসম্মত পর্দা বজায় রাখা ফরজ। যেসব খেলায় এই বিধান লঙ্ঘিত হয়, সেগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

এই মূলনীতিগুলো কেবল খেলার ক্ষেত্রেই নয়, বরং খেলা দেখা বা কোনো দলকে সমর্থন করার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেখানে অশ্লীলতা, সময়ের অপচয়, ফরজ ইবাদতে অবহেলা এবং অর্থের অপচয় জড়িত থাকে, তা দেখা বা সমর্থন করা থেকে একজন সচেতন মুমিনের বিরত থাকা আবশ্যক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত