Ajker Patrika

‘দুর্বল মানুষ’ ও ‘মাদক চক্রের নেতা’ পেত্রোর সঙ্গে বৈঠকের পর সম্মানিত বোধ করছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯: ৪৫
‘দুর্বল মানুষ’ ও ‘মাদক চক্রের নেতা’ পেত্রোর সঙ্গে বৈঠকের পর সম্মানিত বোধ করছেন ট্রাম্প
হোয়াইট হাউসে গুস্তাভো পেত্রো ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এক্স

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে ‘অসুস্থ মানুষ’ ও ‘অবৈধ মাদক চক্রের নেতা’ বলে আক্রমণ করে আসছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার সেই ট্রাম্পই গুস্তাভো পেত্রোকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান। ওয়াশিংটন ডিসিতে এটিই ছিল দুই নেতার প্রথম সরাসরি বৈঠক।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, বৈঠকের পর দুই নেতা একে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা স্বীকার করেন, তাঁদের মধ্যে এখনো নানা মতপার্থক্য ও টানাপোড়েন রয়ে গেছে। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে গুস্তাভো পেত্রো ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর আগের উত্তপ্ত সম্পর্ক নিয়ে করা প্রশ্ন এড়িয়ে যান। উল্লেখ্য, অতীতে পেত্রো প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিলেন।

এই বিষয়ে কথা না বাড়িয়ে পেত্রো বলেন, এটি ছিল ‘দুই সমান মর্যাদার মানুষের বৈঠক, যাদের চিন্তাভাবনা ভিন্ন।’ পেত্রো বলেন, ‘তিনি তাঁর চিন্তাধারা বদলাননি, আমিও বদলাইনি। কিন্তু তাহলে কীভাবে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা হয়? এটা যমজ ভাইদের মধ্যে হয় না। এটা হয় বিরোধীদের মধ্যে।’

অন্যদিকে ট্রাম্প ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠক নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বৈঠকটি দারুণ ছিল।’ দুই নেতার আলোচ্যসূচিতে ছিল আন্তর্জাতিক মাদক পাচার দমন এবং লাতিন আমেরিকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়।

ট্রাম্প ও পেত্রোর বৈঠকটি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে এবং পুরো সময়টা ছিল রুদ্ধদ্বার। তবে বৈঠক শেষে দুই নেতা একে অপরের সম্পর্কে বেশ ইতিবাচক মন্তব্য করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে পেত্রো জানান, ট্রাম্প তাঁকে কয়েকটি উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল তাঁদের বৈঠকের একটি স্মারক ছবি, যার সঙ্গে ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা একটি নোট ছিল। নোটে লেখা ছিল, ‘গুস্তাভো—দারুণ সম্মান। আমি কলম্বিয়াকে ভালোবাসি।’

আরেক পোস্টে পেত্রো দেখান ট্রাম্পের লেখা বই দ্য আর্ট অব দ্য ডিলের একটি কপি। বইটির শিরোনাম পাতায় ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আপনি খুবই চমৎকার।’ এই বিষয়ে মজা করে পেত্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্প্যানিশ ভাষায় লেখেন, ‘কেউ কি আমাকে বলতে পারে, এই উৎসর্গ বার্তায় ট্রাম্প কী লিখেছেন? আমি ইংরেজি খুব একটা বুঝি না।’

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাত্র ছয় দিনের মাথায়, ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো ট্রাম্প-পেত্রোর প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো দুটি অভিবাসন প্রত্যাবাসন ফ্লাইট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা একে অপরকে হুমকি দেন।

পেত্রো ওই ফ্লাইটে থাকা ব্যক্তিদের সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান। অন্যদিকে ট্রাম্প পেত্রোর প্রথম দফায় ফ্লাইট গ্রহণে অস্বীকৃতিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরে ট্রাম্প কলম্বিয়ার পণ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিলে পেত্রো অবস্থান বদলাতে বাধ্য হন।

এর পরের মাসগুলোতেও দুই নেতা একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে যান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ক্যারিবিয়ান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বাহিনীর নৌযানে চালানো প্রাণঘাতী হামলার তীব্র নিন্দা করেন পেত্রো। তিনি এসব হামলাকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেন। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণের উদ্দেশ্যে চালানো মার্কিন সামরিক অভিযানেরও সমালোচনা করেন পেত্রো। তিনি বলেন, এটি কার্যত ‘অপহরণের’ শামিল।

এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পেত্রোর বক্তব্যের পর তাঁর মার্কিন ভিসা বাতিল করেন। ওই সময় পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেন এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ফিলিস্তিনপন্থী এক বিক্ষোভেও অংশ নেন। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন গত অক্টোবরে পেত্রোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, বামপন্থী এই নেতা কলম্বিয়ায় ‘মাদক কার্টেলগুলোকে ফুলেফেঁপে ওঠার সুযোগ দিচ্ছেন।’

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর ট্রাম্প পেত্রোর উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, পেত্রোর উচিত ‘নিজের পশ্চাদ্দেশ সামলে রাখা।’ এই মন্তব্যকে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি হিসেবেও অনেকে ব্যাখ্যা করেন। তবে গত মাসে দুই নেতার সম্পর্কে কিছুটা বরফ গলতে শুরু করে। ৭ জানুয়ারি তাঁরা প্রথমবারের মতো ফোনে কথা বলেন। মঙ্গলবারের এই সরাসরি বৈঠক ছিল সম্পর্কের আরেকটি নতুন অধ্যায়। তবে উত্তেজনা কমলেও দুই নেতা বৈঠকের পর দেওয়া বক্তব্যে নিজেদের মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

প্রথমে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, বৈঠকের আগে তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। তিনি বলেন, ‘তিনি আর আমি খুব ভালো বন্ধু ছিলাম না। তবে আমি অপমানিত হইনি, কারণ আমি তাঁকে আগে কখনো দেখিনি।’ তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবারের বৈঠকটি আনন্দদায়ক ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘আমি তাঁকে একদমই চিনতাম না, আর আমাদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া হয়েছে।’

অন্যদিকে পেত্রো ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত কলম্বিয়ার দূতাবাসে দীর্ঘ এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে মতপার্থক্যের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন, যেটিকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে। এ ছাড়া তিনি কার্বন-নিরপেক্ষ টেকসই জ্বালানি উদ্যোগের কথাও বলেন। উল্লেখ্য, ট্রাম্প অতীতে সবুজ জ্বালানি কর্মসূচিকে ‘প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

সবচেয়ে বড় মতবিরোধের জায়গা ছিল মাদক পাচার দমনের কৌশল নিয়ে। কলম্বিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন উৎপাদক দেশ। বৈশ্বিক কোকেন উৎপাদনের ৬৮ শতাংশই আসে এই দেশ থেকে। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক জলসীমা ও ভেনেজুয়েলায় প্রাণঘাতী সামরিক হামলার পক্ষে যুক্তি হিসেবে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলেছে। যদিও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এসব হামলাকে অবৈধ বলে নিন্দা করেছেন।

এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন বৈশ্বিক মাদকবিরোধী অভিযানে সহযোগী হিসেবে কলম্বিয়ার স্বীকৃতি বাতিল করেছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, পেত্রো যদি কোকোগাছ ধ্বংস এবং কোকেন উৎপাদন ও পাচার কমাতে ‘আরও কঠোর ব্যবস্থা’ নেন, তাহলে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তবে পেত্রো নিজেকে মাদক পাচারের বিষয়ে নরম হিসেবে চিত্রিত করার প্রচেষ্টা নাকচ করেন। তিনি বলেন, তাঁর সরকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাদক জব্দের নজির স্থাপন করেছে।

তিনি আবারও বলেন, জোরপূর্বক কোকো চাষ ধ্বংসের পরিবর্তে স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি বেশি সফল হয়েছেন। পেত্রো বলেন, এই উদ্যোগের ফলে ‘হাজার হাজার কৃষক নিজেরাই কোকোগাছ তুলে ফেলেছেন। এটা দুই ধরনের পদ্ধতি, দুই ধরনের চিন্তাধারা। একটি পদ্ধতি নির্মম এবং আত্মস্বার্থে ভরা, যা শেষ পর্যন্ত মাফিয়া ও মাদক কারবারিদের শক্তিশালী করে। আর অন্যটি বুদ্ধিদীপ্ত ও কার্যকর।’

পেত্রোর মতে, দরিদ্র কৃষকদের শাস্তি না দিয়ে শীর্ষ মাদক চক্রের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোই বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেছি, যদি আপনি মাদক পাচারের বিরুদ্ধে একজন প্রকৃত মিত্র চান, তাহলে বড় ডনদের ধরতে হবে।’

যদিও পেত্রো ট্রাম্পের সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা স্বীকার করেন, তবু কিছু ক্ষেত্রে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে মিল থাকা মতামতও তুলে ধরেন। ট্রাম্পের মতোই তিনি জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পেত্রো বলেন, ‘জাতিসংঘ কি তার অক্ষমতা দেখায়নি? সংস্কারের প্রয়োজন নেই কি? মানবতাকে আরও ভালোভাবে একত্র করার জন্য কি জাতিসংঘের চেয়েও ভালো কিছু প্রয়োজন?’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিএনপি সরকার গঠন করলে এনসিপির অবস্থান কী হবে, যা জানালেন নাহিদ ইসলাম

নওগাঁয় হাসপাতালের সামনে পড়ে ছিল রাজস্ব কর্মকর্তার রক্তাক্ত লাশ

যেভাবে হত্যা করা হয় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পুত্র সাইফকে

জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের কী হবে

অনলাইন গেমের নেশা: নিষেধ করায় গভীর রাতে ৯ তলা থেকে ঝাঁপ দিল ৩ বোন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত