Ajker Patrika

ভেনেজুয়েলায় হামলার ‘আইনি ভিত্তি’ নেই, মাদুরোর বিচার কীভাবে করবে যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫: ০৩
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভেনেজুয়েলাতে মার্কিন হামলার আইনি ভিত্তি না থাকলেও মাদুরোর বিচারে তা বাধা সৃষ্টি করবে না। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভেনেজুয়েলাতে মার্কিন হামলার আইনি ভিত্তি না থাকলেও মাদুরোর বিচারে তা বাধা সৃষ্টি করবে না। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে কয়েক দিনের মধ্যে ম্যানহাটানের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হতে পারে। তাঁদের বিরুদ্ধে নারকো-টেররিজম বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে। জুরি যদি এই অভিযোগ গ্রহণ করেন, তবে তাঁদের কয়েক দশকের জন্য আমেরিকার মাটিতে বন্দী থাকতে হতে পারে।

স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় মাদুরোকে বহনকারী একটি বিমান নিউইয়র্কের উপকণ্ঠের একটি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) কর্মকর্তারা তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আদালতের নথিপত্র এবং এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের সূত্রে জানা গেছে, আদালতে হাজির করার আগপর্যন্ত তাঁকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হবে। সম্ভবত সোমবার তাঁকে আদালতে তোলা হবে।

মাদুরোর আটক এবং তাঁকে অভিযুক্ত করার বিষয়টি কিছু আইনপ্রণেতা ও পণ্ডিতের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করেছে। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একতরফাভাবে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রে হামলা চালানোর এবং সেই দেশের নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য আমেরিকায় নিয়ে আসার অনুমতি দেয় না। তবে এসব সমালোচক এটাও স্বীকার করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী, মাদুরো একবার মার্কিন আদালতে পৌঁছে গেলে এই যুক্তিগুলো আইনি কার্যক্রমে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবে না।

ট্রাম্প এবং তাঁর শীর্ষ সহযোগীরা মাদুরোকে বন্দী করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁরা উল্লেখ করেছেন, আমেরিকা এবং অন্যান্য অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে মাদুরোকে একজন অবৈধ নেতা হিসেবে দেখে আসছে, যিনি সর্বশেষ নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও ক্ষমতা দখল করে রেখেছেন। কর্মকর্তারা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে এই নজিরবিহীন সামরিক অভিযানকে একটি সাধারণ আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রম হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, যেখানে বিচার বিভাগকে সহায়তা করার জন্য সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে।

শনিবার ট্রাম্পের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘মূলত এটি ছিল মার্কিন বিচারব্যবস্থার চোখে পলাতক দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করার একটি ঘটনা।’

শনিবার নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে মাদুরোর বিরুদ্ধে চার দফার একটি অভিযোগনামা প্রকাশ করা হয়। এতে অভিযোগ করা হয়েছে—তিনি, তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে লাভবান হয়েছেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে মাদক-সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র রাখা।

অভিযোগনামায় বলা হয়েছে, ‘আসামি এবং বর্তমান ওই অবৈধ শাসকগোষ্ঠীর অন্যান্য দুর্নীতিবাজ সদস্যরা কোকেনের মুনাফা দিয়ে সহিংস মাদক-সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। এই মাদক-সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো কেবল ভেনেজুয়েলার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেনি এবং তাদের কাছে মুনাফা পাঠায়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর প্রতিটি পয়েন্টে কোকেনের বর্ধিত মূল্যের সুবিধাও ভোগ করেছে, যেখানে চাহিদা এবং দাম সবচেয়ে বেশি।’

মার্কিন ফেডারেল আদালতে একজন বিদেশি নেতার এই বিস্ময়কর বিচার মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে রাতারাতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান চালিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে বন্দী করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসার ফল।

শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প মাদুরোকে আটকের পেছনে আরও বিস্তৃত কারণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা আমেরিকার তেল চুরি করেছে—এমন অভিযোগেও এই হামলা যুক্তিযুক্ত। যদিও এই তেলের বিষয়টি মূল অভিযোগনামায় নেই। তিনি আরও বলেন, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকা এই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটি ‘চালনা’ করবে।

সমালোচকেরা বলছেন, ট্রাম্পের যুক্তিগুলো আরও আইনি প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। সিনেট সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্সের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক আর ওয়ার্নার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিদেশি নেতাদের আক্রমণ ও বন্দী করার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার দাবি করে, তবে চীনকে তাইওয়ানের নেতৃত্বের ওপর একই অধিকার দাবি করা থেকে কে ঠেকাবে? ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করার জন্য একই ধরনের যুক্তি দেখানো থেকে কে থামাবে? একবার এই সীমা অতিক্রম করলে বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর নিয়মগুলো ভেঙে পড়বে এবং স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীগুলো সবার আগে এর সুযোগ নেবে।’

তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিষয়গুলো কংগ্রেস বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু মার্কিন আদালতে মাদুরো ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মিলিটারি ল অ্যান্ড পলিসির প্রধান এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক শীর্ষ আইনি উপদেষ্টা জিওফ্রে কর্ন বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক মামলার রায়ে এটি স্পষ্ট যে, ‘আপনি এটি দাবি করতে পারেন না যে, আপনাকে অপহরণ করা হয়েছে এবং তাই আদালত আপনার ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবে না। মাদুরোকে তথাকথিত অপহরণ করে আনা হলেও তিনি বিচার এড়াতে পারবেন না, এমনকি যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।’ তবে কর্ন এ-ও যোগ করেন, তাঁর মতে প্রশাসনের এই রাতারাতি সামরিক অভিযানের কোনো ‘গ্রহণযোগ্য আইনি ভিত্তি’ ছিল না।

হার্ভার্ডের আইনের অধ্যাপক জ্যাক গোল্ডস্মিথ, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের বিচার বিভাগের অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সেলের প্রধান ছিলেন, তিনি সাবস্ট্যাকে উল্লেখ করেছেন—১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি পানামার নেতা ম্যানুয়েল আন্তোনিও নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরও একই ধরনের যুক্তি তোলা হয়েছিল। আদালত তখন সরকারের বিচার করার অধিকার বহাল রেখেছিলেন এবং ১৯৯২ সালে মাদক মামলায় নরিয়েগা দোষী সাব্যস্ত হয়ে ৪০ বছরের কারাদণ্ড পান।

শনিবার মাদুরোর বিরুদ্ধে যে অভিযোগনামাটি প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি মূলত ২০২০ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় করা অভিযোগের একটি হালনাগাদ সংস্করণ। সে সময় মার্কিন নেতারা স্বীকার করেছিলেন, তাঁরা ভেনেজুয়েলায় ঢুকে মাদুরোকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন না। তখন ওই অভিযোগের ফলে তিনি একজন আন্তর্জাতিক পলাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন, যার অর্থ ছিল দেশের বাইরে গেলেই তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন।

এই নতুন অভিযোগনামায় ২০২০ সালের সেই চারটি অভিযোগ রয়েছে। তবে এবার তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও আসামি করা হয়েছে, যিনি ২০২০ সালের মামলায় ছিলেন না। এ ছাড়া মাদুরোর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের আরও কয়েকজন নতুন আসামির নাম যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন মাদুরোর ছেলে নিকোলা আর্নেস্তো মাদুরো। তবে মাদুরোর ছেলেকে আটক করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, মাদুরো এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরা আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভেনেজুয়েলাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণে কোকেন পাঠানোর একটি ট্রানজিট হাবে পরিণত করেছেন। অভিযোগনামায় বলা হয়েছে, মাদুরো ও তাঁর সহযোগীরা দুর্নীতির এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছেন যেখানে ভেনেজুয়েলার অভিজাতরা মাদক পাচারের মাধ্যমে নিজেদের সম্পদশালী করেছেন। পাচারকারীরা সুরক্ষা এবং সাহায্যের বিনিময়ে এই নেতাদের মুনাফার একটি অংশ দিত।

অভিযোগনামায় বলা হয়েছে, ‘পরিবর্তে এই রাজনীতিবিদেরা মাদক থেকে আসা অর্থ ব্যবহার করে তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছেন এবং বৃদ্ধি করেছেন।’ নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক জেরেমি পল বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো আইনি কর্তৃত্ব ছিল না। তবে তিনিও একমত, এটি সম্ভবত মাদুরোর বিচারকে বাধাগ্রস্ত করবে না।

পল বলেন, প্রশাসনের এই যুক্তি একটি ‘ভয়াবহ তত্ত্ব’, কারণ এর মাধ্যমে মূলত বলা হচ্ছে যে অন্য কোনো দেশে সামরিক বাহিনী পাঠানোর জন্য মার্কিন প্রসিকিউটর এবং গ্র্যান্ড জুরির সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। তিনি বলেন, ‘এটি আইন হতে পারে না।’

এ ছাড়া সাবেক হন্ডুরান প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ক্ষমা করে দেওয়ার এক মাস পরেই ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরোকে বন্দী করায় ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। হার্নান্দেজ গত বছর মাদক পাচারের মামলায় মার্কিন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কে মাদুরোর মামলাটি দৈবচয়ন ভিত্তিতে ৯২ বছর বয়সী বিচারক আলভিন হেলারস্টেইনের কাছে পড়েছে। তিনি প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময় নিযুক্ত হয়েছিলেন। গত বছর এই বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অ্যালিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট’ ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার অভিবাসীদের বিতাড়িত করার প্রচেষ্টায় বাধা দিয়েছিলেন। সেই বিষয়টি এখন আপিল পর্যায়ে রয়েছে।

শনিবার হেলারস্টেইন মাদুরোর মামলায় কোনো পদক্ষেপ নেননি এবং আদালতে হাজির হওয়ার সময়ও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিসহ সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সপ্তাহান্তেই মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে নিউইয়র্কে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমছে না, প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা

ব্যবসায়ী নেতাদের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিল বিএনপি

প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা: বিকেলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে দুশ্চিন্তায় পরীক্ষার্থীরা

জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন করতে দেওয়া স্বৈরাচারকে পুনর্বাসন: আখতার

আসামে ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, অনুভূত বাংলাদেশেও

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত