Ajker Patrika

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিল ট্রাম্পের টেবিলে, ১০০% শুল্কের ঝুঁকিতে ভারত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিল ট্রাম্পের টেবিলে, ১০০% শুল্কের ঝুঁকিতে ভারত
ফাইল ছবি

রাশিয়ার কর্মকর্তা ও দেশটির অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে মার্কিন কংগ্রেসের হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদ একটি প্যাকেজ অনুমোদন লাভ করেছে। এই বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সই করলেই আইনে পরিণত হবে। এর ফলে ভারতের সামনে নতুন করে শুল্কের হুমকি তৈরি হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে আনা ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব–২০২৬’ নামের এই বিলের আওতায় রাশিয়ার জ্বালানি কিনছে এমন দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও চীনও রয়েছে।

গত মাসে মার্কিন সিনেটে পাস হওয়া বিলটি এবার প্রতিনিধি পরিষদে ২৬২-১৫৯ ভোটে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। এখন এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যাবে। ট্রাম্প স্বাক্ষর করলে এটি আইনে পরিণত হবে। ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ইউক্রেনকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হিসেবে এই আইনপ্রস্তাবকে দেখা হচ্ছে।

বিলটিতে ভারতসহ যেসব দেশের নাম রয়েছে

হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্টের কাছে যাওয়ার পথে বিলটিকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্য এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাদের যুক্তি, বিলটি প্রেসিডেন্টকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়ে দেবে।

ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান স্টেনি হোয়ার একটি সংশোধনী প্রস্তাব করেন। এতে স্পষ্টভাবে ১০টি দেশের নাম উল্লেখ করার কথা বলা হয়েছে। দেশগুলো হলো—চীন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, হাঙ্গেরি, কিরগিজস্তান ও স্লোভাকিয়া। বিলের ‘সেকেন্ডারি ট্যারিফ’ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের শুল্ক ব্যবস্থার আওতায় এসব দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ থাকবে। বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি তাঁকে দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তখন ভারতের ওপর এই ধরনের শুল্ক আরোপ হতে পারে।

নিজের সংশোধনীর পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে হোয়ার সহকর্মীদের বলেন, প্রেসিডেন্ট কী করবেন, তা তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। তবে যুদ্ধ নিয়ে তারা কোন অবস্থানে আছেন, তা স্পষ্টভাবে জানাতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এই বিল পাস করতে ব্যর্থ হই, তাহলে ক্রেমলিনে উল্লাস হবে এবং কিয়েভে অশ্রু ঝরবে।’ তিনি আরও বলেন, তাঁর প্রস্তাবিত সংশোধনী ‘দেশগুলোর নাম উল্লেখ করে আইনগত শুল্ক আরোপের ক্ষমতার পরিধি আরও নির্দিষ্ট করবে।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

বিলে কী প্রস্তাব করা হয়েছে

এই বিলের লক্ষ্য শুধু রাশিয়ার নেতৃত্ব ও জ্বালানি খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়। রাশিয়া যাতে তেল সরবরাহের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে না পারে, সেই কাজে ব্যবহৃত জাহাজগুলোর ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহরের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য চীন, ভারতসহ অন্যান্য দেশের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ট্রাম্পকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে।

বিলটি পাস হওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল বলেন, ‘চীন ও ভারত, তোমাদের তেল ও গ্যাস অন্য কোথাও থেকে কিনতে হবে।’ ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শ্যাহিন বলেন, ‘রাশিয়া শ্যাডো ফ্লিট ব্যবহার করে সেই তেল ও গ্যাস বিক্রি করছে। এর অর্থ হলো, এসব জ্বালানি বাজারদরের চেয়ে কম দামে কেনা হচ্ছে এবং এর বেশিরভাগই চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোতে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়ার তেল ও গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীন শীর্ষে রয়েছে। তাই আমাদের শুধু পুতিনকে নয়, চীনকে এবং যারা রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কিনছে তাদের সবাইকে খুব শক্ত বার্তা দিতে হবে যে এর জন্য তাদের মূল্য দিতে হবে।’

ভারতের শুল্কঝুঁকি আরও বাড়ল

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রস্তাবিত শুল্ক বৃদ্ধির কারণে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও প্রভাবিত হতে পারে। ফরচুন ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইসিআরএ লিমিটেডের প্রধান অর্থনীতিবিদ অদিতি নায়ার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উচ্চতর শুল্ক আরোপ এবং এর সঙ্গে যুক্ত অনিশ্চয়তা ভারতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

তবে ভারতের ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে কী ধরনের শুল্ক কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বিলটি আইনে পরিণত হয় কি না এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে দেওয়া ক্ষমতা ব্যবহার করেন কি না, তার ওপর। তবে এই বিল ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার আরও একটি স্তর যোগ করেছে।

ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে রাশিয়া থেকে ভারতের বিপুল পরিমাণ তেল আমদানির। তবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি। গত বছরের আগস্টে ট্রাম্প রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানির কারণে ভারতের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। এর সঙ্গে আগে থেকেই থাকা ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কও ছিল।

তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার তেল-সংক্রান্ত অতিরিক্ত শুল্কটি প্রত্যাহার করা হয়। একই সময়ে পারস্পরিক শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে একটি বাণিজ্য কাঠামো তৈরি হলেও সেটি এখনো অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ভারতের ওপর যদি ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে ভারতকে এটাই হবে সবচেয়ে বেশি শুল্কের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা। এর সঙ্গে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, সেটিও থাকবে। জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্য আমদানি বন্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার শাস্তি হিসেবে এই ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত