Ajker Patrika

তুরস্ককে যুদ্ধে জড়ানোর ফাঁদ ছিল সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা: মার্কিন দূত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৫৩
তুরস্ককে যুদ্ধে জড়ানোর ফাঁদ ছিল সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা: মার্কিন দূত
তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক। ছবি: এএফপি

গত সপ্তাহে সিরিয়ার এক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল। এই হামলা আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে তুরস্ককে সংঘাতে জড়ানোর রাজনৈতিক চেষ্টা বা ফাঁদ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক। গতকাল শনিবার আঙ্কারায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যন্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি হামলার পর এটি ছিল এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা।

হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তুরস্ক ওই ঘাঁটিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই ঘাঁটিটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষকেরা তখন ধারণা করেছিলেন, তুরস্ক ওই ঘাঁটিতে বিমান প্রতিরক্ষা রাডার ও আক্রমণকারী ড্রোন মোতায়েন করতে চেয়েছিল।

শনিবার এক অনলাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বারাক বলেন, এসব দাবি ভিত্তিহীন। তাঁর ভাষ্য, ওই স্থানে তুরস্কের কোনো সামরিক সরঞ্জাম বা সামরিক সম্পদ ছিল না। এমনকি আঙ্কারারও ঘাঁটিটিতে প্রবেশ বা সেখানে নিজেদের অবস্থান তৈরির কোনো পরিকল্পনা ছিল না। মার্কিন দূত ইঙ্গিত দেন, অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের আগে ইসরায়েল হয়তো তুরস্ককে ‘ফাঁদে ফেলতে’ চেয়েছিল। তিনি এটিকে ‘খুবই আগ্রাসী, কিন্তু নির্বাচনের আগে বেশ গ্রহণযোগ্য একটি কৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। নির্বাচনে নেতানিয়াহু জনমত জরিপে পিছিয়ে রয়েছেন।

হামলার পরপরই বারাক বলেছিলেন, তুরস্ক চাইলে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ঠেকাতে নিজেদের যুদ্ধবিমান আকাশে তুলতে পারত। এতে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি ছিল। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেও’ গড়াতে পারত। একই সাক্ষাৎকারে বারাক ইসরায়েলি হামলার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ‘ভুল যোগাযোগের’ কথাও বলেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর দপ্তর, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি বা ভুল বোঝাবুঝি থেকেও হামলাটি হয়ে থাকতে পারে।

বারাকের এসব মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। ইহুদিদের সাপ্তাহিক ধর্মীয় বিশ্রামের দিন গতকাল শনিবার বিকেলে এমন বিবৃতি দেওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক হলেও তিনি সেদিনই বিবৃতিটি প্রকাশ করেন। কাৎজ বলেন, ‘স্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের’ ভিত্তিতে আবু আল-দুহুরে হামলা চালানোর সুপারিশ আইডিএফ একাধিকবার করেছিল। তাঁর দাবি, তুরস্ক ওই ঘাঁটিতে ‘অভিযান পরিচালনা’ করতে চেয়েছিল।

কাৎজ আরও দাবি করেন, সিরিয়ার সরকারকে সরাসরি সতর্ক করা হয়েছিল এবং হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রকেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তবে বারাক এই দাবি অস্বীকার করেন। কাৎজ বলেন, ‘ (তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ) এরদোয়ানকে হাতেপায়ে ধরা হয়েছিল এবং তাঁকে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়েছে।’ হামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে তুলে ধরার যে চেষ্টা হচ্ছে, তারও নিন্দা করেন তিনি।

বারাক গোলান মালভূমিকে ‘দখলকৃত সিরীয় ভূখণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করায়ও কাৎজ তাঁর সমালোচনা করেন। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইসরায়েল গোলান মালভূমি দখল করে এবং পরে অঞ্চলটি নিজেদের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেয়। কাৎজ বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ওই ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

তুরস্ক সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের অন্যতম প্রধান সমর্থক। সাবেক ইসলামপন্থী এই নেতা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সিরিয়ার প্রায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়ে যায় এবং প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হন। যুদ্ধের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনে দামেস্ককে সামরিক প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও রসদ সহায়তা দিয়েছে আঙ্কারা।

তবে ইসরায়েল শারার সরকারকে হুমকি হিসেবে দেখে। শারার ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন নতুন সরকারের বিরুদ্ধে ইসরায়েল সিরিয়ায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। আসাদ সরকারের সামরিক অবকাঠামোর বড় একটি অংশ ধ্বংস করার পাশাপাশি দক্ষিণ সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাও দখলে নিয়েছে ইসরায়েল। তারা এসব এলাকা নিজেদের ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ হিসেবে অভিহিত করছে।

গৃহযুদ্ধের সময় তুরস্ক উত্তর সিরিয়ায় একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। সেই সময় থেকে সেখানে এখনো হাজার হাজার তুর্কি সেনা অবস্থান করছে। সিরিয়ায় এমন সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলার বিরোধিতা করে আসছে ইসরায়েল, যা ওই অঞ্চলে তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে, বিশেষ করে সিরিয়ার আকাশসীমায়।

আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটি সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ইদলিব প্রদেশে, তুরস্কের সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গৃহযুদ্ধের সময় ইদলিব ছিল বিদ্রোহীদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। বিমানঘাঁটিটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় অচল অবস্থায় ছিল। তবে সম্প্রতি এটিকে আবার চালু করার কাজ চলছিল। তুরস্কের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে একটি তুর্কি প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটিতে গিয়ে পুনরায় চালু করার কাজ পরিদর্শন করেছিল।

ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্ক ২০২৪ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হতে শুরু করে। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিরোধ তীব্র হওয়ার পর আঙ্কারা ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্থগিত করে। এরপর থেকে দুই দেশের মতপার্থক্য আরও বেড়েছে, বিশেষ করে সিরিয়া নিয়ে। জুনে ইসরায়েল যখন সিরিয়া ও লেবাননে সামরিক অভিযান চালাচ্ছিল, তখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছিলেন, ‘তুরস্কের নিরাপত্তা...শুরু হয় আলেপ্পো থেকে, শুরু হয় দামেস্ক থেকে, শুরু হয় বৈরুত থেকে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের ভাইদের ওপর কোনো হামলার দিকে চোখ বন্ধ করে থাকব না।’

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগও বাড়ছে। ইসরায়েল এখন তুরস্কের এই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে নিজেদের জন্য একটি স্বতন্ত্র নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরছে। এমনকি কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিক ও বিশ্লেষক তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ বলেও অভিহিত করছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত