Ajker Patrika

ইরান উপসাগরীয় প্রায় সব দেশেই আক্রমণ চালালেও কেন ওমানে চালায়নি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ০৮: ৪৩
ইরান উপসাগরীয় প্রায় সব দেশেই আক্রমণ চালালেও কেন ওমানে চালায়নি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি। ছবি: এএফপি

স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার ভোরে বিশ্ববাসী ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের খবরে জেগে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণের প্রতি এক ভাষণে তাদের ‘নিজেদের সরকার দখল করে নেওয়ার’ আহ্বান জানান। একই সময় তেল আবিব ইরানে হামলা চালায় এবং তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে তার জবাব দেয়। দুবাই থেকে দোহা—সবখানেই যখন সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, তখন উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি দেশ ব্যতিক্রম হিসেবে নজর কাড়ে। ওমান—যাকে প্রায়ই ‘মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ বলা হয়। পুরো সময়টা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল ওমান।

ইরান ও ওমানের এই সম্পর্কের মূলে রয়েছে ইতিহাস, ভূগোল, কূটনীতি এবং কৌশলগত বাস্তববাদের এক সংমিশ্রণ, যার শিকড় ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে প্রোথিত।

ওমানের সুলতান কাবুস বিন সাইদের বিরুদ্ধে ধোফার বিদ্রোহের সময় ইরানের শাহ হাজার হাজার ইরানি সৈন্য পাঠিয়েছিলেন মার্ক্সবাদী বিদ্রোহীদের পরাজিত করতে। এর ফলে মাস্কাট ও তেহরানের মধ্যে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা বন্ধন তৈরি হয় যা পরবর্তী দশকগুলোতেও অব্যাহত ছিল। এমনকি ১৯৭৯ সালের পর যখন উপসাগরীয় অনেক রাজতন্ত্র বিপ্লবী ইরানকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে, ওমান তখনও সেই সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।

এই প্রাথমিক সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা তৈরিতে সহায়ক ছিল, যা ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও টিকে থাকে। দুই দেশের কাছেই এই সম্পর্ক অত্যন্ত ‘গভীর’ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সদিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

ইরান ও ইসরায়েলের বর্তমান সংঘাতের ক্ষেত্রেও ওমানের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা—জিসিসির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ওমানের একটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থান রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে তারা সৌদি আরব বা অন্য প্রতিবেশীদের ইরান-বিরোধী অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মাস্কাট মূলত একটি 'হস্তক্ষেপহীন' কৌশল অনুসরণ করে এবং ইরান ও পশ্চিমা শক্তি—উভয় পক্ষের সাথেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। এই কৌশলটি সংঘাতের সময় ওমানের জন্য বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

ওমান বারবার ইরান ও তার শত্রুদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। ওমানই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সেই গোপন আলোচনার আয়োজন করেছিল যা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির পথ প্রশস্ত করেছিল। এমনকি বর্তমানের মতো চরম উত্তেজনার সময়েও ওমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার পথ সুগম করে একটি কূটনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, মাস্কাটকে আক্রমণ করা একটি ব্যয়বহুল ঝুঁকি। এর ফলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের সেই হাতেগোনা কয়েকটি দেশের একটিকে হারাবে, যারা সংকটের সময়ও যোগাযোগের পথ খোলা রাখে।

এরপর আসে ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট। ওমান ও ইরান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালী তদারকি করে, যা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। এই জলপথে স্থিতিশীলতা দুই দেশের জন্যই প্রয়োজন। তাই ওমান ও ইরান উভয়ই সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ট্যাংকার রুট রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে।

অর্থনৈতিকভাবেও এটি একটি পারস্পরিক লাভজনক ব্যবস্থা। প্রস্তাবিত ইরান-ওমান গ্যাস পাইপলাইনের মতো পরিকল্পনা রয়েছে যা ওমানকে ইরানি গ্যাস রপ্তানির কেন্দ্রে পরিণত করবে। এটি নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের জন্য বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পর্যটন, বাণিজ্য এবং জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত সংযোগ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ওমান ইরানের কাছে এমনভাবে গুরুত্বপূর্ণ যা উপসাগরীয় অন্য অনেক দেশ নয়।

উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর সাথে ইরানের সংঘাত মূলত প্রক্সি গোষ্ঠী, সামুদ্রিক ঘটনা, সাইবার তৎপরতা বা রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে হয়েছে; সরাসরি রাষ্ট্র-বনাম-রাষ্ট্র যুদ্ধ হিসেবে নয়। প্রচলিত যুদ্ধে ইরান কখনোই সরাসরি অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে আক্রমণ করেনি। তাদের সাথে ইরানের সংঘাতের মূল কারণ হলো—বেশ কিছু জিসিসি সদস্য দেশ বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে, ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমর্থন দেয়, ইয়েমেন ও সিরিয়ার মতো যুদ্ধে বিরোধী পক্ষকে সহায়তা করে এবং সৌদি আরবের আঞ্চলিক কৌশলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকে।

ওমান, উপসাগরীয় অঞ্চলের এক ব্যতিক্রমী এবং সতর্ক নিরপেক্ষ পক্ষ হিসেবে এ ধরনের সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু হওয়া এড়িয়ে চলেছে।

সর্বোপরি এখানে আস্থার বিষয়টি প্রধান। ওমানের ‘ভারসাম্যপূর্ণ নীতি’ এবং শান্তিভিত্তিক কূটনীতি ইরানি নেতাদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। অন্যদিকে, মাস্কাট চরম সংকটের সময়েও যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সচল রেখেছে।

২০০২ সালের নভেম্বরে কাউন্সিল অব ওমানের বার্ষিক অধিবেশনে ওমানের তৎকালীন শাসক সুলতান কাবুস বিন সাইদ বলেছিলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবার কাছে সুপরিচিত; আমরা সর্বদা সত্য, ন্যায়বিচার, বন্ধুত্ব ও শান্তির পক্ষে থাকি এবং জাতিগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান জানাই।’ দীর্ঘদিন ধরে এর অর্থ দাঁড়িয়েছে—চরম বৈশ্বিক চাপের মুখেও নিজেদের কঠোরভাবে নিরপেক্ষ রাখা। আর ওমান এই কাজটি নিখুঁতভাবে করে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত