ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও চতুর্থবারের মতো জিতলেন লুলা

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা গতকাল রোববারের নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। এ নিয়ে তিনি নজিরবিহীনভাবে ব্রাজিলের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। দেশটির নির্বাচনী আদালত এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
এই বিস্ময়কর ফলাফল বুথফেরত জরিপ, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং বিশ্বজুড়ে বিদায়ী সরকারের বিরুদ্ধে জনমতের প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে পুরো লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থীদের জয়ের ধারাকে থামিয়ে দিয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে বামপন্থীদের অন্যতম প্রতীক এবং এই শতাব্দীতে ব্রাজিলের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব লুলা পরাজিত করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ পুত্র, সিনেটর ফ্ল্যাভিও বলসোনারোকে। প্রথম ধাপের নির্বাচনে এগিয়ে থাকায় সিনেটর বলসোনারো আশা করেছিলেন যে তিনি তাঁর বাবার চরম-ডানপন্থী আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবেন।
দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এবং নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে বছরের পর বছর ধরে ভোটাররা লুলার নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টির ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। ফলে একসময় লুলার পুনর্নির্বাচন অনেকটাই অনিশ্চিত মনে হচ্ছিল। এ ছাড়া অ্যাপভিত্তিক আধুনিক অর্থনীতি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ক্রমবর্ধমান কর্মীদের কাছে সাবেক এই মেটালওয়ার্কার ও শ্রমিক নেতা কিছুটা বেমানান বা যুগের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়েছিলেন।
লুলার এই জয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন। ৮০ বছর বয়সী এই নেতা ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগে কারাবাস ভোগ করেন। পরবর্তীকালে সেই অভিযোগ বাতিল হয়ে গেলে ২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করার সুযোগ পান।
ভোট গণনার সময় সাও পাওলোতে লুলার সঙ্গে থাকা বামপন্থী আইনপ্রণেতা এরিকা হিলটন রয়টার্সকে বলেন, ‘তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক, একজন মহামানব।’
জরিপকারীরা জানান, প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভোটারদের উপস্থিতি লুলাকে এই জয় এনে দিয়েছে। থিংক পলিসি নামক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা লিওনার্দো বারেতো বলেন, ভোটাররা বলসোনারোর নতুনত্ব বা অনিশ্চয়তার চেয়ে লুলার চেনা ও নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বকে বেছে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন কিছুটা উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের দিকে যাওয়া এবং চেনা পথে হাঁটার মধ্যে একটিকে বেছে নিচ্ছে, যা তাদের নির্দিষ্ট কিছু অধিকার নিশ্চিত করে।’
প্রচারণার সময় লুলা তাঁর শাসনামলে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরেন। পাশাপাশি তাঁর তৃতীয় মেয়াদের সময় বেকারত্ব, নিরক্ষরতা এবং বন উজাড়ের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রিটার্ন কিং বা প্রত্যাবর্তনের রাজা
১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর লুলাই প্রথম প্রার্থী যিনি প্রথম ধাপের নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছেন। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা লুলা বাস্তববাদিতা ও জনপ্রীতিবাদের (পপুলিজম) এক শক্তিশালী মিশ্রণে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। গত অর্ধশতক ধরে জাতীয় রাজনীতিতে এই কৌশলই তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে তিনি শ্রমিক ও দরিদ্র ব্রাজিলীয়দের জীবনমান উন্নত করতে বেশ কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।
প্রচারণার শেষ দিকে তিনি দেশজুড়ে বিনা মূল্যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গণপরিবহন সেবা (যা কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করতে হবে) থেকে শুরু করে তাঁর স্বপ্নের সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির তহবিল ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করার মতো প্রতিশ্রুতি দেন, যা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এ ছাড়া লুলা একটি সাংবিধানিক সংশোধনীর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখেন, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শ্রম সংস্কার হিসেবে কংগ্রেসে ব্যাপক সমর্থনে পাস হয়।
তা সত্ত্বেও, লুলার এই চতুর্থ মেয়াদটি সবচেয়ে কঠিন হতে পারে। কারণ, দেশটিতে ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর সবচেয়ে রক্ষণশীল কংগ্রেস (সংসদ) নির্বাচিত হয়েছে। বলসোনারোর লিবারেল পার্টি (পিএল) এবং তাদের মিত্র দলগুলো যৌথভাবে নিম্নকক্ষে ২৮০টিরও বেশি আসন এবং সিনেটে ৫০টি পর্যন্ত আসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা উভয় কক্ষে তাদের সুবিধাজনক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেবে।








