Ajker Patrika

মাদুরোর ঘনিষ্ঠদের হাতেই ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২: ৪৪
নিকোলাস মাদুরো। ছবি: এএফপি
নিকোলাস মাদুরো। ছবি: এএফপি

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে নিজ দেশ থেকে ধরে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনাকে ‘অভূতপূর্ব এবং শক্তিশালী’ বলে প্রশংসা করলেও তেলসমৃদ্ধ এই দেশটি এখন কে চালাবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আপাতত মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মিত্ররাই দেশটির ক্ষমতা ধরে রেখেছেন।

গতকাল শনিবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, মাদুরো গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশটির সরকারের শীর্ষ মহলের প্রভাবশালী চক্রের অন্যতম সদস্য ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ শপথ গ্রহণ করেছেন। তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও ট্রাম্প জানান। এর ফলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে, রদ্রিগেজই হয়তো ক্ষমতার হাল ধরবেন।

ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী, মাদুরোর অনুপস্থিতিতে রদ্রিগেজই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন। শনিবার গভীর রাতে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতও তাঁকে এই দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দেন। ট্রাম্পের মন্তব্যের কিছুক্ষণ পরই রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হন। পাশে ছিলেন তাঁর ভাই ও ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ। রদ্রিগেজ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার একমাত্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল আছেন।

তাঁদের এই যৌথ উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, মাদুরোর সঙ্গে যাঁরা ক্ষমতার ভাগীদার ছিলেন, তাঁরা অন্তত এখন পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ আছেন। শনিবার ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিরোধীদলীয় নেত্রী ও নোবেল বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে কাজ করার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। মাচাদোকে মাদুরোর সবচেয়ে যোগ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ট্রাম্পের দাবি, দেশের ভেতরে তাঁর জনসমর্থন নেই।

২০২৪ সালের নির্বাচনে মাচাদোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছিলেন, মাচাদোর মনোনীত প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। যদিও মাদুরোর সরকার নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করে আসছিল।

এক দশকের বেশি সময় ধরে ভেনেজুয়েলার প্রকৃত ক্ষমতা একদল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার হাতে সীমাবদ্ধ। তবে বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থাটি টিকে আছে অনুগত বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর একটি বিশাল নেটওয়ার্কের ওপর ভর করে, যার জ্বালানি হলো দুর্নীতি এবং নজরদারি।

এই অভ্যন্তরীণ চক্রের মধ্যে একটি বেসামরিক-সামরিক ভারসাম্য বজায় থাকে। প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব স্বার্থ এবং অনুগত গোষ্ঠী রয়েছে। বর্তমানে রদ্রিগেজ ও তাঁর ভাই বেসামরিক পক্ষটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আর পাদ্রিনো ও কাবেলো প্রতিনিধিত্ব করছেন সামরিক পক্ষের।

ভেনেজুয়েলার বিষয়ে ফৌজদারি তদন্তে যুক্ত সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, এই শাসনকাঠামোর কারণেই মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে বর্তমান সরকারকে উৎখাত করা অনেক বেশি জটিল। তিনি বলেন, ‘আপনি ভেনেজুয়েলা সরকারের যতগুলো অংশই সরান না কেন, পরিস্থিতি বদলাতে হলে বিভিন্ন স্তরে অনেক পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন এখন দিওসদাদো কাবেলোকে নিয়ে। দেশটির সামরিক ও বেসামরিক কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সংস্থাগুলোর ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, যারা দেশজুড়ে গোয়েন্দাগিরি চালায়। ভেনেজুয়েলার সামরিক কৌশলী হোসে গার্সিয়া বলেন, ‘সবার নজর এখন দিওসদাদো কাবেলোর দিকে। কারণ, তিনি এই শাসনের সবচেয়ে আদর্শবাদী, সহিংস এবং এমন একজন ব্যক্তিত্ব; যিনি কখন কী করবেন আগে থেকেই অনুমান করা যায় না।’

জাতিসংঘের তদন্তে দেখা গেছে, বেসামরিক সংস্থা সেবিন (SEBIN) এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিসিআইএম উভয়ই ভিন্নমত দমনের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। মাদুরো ধরা পড়ার আগে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ১১ জন সাবেক বন্দী, যাদের মধ্যে কেউ কেউ আগে নিরাপত্তা বাহিনীতেই কর্মরত ছিলেন, ডিজিসিআইএমের গোপন আস্তানায় বৈদ্যুতিক শক, পানিতে চুবিয়ে শ্বাসরোধের অনুকরণ এবং যৌন নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন।

২০২০ সালে সামরিক বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক এক ডিজিসিআইএম এজেন্ট বলেন, ‘ওরা আপনাকে বোঝাতে চায় যে হাতির খাঁচার ভেতরে আপনি একটি তেলাপোকা মাত্র, অর্থাৎ ওরা আপনার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে, তখন কাবেলো সরাসরি টেলিভিশনে এসে ডিজিসিআইএমকে নির্দেশ দিয়েছেন ‘সন্ত্রাসীদের ধরে আনতে’ এবং সতর্ক করেছেন, ‘কেউ দলছুট হলে আমরা তা জেনে যাব।’

শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়েও তিনি একই ধরনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। সে সময় তাঁর গায়ে ছিল ফ্ল্যাক জ্যাকেট ও হেলমেট এবং চারপাশ ঘিরে ছিল ভারী অস্ত্রধারী রক্ষীরা। এ ছাড়া কাবেলোর সঙ্গে ‘কোলেক্তিভোস’ নামক মোটরসাইকেল আরোহী সশস্ত্র বেসামরিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রভাবশালী নেতা কাবেলোর সশস্ত্র বাহিনীর একটি বড় অংশের ওপর প্রভাব রয়েছে, যদিও ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ বছর ধরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলায় জেনারেল ও অ্যাডমিরালদের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। বর্তমান ও সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তারা খাদ্য বিতরণ, কাঁচামাল এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি কয়েক ডজন জেনারেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদেও রয়েছেন।

সাবেক ও বর্তমান মার্কিন তদন্তকারীরা বলছেন, শুধু সরকারি চুক্তিই নয়, সামরিক কর্মকর্তারা অবৈধ ব্যবসা থেকেও মুনাফা অর্জন করেন। রয়টার্সের হাতে আসা এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে শেয়ার করা বিরোধী দলের এক নিরাপত্তা পরামর্শকের নথিতে দেখা গেছে, কাবেলো ও পাদ্রিনোর ঘনিষ্ঠ কমান্ডারদের ভেনেজুয়েলার সীমান্ত ও শিল্পাঞ্চলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্রিগেডগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ব্রিগেডগুলো কৌশলগতভাবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এগুলো বড় ধরনের চোরাচালান পথের ওপরেও অবস্থিত।

ভেনেজুয়েলা সরকারের সাবেক এক শীর্ষ নেতার আইনজীবী বলেন, ‘এই সরকারকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে হলে সামরিক বাহিনীর অন্তত ২০ থেকে ৫০ জন কর্মকর্তাকে সরানোর প্রয়োজন হতে পারে, হয়তো তার চেয়েও বেশি।’ তবে কেউ কেউ পক্ষ পরিবর্তনের চিন্তাও করছেন। ওই আইনজীবী জানান, মাদুরো গ্রেপ্তার হওয়ার পর ডজনখানেক সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমান জেনারেল মার্কিনদের সঙ্গে আপস করার জন্য যোগাযোগ করেছেন। তারা নিরাপদ প্রস্থান ও আইনি দায়মুক্তির বিনিময়ে গোয়েন্দা তথ্য দিতে চেয়েছেন।

তবে কাবেলোর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি এই মুহূর্তে কোনো ধরনের আপস করতে আগ্রহী নন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমছে না, প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা

ব্যবসায়ী নেতাদের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিল বিএনপি

প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা: বিকেলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে দুশ্চিন্তায় পরীক্ষার্থীরা

জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন করতে দেওয়া স্বৈরাচারকে পুনর্বাসন: আখতার

আসামে ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, অনুভূত বাংলাদেশেও

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত