জ্ঞানেশের অনিয়ম নিয়ে দুই কমিশনারের চিঠি জ্ঞানেশের কাছেই ফেরত পাঠান কেবিনেট সচিব

ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে অসন্তোষের অভিযোগ সামনে এসেছে। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী কাজের দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা জানিয়ে ক্যাবিনেট তথা মন্ত্রিপরিষদ সচিব টিভি সোমনাথনকে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু ওই চিঠিগুলোর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সেগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের দপ্তরে পাঠিয়ে দেন সচিব। ভারতের রাইট টু ইনফরমেশন বা তথ্য অধিকার (আরটিআই) আইনে পাওয়া নথি থেকে এই তথ্য সামনে এসেছে।
এর আগে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথম দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। তার প্রায় এক মাস পর অবসরপ্রাপ্ত কমোডর ও আন্দোলনকর্মী লোকেশ বাত্রার করা আরটিআই আবেদনের জবাবে জানা যায়, ৫ অগস্ট দুই কমিশনারের চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেন ক্যাবিনেট সচিব সোমনাথন। এরপর তিনি বিষয়টি নিয়ে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের মতামত জানতে চান। তবে সিইসি ক্যাবিনেট সচিবালয়কে কোনও জবাব দিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি।
আরটিআইয়ের জবাবে বলা হয়েছে, সোমনাথন দুই কমিশনারের চিঠিকে তাঁদের ‘ব্যক্তিগত ক্ষমতায়’ পাঠানো যোগাযোগ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, চিঠিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হলেও সেগুলোকে নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে দেখা যায় না।
তবে একই চিঠিতে সোমনাথন ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত এবং কার্যকালের মেয়াদ সংক্রান্ত আইনের ১৮ নম্বর ধারার উল্লেখ করেন। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের কাজকর্ম সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যতটা সম্ভব সর্বসম্মতভাবে নিতে হবে। মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে। কমিশন সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজেদের কাজ পরিচালনার পদ্ধতিও নির্ধারণ করতে পারে।
সোমনাথন নিজেই উল্লেখ করেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য নির্বাচন কমিশনারদের মর্যাদা সমান এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে সর্বসম্মতি অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে। তিন সদস্যের কমিশনে দুই নির্বাচন কমিশনার একই বিষয়ে আপত্তি জানানোয় তাঁদের অবস্থান সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের প্রতিনিধিত্ব করছিল।
দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ বণ্টনের নির্দেশ
আরটিআইয়ের জবাবে সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর ২৯ জুলাই লেখা পৃথক দুটি চিঠির প্রতিলিপিও প্রকাশ করা হয়েছে। দুই চিঠিতেই নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মনীশ গর্গের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার ভানু প্রকাশ ইয়েতুরু ২৭ জুলাই থেকে ৯ অগস্ট পর্যন্ত ছুটিতে যাওয়ায় গর্গকে ওই বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২৮ জুলাই দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গর্গ সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, ডিরেক্টর জেনারেল এবং সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের দায়িত্ব বণ্টন করে একটি নির্দেশ জারি করেন।
সান্ধুর অভিযোগ, এই নির্দেশ জারির আগে নির্বাচন কমিশন বা তাঁকে কিছু জানানো হয়নি। কমিশনের সঙ্গে আলোচনা বা অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। অথচ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগেই বারবার মৌখিক ও লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কমিশনের সঙ্গে আলোচনা না করে এ ধরনের পদক্ষেপ করা যাবে না।
২৯ জুলাই ক্যাবিনেট সচিবকে লেখা চিঠিতে সান্ধু জানান, মনীশ গর্গ ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে, ভানু প্রকাশ ইয়েতুরু ছিলেন প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার। ইয়েতুরুর নির্ধারিত বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা লিঙ্ক অফিসার ছিলেন আর এক ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমার।
সান্ধুর বক্তব্য, ইয়েতুরু ছুটিতে যাওয়ার আগে কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে কোনও নির্দেশ জারি করেননি। একইভাবে, তাঁর মূল লিঙ্ক অফিসার সঞ্জয় কুমারও এ ধরনের নির্দেশ দেননি। কিন্তু ২৮ জুলাই হঠাৎ করেই প্রশাসন বিভাগের লিঙ্ক অফিসারের দায়িত্ব গর্গের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং তিনি দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন নির্দেশ জারি করেন।
সান্ধু চিঠিতে লেখেন, গর্গ নিজের পাশাপাশি তাঁর চেয়ে পদমর্যাদায় সিনিয়র এবং সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের কাজও বণ্টন করে দেন। ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার (প্রশাসন) হিসেবে কাজ করার সময়ও গর্গ এর আগে একই ধরনের নির্দেশ জারি করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। সান্ধুর দাবি, এই পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের প্রতিষ্ঠিত রীতির পরিপন্থী এবং ২০২৩ সালের সংশ্লিষ্ট আইনের ১৮ (১) ও ১৮ (২) ধারা লঙ্ঘন করেছে।
ফাইল দেখতে চেয়েও পাননি যোশী
একই দিনে ক্যাবিনেট সচিবকে লেখা পৃথক চিঠিতে বিবেক যোশীও গর্গের কাজের দায়িত্ব বণ্টন সংক্রান্ত নির্দেশ নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁর চিঠির ভাষা সান্ধুর চিঠির সঙ্গে প্রায় একই হলেও, তিনি একটি অতিরিক্ত অভিযোগ করেন। যোশীর বক্তব্য, কাজের দায়িত্ব বণ্টনের আগে নির্বাচন কমিশনকে কিছু জানানো হয়নি। এমনকী, তিনি প্রশাসন বিভাগের কাছে সংশ্লিষ্ট ফাইল দেখতে চাইলেও তাঁকে তা দেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, গর্গ নিজের পাশাপাশি তাঁর চেয়ে সিনিয়র এবং সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের কাজও বণ্টন করেছিলেন। এর আগেও প্রশাসন বিভাগের ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাজ করার সময় গর্গ একবার একই ধরনের নির্দেশ জারি করেছিলেন।
ভোটার-তথ্যভান্ডারের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
এর আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের কাজের দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তনের ফলে ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর ওপর নজরদারির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর কার্যত সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দুই নির্বাচন কমিশনার তাঁদের চিঠিতে ভোটার-সংক্রান্ত সফটওয়্যার ইসিআইনেটের (ECINet) নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
অন্যদিকে, হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমারের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেলের ফাইলগুলো পাঠানো হতো। গর্গের নির্দেশে সঞ্জয় কুমারকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে গর্গ নিজেই ফাইলগুলোর ওপর নজরদারি শুরু করেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছিল, সঞ্জয় কুমারকে সরিয়ে ফাইলগুলো গর্গের মাধ্যমে পাঠানোর নির্দেশ ‘আসলে কার্যকর করা হয়নি’। তবে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছিল, সঞ্জয় কুমারকে আগস্টে তাঁর নিজ রাজ্যের ক্যাডারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্নার ফাইলগুলো গর্গের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনারদের কাছে পাঠানো হতো। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সীমা খান্না ও নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এমন একটি ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা ভোটারদের তথ্যভান্ডারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারতেন না। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন ইলেক্টোরাল রোল অফিসার (ইআরও) এবং ডেপুটি ইলেক্টোরাল রোল অফিসাররা (ডিইআরও)। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাদ দেওয়ার কাজে এই তথ্যভান্ডার ব্যবহৃত হয়।
দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি, কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে তাঁদের আপত্তি এবং ভোটার-তথ্যভান্ডারের ওপর নজরদারির কাঠামো নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।









