চীনের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞায় কেন ক্ষতিগ্রস্ত ইউক্রেন

ইউক্রেনের অন্যতম বৃহৎ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) দেশটির তৈরি পণ্যের ওপর থেকে আমদানি বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কম দামে পণ্য আমদানি ঠেকাতে নেওয়া পদক্ষেপের আওতায় ইউক্রেনকেও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এক কাতারে ফেলা হয়েছে।
ইউক্রেনের ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেটইনভেস্টের প্রধান নির্বাহী ইউরি রিজেনকভ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ইইউতে আমদানি করা ইস্পাতের ওপর সম্প্রতি যে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তা ‘অন্যায্য।’ ইউক্রেন বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা বিবেচনা না করেই এসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনের জন্য অন্তত একটি বিশেষ ছাড় রাখা হোক, যাতে দেশটি ইইউর বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ পায়।
ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইস্পাত আমদানির নীতি নির্ধারণের সময় ইইউ ইউক্রেনের ‘কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েছে।’
সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ইস্পাত উৎপাদনকারীদের সুরক্ষা দিতে ইইউ ইস্পাত আমদানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নতুন নীতিতে বছরে শুল্ক ছাড়াই ইইউতে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৮৩ লাখ টন ইস্পাত আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই সীমা ৪৭ শতাংশ কম।
এই নীতিতে কয়েকটি দেশের জন্য আলাদা আমদানি কোটা রাখা হয়েছে। তবে এর মূল লক্ষ্য হলো ইস্পাত আমদানির পরিমাণ কমানো। কারণ, চীন ও তুরস্কের মতো দেশ থেকে কম দামে ইস্পাত আমদানি হওয়ায় ইইউর সদস্যদেশগুলোর উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সমস্যায় পড়ছেন। ইইউ ও ইউক্রেনের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) থাকলেও, সেই চুক্তি ইইউকে আলাদাভাবে বাণিজ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত রাখে না।
রিজেনকভ বলেন, ‘ইউক্রেন যে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়টি বিবেচনা না করেই আমাদের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে একই বিধিনিষেধের আওতায় ফেলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ আমাদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্তৃপক্ষ যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তা আমাদের কোনো উপকার করছে না।’ রিজেনকভের মতে, ‘ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পণ্য রপ্তানিকারী অন্য সব দেশের মতো একইভাবে বিবেচনা করা অন্যায্য।’
ইউক্রেনের ইস্পাতশিল্পের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বিধিনিষেধের কারণে শেষ পর্যন্ত ইইউতে দেশটির ইস্পাত রপ্তানি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে যেতে পারে। ইইউ বলেছে, ইউক্রেনের জন্য নির্দিষ্ট ইস্পাত আমদানির কোটা রাখা হয়েছে, যা দেশটির ইস্পাত রপ্তানির সুযোগ নিশ্চিত করে। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছে, এই কোটা আগের বছরগুলোর তুলনায় কম।
ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র বলেন, ‘যুদ্ধ চললেও ইউক্রেন এখনো ইইউতে ইস্পাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক দেশ।’ তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারীদের জন্য ‘ক্ষতিপূরণমূলক সুবিধার ব্যবস্থা করেছে।’ এই সরবরাহকারীদের মধ্যে ইউক্রেনও রয়েছে।
যুদ্ধের আঘাতে বিপর্যস্ত ইউক্রেনের ইস্পাতশিল্প
ইস্পাতপণ্য ইউক্রেনের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর আগে দেশটির মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ আসত ধাতু উৎপাদন ও খনি খাত থেকে। ইউক্রেনের মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশও আসত এই খাত থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নই ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
কিন্তু রাশিয়ার অব্যাহত বোমা হামলায় দেশটির ইস্পাতশিল্প ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের সব ইস্পাত কারখানাই কোনো না কোনো সময়ে বোমা হামলার শিকার হয়েছে। রিজেনকভ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এসব হামলা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’ তিনি আরও জানান, গত সেপ্টেম্বরের এক পর্যায়ে প্রায় ১৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইউক্রেনে এক টন ইস্পাতও উৎপাদিত হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মেটইনভেস্টের প্রায় ৮০০ কর্মী নিহত হয়েছেন। রিজেনকভ বলেন, বিমান হামলার সময় কর্মীরা যাতে আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য তাঁদের প্রতিষ্ঠান ইস্পাত কারখানাগুলোর ভেতরে আচ্ছাদিত ও সুরক্ষিত আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা উন্নত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু কর্মীদের নিরাপদ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি তৈরি করতে পারি, সেই নিয়মগুলো মেনে চলতে পারি এবং ঝুঁকি যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য একটি সম্পূর্ণ ইস্পাত কারখানাকে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।’
রিজেনকভ মনে করেন, আসন্ন শীত ইউক্রেনের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে কঠিন শীতগুলোর একটি’ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত সংকটজনক পরিস্থিতিতে রয়েছি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়া অন্য কোনো বাজারে পণ্য পাঠানোর মতো পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা আমাদের হাতে নেই। এমন অবস্থায় আমাদের জন্য উন্মুক্ত বাজারের পরিধি ৬০ শতাংশ কমিয়ে দিলে এই শিল্পের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।’







