Ajker Patrika

রাখাইনের শেষ ৩ টাউনশিপও দখলের পথে আরাকান আর্মি, সিতওয়ে-কিয়াউকফিউয়ে তীব্র যুদ্ধ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
রাখাইনের শেষ ৩ টাউনশিপও দখলের পথে আরাকান আর্মি, সিতওয়ে-কিয়াউকফিউয়ে তীব্র যুদ্ধ
আরাকান আর্মির একদল সদস্য। ছবি: এএ

মিয়ানমারের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির (এএ) অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। সশস্ত্র এই জাতিগত গোষ্ঠীটি দাবি করেছে, তারা পুরো রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এরই মধ্যে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহর রাজধানী সিতওয়ে ও কিয়াউকফিউকে ঘিরে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। গোলন্দাজ হামলা, নৌযুদ্ধ, বিমান হামলা এবং স্থলযুদ্ধের ফলে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিতওয়ের দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগর ও কালাদান নদীতে অবস্থান নেওয়া জান্তা সরকারের নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর সঙ্গে এএ যোদ্ধাদের তীব্র গোলাগুলি ও গোলন্দাজ লড়াই চলছে। একই সময়ে এএ বাহিনী শ্বে মিন গান নৌ-সহায়তা ঘাঁটি এবং সিতওয়ের উত্তরে কিয়ার মা থাউক গ্রামের কাছে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা জোরদার করেছে। এর জবাবে যুদ্ধজাহাজ থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণ করা হচ্ছে।

সিতওয়ের এক বাসিন্দা সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীকে বলেন, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘রাতে আমরা অবিরাম গোলন্দাজ হামলার শব্দ শুনি। এএ বিভিন্ন দিক থেকে গোলাবর্ষণ করছে।’

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে অন্তত একটি নৌযান এএ-এর হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধজাহাজগুলোকে উপকূল থেকে আরও দূরে অবস্থান নিতে হচ্ছে এবং কালাদান নদীতে তাদের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে শ্বে মিন গান ঘাঁটির আশপাশের কয়েকটি সামরিক চৌকি দখল করেছে এএ। এরপর থেকে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে ওই এলাকায় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।

এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘যখন বিমান হামলা হয় না, তখন যুদ্ধ খুবই তীব্র থাকে। কিন্তু যুদ্ধবিমান এলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে যায়।’

শ্বে মিন গান কালাদান নদীর তীরে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি। এটি রাজধানী সিতওয়ে ও পন্নাগ্যুন টাউনশিপের সীমান্তের কাছে অবস্থিত। অন্যদিকে কিয়ার মা থাউক গ্রামটি জান্তা বাহিনীর সিতওয়ে আঞ্চলিক অপারেশন কমান্ডের নিকটবর্তী। সিতওয়ের পিই তাও থার ওয়ার্ডের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শহরে প্রবেশের নদীপথগুলোকে সুরক্ষিত করতে বাঙ্কার নির্মাণ ও স্থলমাইন পেতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে সামরিক বাহিনী। এক নারী বাসিন্দা বলেন, ‘তারা নদীতীরবর্তী সড়কের পুরো অংশজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। দেখে মনে হচ্ছে তারা অবরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

এদিকে, চীনের সমর্থনে বাস্তবায়নাধীন একাধিক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের কেন্দ্র কিয়াউকফিউ টাউনশিপেও তীব্র সংঘর্ষ চলছে। সেখানে তাউং মাও উ নৌঘাঁটি থেকে সানে শহরের দিকে অগ্রসর হওয়া জান্তা সেনাদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের গতিরোধ করেছে এএ। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, নৌঘাঁটি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে সংঘটিত সাম্প্রতিক লড়াইয়ে জান্তা বাহিনীর কয়েক ডজন সদস্য নিহত হয়েছে। এএ-র ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের ভাষ্য, ২৯ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত চলা তীব্র সংঘর্ষে একজন ক্যাপ্টেনসহ ৪০ জনের বেশি সেনা নিহত হয়েছে।

একই সূত্র জানায়, এএ-এর ধারাবাহিক অভিযানের মুখে জান্তা বাহিনী পিছু হটে তাউং মাও উ নৌঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে ওই ঘাঁটিতে ১১ তম লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন এবং দানিয়াওয়াড্ডি নৌ সদরদপ্তরের সেনারা মোতায়েন রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানিয়েছেন, কিছু সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নৌপথে কিয়াউকফিউ শহরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন-৩৪ থেকে নতুন সেনা সদস্যদের নৌকায় করে ওই এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।

ত্রাণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তাউং মাও উ ঘাঁটির আশপাশের গ্রামগুলোতে ড্রোন ও জাইরোকপ্টার ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে জান্তা বাহিনী। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের কারণে কিয়াউকফিউ এলাকায় আট হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও আশ্রয় সহায়তা প্রয়োজন।

বাস্তুচ্যুতদের সহায়তায় কাজ করা এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, ‘প্রতিদিন বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। রাখাইনের দেশ-বিদেশে থাকা সম্প্রদায়গুলোর দেওয়া অনুদানের অর্থ দিয়ে আমরা তাদের সহায়তা করছি।’

বর্তমানে আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪ টির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি চিন রাজ্যের পার্শ্ববর্তী পালেতোয়া এলাকাও তাদের দখলে। এএ প্রধান তুন মিয়াত নাইং ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে অবশিষ্ট তিনটি টাউনশিপ সিতওয়ে, কিয়াউকফিউ ও মানাউং দখল করা হবে। তিনি বলেছেন, ‘চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত