জাপানের প্রত্যন্ত গ্রামে যিশুর সমাধি এল কীভাবে: রহস্যময় নথি থেকে লোকবিশ্বাস

জাপানের আওমোরি প্রশাসনিক অঞ্চলের প্রত্যন্ত ও পাহাড়ি গ্রাম শিনগো। ধানখেত, শান্ত খামারবাড়ি এবং ঘন সবুজে ঘেরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই চোখে পড়ে একটি গাঢ় নীল রঙের ট্রাফিক সাইনবোর্ড। মোটা হরফে ইংরেজিতে লেখা—‘টুম্ব অব ক্রাইস্ট’ (যিশুখ্রিষ্টের সমাধি)।
বাইবেল কিংবা ক্যাথলিক চার্চের ইতিহাসের সঙ্গে এই দাবির কোনো মিল নেই। তবে শিনগো গ্রামের স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, জেরুজালেমে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যাননি যিশুখ্রিষ্ট। বরং তিনি পালিয়ে এই জাপানি গ্রামে চলে আসেন, কৃষি কাজ শুরু করেন, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ১০৬ বছর বয়সে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
ঐতিহাসিক কিংবা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এই দাবির ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হলেও, বিগত ৬০ বছর ধরে গ্রামের বাসিন্দারা এই লোককাহিনিকে ভিত্তি করে গড়ে তুলেছেন এক অভিনব সামাজিক মেলবন্ধন ও ঐতিহ্য।
যিশুখ্রিষ্টের জাপানে আসার এই কাহিনির মূল উৎস ‘তাকে নৌচি ডকুমেন্টস’ নামের একটি রহস্যময় নথি। দাবি করা হয়, হাজার বছর আগে লেখা এই নথিটি ১৯৩০-এর দশকে পুনরায় আবিষ্কৃত হয়।
নথি অনুযায়ী, যিশু জীবনে দুইবার জাপানে এসেছিলেন। প্রথমবার তিনি সেদেশের রাজপরিবারের অধীনে কাজ করতে আসেন। পরবর্তীতে জেরুজালেমে ফিরে যান। সেখানে যখন তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, তখন তাঁর ভাই ‘ইশুকিরি’ (যার কোনো উল্লেখ বাইবেলে নেই) যিশুর পরিবর্তে নিজেকে উৎসর্গ করেন। এরপর যিশু দ্বিতীয়বারের মতো জাপানে ফিরে আসেন এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন।
১৯৩৫ সালে কিয়োমারো তাকে নৌচি নামের এক ধর্মীয় নেতা এই নথি অনুসরণ করে শিনগো গ্রামে যিশুর সমাধির সন্ধান পান বলে দাবি করেন। তবে মূল নথিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানা যায়। ১৯৯৬ সালে শিনগো গ্রামে এই স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি জাদুঘর ও পার্ক স্থাপন করা হয়।
পার্কের ছোট একটি পাহাড়ি টিলায় দুটি মাটির ডিবি রয়েছে—যার একটি যিশুর সমাধি এবং অন্যটিতে তাঁর ভাইয়ের কাটা কান শায়িত আছে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।
প্রতি বছর জুনের প্রথম রোববারে শিনগো গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় ‘কিরিসুতো মাৎসুরি’ বা ‘খ্রিষ্ট উৎসব’। এই উৎসবটি ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়েও একটি সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।
উৎসবে কোনো বাইবেল পাঠ বা খ্রিষ্টীয় প্রার্থনা হয় না। পরিবর্তে, জাপানের প্রাচীন প্রকৃতিভিত্তিক ‘শিস্তো’ ধর্মের পুরোহিত এসে প্রার্থনা পরিচালনা করেন এবং পবিত্র গাছের ডাল নৈবেদ্য হিসেবে দেন। স্থানীয় শিল্পীরা পরিবেশন করেন ঐতিহ্যবাহী ‘সিংহ নৃত্য’ (শিফিমাই) এবং কিমোনো পরিহিত নারী-পুরুষেরা গান ও নাচে অংশ নেন।
শিনগো গ্রামের মেয়র কাজুতোমো সাতো বলেন, ‘ঐতিহাসিক সত্যতা যা-ই হোক না কেন, যিশুর এই সমাধি আমাদের ঐতিহ্য। গ্রামবাসী এটিকে তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি হিসেবে রক্ষা করে আসছে। সত্য-মিথ্যা নিয়ে আমরা অতিরিক্ত মাথা ঘামাই না।’
হোক্কাইদো বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব ও পর্যটন বিভাগের অধ্যাপক রিয়োসুকে ওকামোতোর মতে, ‘জাপানে প্রায় ৮০ লাখ দেব-দেবীর অস্তিত্ব মানা হয়। তাই খ্রিষ্টধর্ম ও শিস্তো ধর্মের মিশ্রণ এখানে ঘটেনি। বাইরে থেকে আসা একটি চরিত্র ও গল্পকে এখানকার মানুষ তাদের নিজস্ব স্মারক আচার-অনুষ্ঠানের ভেতরে স্থান দিয়েছে।’
প্রতিদিন হাতে গোনা কিছু পর্যটক এই স্থানে এলেও, বার্ষিক উৎসবে এক হাজারেরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটে। শিনগো গ্রামের মোট জনসংখ্যা মাত্র ২ হাজারের কাছাকাছি। জাপানের অন্য অনেক গ্রামীণ এলাকার মতো এখানেও জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।
গ্রামের জাদুঘর পরিচালক হিদেনোবু কাদোগিশি জানান, বিদেশি পর্যটকদের সুবিধার জন্য প্রদর্শনীগুলোতে ইংরেজি অনুবাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী পর্যটকদের অনুভূতির যেন অবমাননা না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়রা অত্যন্ত সতর্ক।
অধ্যাপক ওকামোতোর মতে, এই স্থানটি গ্রামের জন্য বিশাল কোনো অর্থনৈতিক মুনাফা না আনলেও, বহির্বিশ্বের কাছে গ্রামটিকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে এক বড় ভূমিকা পালন করছে। রহস্যময় এই ইতিহাস কেবল অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভর করে টিকে নেই, বরং নতুন ও পুরোনো প্রজন্মের সংযোগসূত্র হিসেবে শিনগো গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন









