Ajker Patrika

ইরানের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে স্পিকার গালিবাফকে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৬, ১২: ২১
ইরানের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে স্পিকার গালিবাফকে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র
বাঘের গালিবাফ। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে প্রশাসন নীরবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে সম্ভাব্য অংশীদার, এমনকি ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবেও বিবেচনা করছে। একই সময়ে ট্রাম্প সামরিক চাপ থেকে সরে এসে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সমাধানের দিকে ঝোঁকার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার ৬৪ বছর বয়সী গালিবাফ বারবার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন। তবে তারপরও হোয়াইট হাউসের অন্তত কিছু কর্মকর্তার কাছে ‘কার্যকর অংশীদার’ হিসেবে বিবেচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে তিনি ইরানের নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চালাতে পারেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, তবে হোয়াইট হাউস এখনই কোনো এক ব্যক্তির ওপর বাজি ধরতে রাজি নয়। তারা একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীকে যাচাই করতে চায়—কে চুক্তি করতে রাজি হতে পারে তা বোঝার জন্য। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি ‘হট অপশন’।’ তবে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি বলে সতর্ক করে তিনি যোগ করেন, ‘তিনি শীর্ষ সম্ভাবনাগুলোর একজন...কিন্তু আমাদের পরীক্ষা করতে হবে, তাড়াহুড়ো করা যাবে না।’

সম্ভাব্য আলোচনার সঙ্গী খোঁজার এই আগ্রহ ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান ইস্যুতে দ্রুত জটিল হয়ে ওঠা পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছে প্রশাসন। এই সংকট বিশ্ববাজারে ধাক্কা দিয়েছে, তেলের দাম বাড়িয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এটি একটি বড় প্রশ্নেরও ইঙ্গিত দেয়—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আঘাতে তেহরানের নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পরবর্তী নেতৃত্বে কে আসবে?

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘এগুলো সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা, এবং যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে দরকষাকষি করবে না।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার ইরানের ভেতরে ‘খুবই দৃঢ়’ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের ইঙ্গিত দেন। পাশাপাশি তিনি ঘোষণা করেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলাকালে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ‘যেকোনো ও সব ধরনের সামরিক হামলা’ পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত থাকবে।

প্রেসিডেন্টের আরেকটি বড় আগ্রহ অর্থনৈতিক—তেল। প্রথম কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরানের প্রধান তেল কেন্দ্র খারগ দ্বীপ ধ্বংস করতে চান না, কারণ তিনি আশা করছেন ভবিষ্যৎ নেতা ভেনেজুয়েলার মতো একটি চুক্তি করবেন।

এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সবকিছুই এমন একজনকে বসানো নিয়ে, যেমনটা ভেনেজুয়েলায় ডেলসি রদ্রিগেস। আমরা বলি, আমরা আপনাকে ক্ষমতায় রাখব। আপনাকে সরাব না। আপনি আমাদের সঙ্গে কাজ করবেন। তেলের বিষয়ে আমাদের ভালো চুক্তি দেবেন—প্রথম চুক্তি।’

তবে অনেকেই মনে করেন, ট্রাম্প যেমন ভেনেজুয়েলায় করেছিলেন বলে দাবি করেন, তেমনভাবে ইরানের পরবর্তী নেতা বেছে নেওয়া সম্ভব—এমন ধারণা অকালপক্ব, এমনকি সরলও। ট্রাম্পে জাতীয় নিরাপত্তা দলের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি বলেন, ‘এটা অনেকটা এমন ভঙ্গি প্রদর্শনের মতো—যেন তিনি কথার মাধ্যমে বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যস্থতার মাধ্যমে আলোচনা হলে সেটা ভালো, এবং তারা বেরোনোর পথ ভাবছে সেটাও ভালো। কিন্তু ইরান আঘাত সহ্য করেও আমাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করতে পারে—এটা তারা দেখিয়েছে। তারা ট্রাম্পকে তেল তুলে দিতে যাচ্ছে না।’

হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগে থাকা এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প হয়তো আলোচনার অগ্রগতি বাড়িয়ে দেখাচ্ছেন, যাতে তিনি নিজের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম থেকে সরে আসার অজুহাত পান। শনিবার রাতে তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, সোমবারের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি অবশ্যই সময়ক্ষেপণ করছেন এবং বাজার স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘তিনি সত্যিই সমাধানের পথ খুঁজছেন কিনা, নাকি এমন দাবি তুলছেন যা ইরান প্রত্যাখ্যান করবে—তা বোঝা কঠিন।’

অনেকেই সন্দেহ করছেন, সাবেক তেহরান মেয়র গালিবাফ রদ্রিগেসের মতো নমনীয় হবেন কিনা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক আলী ভায়েজ বলেন, ‘গালিবাফ আদর্শ ইনসাইডার—উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও বাস্তববাদী, কিন্তু মূলত ইরানের ইসলামি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই ওয়াশিংটনকে অর্থবহ ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা কম। আর তিনি সীমা পরীক্ষা করতে চাইলেও সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান তাকে আটকে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপের পর তেহরানের পরিবেশ নমনীয় নয়, বরং গভীর অবিশ্বাসে ভরা। পুরো ব্যবস্থাই মনে করে, ট্রাম্প বা ইসরায়েল কোনো চুক্তির শর্ত মানবে—এমন বিশ্বাস করার কারণ নেই।’

তবুও প্রশাসনের অনেকের কাছে ভেনেজুয়েলা একটি তুলনামূলক সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। তাই নির্বাসিত বিরোধী নেতা রেজা পাহলবিকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের ভেতরে তার যথেষ্ট বৈধতা নেই। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন কি রেজা পাহলভিকে বসানো হবে? ঈশ্বর না করুন... তিনি দেশের বাইরে বড় হয়েছেন। তাকে বসালে বিশৃঙ্খলা হবে।’ দ্বিতীয় কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, পাহলভি ‘আলোচনায় নেই।’

গালিবাফ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা অস্বীকার করেছেন। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা এটিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। প্রথম কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এখন পরীক্ষার পর্যায়ে—কে উঠে আসতে পারে, কে আসতে চায়, কে চেষ্টা করছে, তা দেখছি। কেউ উঠে এলে দ্রুত পরীক্ষা করা হবে, আর যদি চরমপন্থী হয়, তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে।’

হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প এই সপ্তাহেই ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির দিকে এগোতে আগ্রহী, কারণ তিনি হরমুজ প্রণালি পরিস্থিতিতে অগ্রগতি এবং যুদ্ধবিরতি চান। তিনি যোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট অন্য সবার মতোই, যুদ্ধের চেয়ে শান্তিকেই বেশি পছন্দ করেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত