Ajker Patrika

গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রথম ১৫ মাসেই নিহত ছাড়িয়েছে ৭৫ হাজার: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯: ০৬
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রথম ১৫ মাসেই নিহত ছাড়িয়েছে ৭৫ হাজার: গবেষণা
গত ১০ অক্টোবর দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত ভবনগুলোর পাশে শিশু কোলে এক নারী অন্যান্য ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছেন। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের গাজা উপত্যকায় চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধের প্রকৃত মানবিক মূল্য আগের সরকারি হিসাবের বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিষয়ক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে ২০২৫ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত, অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর প্রথম ১৫ মাসেই অঞ্চলটিতে ৭৫ হাজারের বেশি ‘সহিংস মৃত্যু’ নিশ্চিত করা হয়েছে।

একাধিক গবেষণা নিবন্ধের এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিক প্রকাশনায় উঠে এসেছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নথি আসলে মৃত্যুর সংখ্যাকে বাড়িয়ে দেখায়নি। বরং সেটি ছিল একটি সংযত নিম্নসীমা। গবেষণাগুলো ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানির পরিসর বোঝার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।

দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত গাজা মর্টালিটি সার্ভে (জিএমএস) নামে জনমিতিক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৫ হাজার ২০০টি ‘সহিংস মৃত্যু’ হয়েছে। এটি যুদ্ধের আগে থাকা গাজার ২২ লাখ মানুষের প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, যে ৪৯ হাজার ৯০টি সহিংস মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল, তার তুলনায় এই সংখ্যা ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৭১ হাজার ৬৬২ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ৪৮৮ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল বরাবরই এই সংখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে জানুয়ারিতে দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধের সময় গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে—এটি তারা মেনে নেয়।

উচ্চতর সংখ্যার পরও গবেষকেরা বলেন, নিহত ব্যক্তিদের জনসংখ্যাগত গঠন সরকারি ফিলিস্তিনি তথ্যের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিহত ব্যক্তিদের ৫৬ দশমিক ২ শতাংশই নারী, শিশু ও বয়স্ক। জিএমএস জরিপে ২ হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এতে ৯ হাজার ৭২৯ জনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি মৃত্যুর সংখ্যা নির্ধারণে একটি কঠোর ও প্রমাণভিত্তিক ভিত্তি দিয়েছে।

গবেষণার প্রধান লেখক রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক মিশেল স্প্যাগাট বলেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন নির্ভরযোগ্য। তবে মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করার যে অবকাঠামো দরকার, যুদ্ধের কারণে তা ভেঙে পড়ায় সংখ্যাটি স্বভাবতই সংযত হয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, এই গবেষণা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত আগের এক গবেষণার চেয়ে উন্নত। ওই গবেষণায় পরিসংখ্যানভিত্তিক ‘ক্যাপচার-রিক্যাপচার’ মডেল ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রথম ৯ মাসে ৬৪ হাজার ২৬০ জনের মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয়েছিল।

আগের গবেষণাটি সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে কম গণনার বিষয়টি দেখিয়েছিল। নতুন এই গবেষণা গাণিতিক অনুমান থেকে সরে এসে সরাসরি পরিবারের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বাস্তব যাচাই করেছে। এটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়সীমা বাড়িয়েছে। ৭৫ হাজারের বেশি সহিংস মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো ‘অসহিংস অতিরিক্ত মৃত্যু’র বোঝাও পরিমাপ করেছে।

একই প্রকাশনায় থাকা আরেকটি মন্তব্যে বলা হয়েছে, হাসপাতাল ও প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস হওয়ায় একটি ‘কেন্দ্রীয় বৈপরীত্য’ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার যত বেশি ক্ষতি হচ্ছে, মোট মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্লেষণ করা তত কঠিন হয়ে পড়ছে। হাজারো মরদেহ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। অনেক দেহ বিকৃত হয়ে গেছে, শনাক্ত করা যাচ্ছে না। সরাসরি সহিংসতার বাইরে, জরিপে ১৬ হাজার ৩০০টি ‘অসহিংস মৃত্যু’র হিসাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪০টি ‘অতিরিক্ত মৃত্যু’, যা জীবনযাত্রার অবনতি ও অবরোধের কারণে চিকিৎসা খাত ভেঙে পড়ায় সরাসরি ঘটেছে।

গবেষকেরা বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য সংযত এবং নির্ভরযোগ্য। ফিলিস্তিনি হতাহতের তথ্যকে অস্বীকার করার জন্য চালানো বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এই গবেষণা খণ্ডন করেছে। গবেষণায় বলা হয়, ‘একাধিক স্বাধীন পদ্ধতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য যাচাই হওয়ায় চরম পরিস্থিতিতেও তাদের প্রশাসনিক হতাহত নথিবদ্ধকরণ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণিত হয়েছে।’

মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। জীবিত ব্যক্তিরা বহন করছেন জটিল আঘাতের এক নজিরবিহীন বোঝা। গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা তা সামাল দিতে আর সক্ষম নয়। ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত একটি পূর্বাভাসভিত্তিক মাল্টি সোর্স বা বহু উৎস মডেলে ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ২০টি হামলার হিসাব দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত