Ajker Patrika

ভারতে ২০২৫ সালে ৯৮ শতাংশ বিদ্বেষমূলক বক্তব্যই মুসলিমদের বিরুদ্ধে: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভারতে ২০২৫ সালে ৯৮ শতাংশ বিদ্বেষমূলক বক্তব্যই মুসলিমদের বিরুদ্ধে: গবেষণা
ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এআই। ছবি: এএফপি

ভারতে ২০২৫ সালে নথিভুক্ত ১ হাজার ৩১৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ৯৮ শতাংশই মুসলিমদের লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছিল। এসব বক্তব্যে সহিংসতার আহ্বানের দিক থেকে মহারাষ্ট্র ছিল শীর্ষে। ভারতের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের (আইএইএল) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ইন্ডিয়া হেট ল্যাব ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক অলাভজনক ও নির্দলীয় থিংকট্যাংক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএই) একটি প্রকল্প। ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে দেওয়া বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ভুল তথ্য ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অনলাইনের পাশাপাশি সরাসরি বিভিন্ন স্থানে কীভাবে ছড়ানো হচ্ছে, তা নথিভুক্ত, বিশ্লেষণ ও গবেষণা করাই এর লক্ষ্য।

ইন্ডিয়া হেট ল্যাব ২০২৫ সালে ভারতের ২১টি রাজ্য, একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং জাতীয় রাজধানী অঞ্চল দিল্লিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে ১ হাজার ৩১৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। গড়ে প্রতিদিন চারটি করে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ১৩ শতাংশ বেশি। আর ২০২৩ সালে নথিভুক্ত ৬৬৮টি ঘটনার তুলনায় ২০২৫ সালে এ ধরনের ঘটনা ৯৭ শতাংশ বেড়েছে।

মুসলিমরাই প্রধান লক্ষ্য

নথিভুক্ত বক্তব্যগুলোর মধ্যে ১ হাজার ২৮৯টি বা ৯৮ শতাংশ মুসলিমদের লক্ষ্য করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ১৫৬টি বক্তব্য সরাসরি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ছিল। আরও ১৩৩টি বক্তব্যে মুসলিমদের সঙ্গে খ্রিস্টানদেরও লক্ষ্য করা হয়। ২০২৪ সালে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ১ হাজার ১৪৭টি বক্তব্য নথিভুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের বক্তব্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধেও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বেড়েছে

২০২৫ সালে খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে ১৬২টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। মোট ঘটনার ১২ শতাংশ এসব বক্তব্যে খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করা হয়। এর মধ্যে ২৯টি বক্তব্য সরাসরি খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ছিল এবং ১৩৩টি বক্তব্যে মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিস্টানদেরও লক্ষ্য করা হয়। ২০২৪ সালে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ১১৫টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নথিভুক্ত হয়েছিল। সে তুলনায় ২০২৫ সালে এ সংখ্যা প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে।

সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে উত্তর প্রদেশে—২৬৬ টি। এরপর, মহারাষ্ট্রে ১৯৩ টি, মধ্যপ্রদেশে ১৭২ টি, উত্তরাখণ্ডে ১৫৫টি এবং দিল্লিতে ৭৬ টি।

বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে ঘটনা

প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা ২৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে বছরের বেশির ভাগ সময় ১৬ টিতে বিজেপি এককভাবে অথবা জোটের অংশ হিসেবে ক্ষমতায় ছিল। এসব বিজেপিশাসিত রাজ্য ও বিজেপি-প্রশাসিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ১ হাজার ১৬৪টি বা মোট বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ৮৮ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯৩১ টি। অর্থাৎ এক বছরে এসব এলাকায় ঘটনা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলশাসিত সাতটি রাজ্যে ২০২৫ সালে ১৫৪টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৩৪ টি। অর্থাৎ এসব রাজ্যে ঘটনা ৩৪ শতাংশ কমেছে।

এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মাসভিত্তিক সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি দেখা যায়। ওই মাসে ১৫৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রামনবমীর মিছিল এবং পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর আয়োজিত বিদ্বেষমূলক সমাবেশের সঙ্গে এই বৃদ্ধির সময়কাল মিলে যায়। ২২ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত ১৬ দিনের সময়ে, পহেলগাম হামলার পর এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সক্রিয় সামরিক সংঘাত শুরুর আগে, ৯৮টি সরাসরি উপস্থিতির বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি দেশজুড়ে দ্রুত মুসলিমবিরোধী জনমত ও সংগঠিত তৎপরতা তৈরির ইঙ্গিত দেয়।

‘জিহাদ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব: প্রচারণার বড় বিষয়

২০২৫ সালে ৬৫৬টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক বক্তব্যে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রতত্ত্বের কথা বলা হয়। এর মধ্যে ছিল ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’, ‘পপুলেশন জিহাদ’, ‘থুক জিহাদ’ বা থুতু জিহাদ, ‘এডুকেশন জিহাদ’, ‘ড্রাগ জিহাদ’ এবং ‘ভোট জিহাদ’। ২০২৪ সালের তুলনায় এসব ষড়যন্ত্রতত্ত্বের উল্লেখ ১৩ শতাংশ বেড়েছে।

সহিংসতার আহ্বানে শীর্ষে মহারাষ্ট্র

নথিভুক্ত বক্তব্যের মধ্যে ৩০৮টি বা ২৩ শতাংশে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান ছিল। আরও ১৩৬টি বক্তব্যে সরাসরি অস্ত্র ধরার আহ্বান জানানো হয়। মহারাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক বক্তব্য নথিভুক্ত হয়েছে। সেখানে এ ধরনের ৭৮টি ঘটনা ছিল, যা ২০২৪ সালের ৬৪ টির তুলনায় বেশি।

রাজ্যটিতে নথিভুক্ত মোট ১৯৩টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রায় ৪০ শতাংশে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান ছিল। কোনো রাজ্যের ক্ষেত্রে এটিই ছিল সর্বোচ্চ হার। সবচেয়ে বিপজ্জনক বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী নীতিশ রানে সহিংসতার আহ্বান জানানো শীর্ষ পাঁচ বক্তার একজন ছিলেন।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের আহ্বান

১২০টি বক্তব্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক বা অর্থনৈতিক বয়কটের সরাসরি আহ্বান জানানো হয়। এসব আহ্বানের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিমরা। ২০২৪ সালের তুলনায় এ ধরনের বক্তব্য ৮ শতাংশ বেড়েছে।

উপাসনালয় ধ্বংসের আহ্বান

২৭৬টি বক্তব্যে উপাসনালয় সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করার আহ্বান জানানো হয়। এসব উপাসনালয়ের মধ্যে মসজিদ, মাজার ও গির্জাও ছিল। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু করা স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল উত্তর প্রদেশের জ্ঞানবাপী মসজিদ ও শাহী ঈদগাহ মসজিদ।

মানবতাবিরোধী ভাষার ব্যবহার

১৪১টি বক্তব্যে সংখ্যালঘুদের অমানবিক বা মানবতাবিরোধী ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। এসব বক্তব্যে সংখ্যালঘুদের ‘উইপোকা’, ‘পরজীবী’, ‘পোকামাকড়’, ‘শূকর’, ‘পাগলা কুকুর’, ‘ছোট সাপ’, ‘সবুজ সাপ’ এবং ‘রক্তপিপাসু জম্বি’র মতো শব্দে বর্ণনা করা হয়েছে।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দল সবচেয়ে বেশি আয়োজক

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এসব সংগঠনের সঙ্গে ২৮৯টি ঘটনা, অর্থাৎ মোট ঘটনার ২২ শতাংশের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর পরেই ছিল অন্তর্জাতিক হিন্দু পরিষদ, যার সঙ্গে ১৩৮টি ঘটনা যুক্ত ছিল। ২০২৫ সালে মোট ১৬০ টির বেশি সংগঠন ও অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীকে আয়োজক বা সহ-আয়োজক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

বক্তা হিসেবে শীর্ষে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী ধামী

২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে উঠে এসেছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামী। তিনি ৭১টি বক্তব্য দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর রয়েছেন অন্তর্জাতিক হিন্দু পরিষদের প্রধান প্রবীণ তোগাড়িয়া, ৪৬টি বক্তব্য নিয়ে এবং বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়, ৩৫টি বক্তব্য নিয়ে। হিন্দু সন্ন্যাসী ও ধর্মীয় নেতারা ১৪৫টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ২৭ শতাংশ বেড়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, এর মাধ্যমে ধর্মীয় নেতারা সংখ্যালঘুবিরোধী বক্তব্যকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন।

বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা ও বাঙালি মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু

২০২৫ সালে ৬৯টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের লক্ষ্য করা হয়। আর ১৯২টি বক্তব্যে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শব্দবন্ধ বা ধারণা ব্যবহার করা হয়। এসব বক্তব্যে বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুক এগিয়ে

নথিভুক্ত ১ হাজার ৩১৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের মধ্যে ১ হাজার ২৭৮ টির ভিডিও প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ বা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথম আপলোডের ক্ষেত্রে ফেসবুক ৯৪২টি ঘটনায়, ইউটিউব ২৪৬ টি, ইনস্টাগ্রাম ৬৭টি এবং এক্স ২৩টি ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে। এতে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উঠে এসেছে।

বিদ্বেষ ছড়ানোর পরিবেশকে সুবিধা দিচ্ছে পুরো ব্যবস্থা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব উদ্বেগজনক ঘটনা এমন একটি পরিবেশের মধ্যে তৈরি হয়েছে ও টিকে আছে, যা কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকারের তৈরি ও পরিচালিত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০২৫ সালের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের মধ্যে বিকশিত ঘটনা হিসেবে দেখা যায়, যা এক দশক ধরে ক্রমশ তীব্র হওয়া হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের তৎপরতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দল ও তাদের সঙ্গে যুক্ত হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের নেতারা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভয় সৃষ্টি ও বলির পাঁঠা বানানোর নানা বক্তব্য ব্যবহার করেছেন। এসব বক্তব্যে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের অবিশ্বস্ত, রাষ্ট্রবিরোধী, বিপজ্জনক অথবা জনসংখ্যাগতভাবে হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।’

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বক্তব্য একসময় প্রান্তিক পর্যায়ে থাকলেও এখন তা জনপরিসরের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এগুলো নির্বাচনী কৌশল, সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন এবং জাতীয় পরিচয় ও নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ককে প্রভাবিত করছে।

মুসলিমদের ‘হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সরাসরি উপস্থিতির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রচারণার মূল বিষয়গুলো অব্যাহত ছিল। এর কেন্দ্রীয় ধারণা ছিল, মুসলিমরা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের স্থায়ী বহিরাগত এবং অস্তিত্বের জন্য হুমকি। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, মুসলিমদের নিয়ে বিভিন্ন ‘জিহাদ’-সংক্রান্ত ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এসব ধারণাকে আরও উসকে দিয়েছে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের এমন একটি সংগঠিত আক্রমণকারী গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যারা হিন্দু সংস্কৃতি, জনসংখ্যাগত আধিপত্য ও সম্পদ ধ্বংস করতে চায়।

প্রতিবেদন বলছে, এসব বক্তব্য সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করে যে সেগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলে মনে হতে শুরু করে।

বক্তব্য থেকে নীতিতে রূপ নেওয়ার অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ধরনের বক্তব্য পরে নীতিগত উদ্যোগে রূপ নেয়। এর ফলে মুসলিমদের ‘লাভ জিহাদ’ এবং খ্রিস্টানদের মাধ্যমে হিন্দুদের ব্যাপক ধর্মান্তরের কথিত হুমকি মোকাবিলার নামে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বৈধতা তৈরি হয়। প্রতিবেদনটির দাবি, ভিত্তিহীন তত্ত্ব ও ষড়যন্ত্রকে সত্য হিসেবে পুনরায় উপস্থাপন করার ফলে বিজেপি-শাসিত ভারতের কয়েকটি রাজ্যে কঠোর ধর্মান্তরবিরোধী আইন পাস করার রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব আইন দ্রুতই ভারতীয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হয়রানি ও চাপ প্রয়োগে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একইভাবে ‘হালাল জিহাদ’ এবং ‘থুক জিহাদ’ বা ‘থুতু জিহাদ’-এর মতো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি হিন্দুদের মধ্যে স্থায়ীভাবে নিজেদের আক্রান্ত বা ভুক্তভোগী হিসেবে দেখার একটি পরিবেশ তৈরির কৌশল। প্রতিবেদনের দাবি, এই পুরো বক্তব্যের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নীতিগত পরিবর্তন, আইন প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে মুসলিম ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়ন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক যুক্তি তৈরি করা যায়।

প্রকাশ্যে বেড়েছে বিদ্বেষ–উসকানি

প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানি আরও প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। রাজনৈতিক নেতা ও উগ্র ডানপন্থী ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে সংখ্যালঘুদের অমানবিক ভাষায় বর্ণনা করেছেন, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন, সংখ্যালঘুদের মালিকানাধীন সম্পত্তি ও উপাসনালয় ধ্বংসের কথা বলেছেন এবং মুসলিমদের হুমকি মোকাবিলায় হিন্দুদের অস্ত্র ধরার আহ্বানও জানিয়েছেন।

আরও সংগঠিত হয়েছে বিদ্বেষ ছড়ানোর ব্যবস্থা

প্রতিবেদনের মতে, ২০২৫ সালে বিদ্বেষ ছড়ানোর এই পরিবেশ অত্যন্ত সংগঠিত ছিল। আগের বছরের মতোই বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে যুক্ত সংগঠন, বিশেষ করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল, সরাসরি উপস্থিতির বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের আয়োজনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।

এ ছাড়া অন্তর্জাতিক হিন্দু পরিষদ, রাষ্ট্রীয় বজরং দল, সাকল হিন্দু সমাজ এবং হিন্দু জনজাগৃতি সমিতিসহ অন্যান্য উগ্র ডানপন্থী সংগঠনও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের আয়োজন ও তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সংগঠনের সদস্যদের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের কোনো অনুষ্ঠানের বক্তব্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই সারা দেশে দেখা সম্ভব হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, এর ফলে বিদ্বেষ ছড়ানোর একটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে জাতীয় পর্যায়ের নেতারা বিদ্বেষের মূল বক্তব্য নির্ধারণ করেছেন, আর স্থানীয় পর্যায়ের কর্মী ও নেতারা সেই বক্তব্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর উপযোগী করে আরও ছড়িয়ে দিয়েছেন।

অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব এবং এক্সসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিদ্বেষ ছড়ানোর ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২০২৫ সালে নথিভুক্ত অধিকাংশ বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ভিডিও প্রথমে অনলাইনে তৈরি হয়েছিল অথবা পরে অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এসব বক্তব্যের সরাসরি সম্প্রচার সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে। প্রতিবেদনের মতে, এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নিষিদ্ধ করার নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর বিদ্বেষবিরোধী নীতি কার্যকরভাবে প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণে ডিজিটাল দায়মুক্তির একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে চরমপন্থী সংখ্যালঘুবিরোধী বক্তব্য দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে বৈধতা পাওয়ার অভিযোগ

প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রকল্প বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে এবং রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনজীবনের প্রয়োজনীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সেটিকে বৈধতা দিয়েছে।

প্রতিবেদনের মতে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে যে গুরুতর পরিস্থিতি উঠে এসেছিল, তার ওপর ভিত্তি করে এই প্রবণতার ধারাবাহিক বৃদ্ধি ভারতের জাতীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের আরও অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের এই পরিবর্তিত পরিবেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে আরও গুরুতর বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তি ও শীর্ষ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রকাশ্যে অনুমোদন ও সমর্থন পাচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে।

লেখক: কলম্বোভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পিকে বালাচন্দ্রন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত