
প্রকাশ্যে ও জনসমক্ষে লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসন ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের অনুগত ডেপুটি। তিনি সব সময় নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ব্রাউনের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করতেন। কিন্তু ব্রাউন সরকারের শেষ দিনগুলোতে জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে লর্ড ম্যান্ডেলসনের ব্যক্তিগত ই-মেইল বিনিময় একেবারেই ভিন্ন একটি বাস্তবতার কথা জানায়।
এই ই-মেইলগুলো পাওয়া গেছে এপস্টেইন ফাইলসে। ২০১০ সালের ৯ মে আদান-প্রদান হওয়া এসব বার্তা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ। সেখানে দেখা যায়, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এপস্টেইন গর্ডন ব্রাউনকে কটাক্ষ করে ম্যান্ডেলসনের কাছে লেখেন, ‘বিদায় নেওয়ার সময় কি হয়ে গেছে।’ এর জবাবে লর্ড ম্যান্ডেলসন লেখেন, তাঁরও মনে হচ্ছে, গর্ডন ব্রাউনের ‘বিদায় নেওয়ার সময় এসে গেছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তখন গির্জায় গিয়েছিলেন।
এই বার্তাগুলো ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পরপরই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য লেবার পার্টির ভেতরে যে গোপন তৎপরতা চলছিল, তার বিস্ময়কর চিত্র তুলে ধরে। ওই নির্বাচনে লেবার পার্টি পরাজিত হলেও কনজারভেটিভ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু দুই দিন পরই গর্ডন ব্রাউন পদত্যাগ করেন।
এপস্টেইন ফাইলস থেকে আরও জানা যায়, নির্বাচনের আগের সময় থেকেই গর্ডন ব্রাউন এবং তাঁর অর্থমন্ত্রী অ্যালিস্টার ডার্লিংকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছিল। একপর্যায়ে জেফরি এপস্টেইনের ধারণা ছিল, লর্ড ম্যান্ডেলসন নিজেই গর্ডন ব্রাউনের জায়গায় দলীয় নেতা হতে পারেন, যদিও সে সময় তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন না।
এই ই-মেইলগুলো ১৫ বছরের পুরোনো। কিন্তু সেগুলো পড়লে যে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, লর্ড ম্যান্ডেলসন আসলে কোন পক্ষের ছিলেন। তাঁর এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ দেখে মনে হয়, তিনি একসঙ্গে দুই পক্ষের জন্য কাজ করছিলেন—একদিকে ডাউনিং স্ট্রিটে থাকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এক ধনী অর্থলগ্নিকারী, যিনি তখন ইতিমধ্যে শিশু যৌন অপরাধে দণ্ডিত।
লেবার সরকারের শেষ কয়েক মাসে বারবার লর্ড ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনকে সরকারের ভেতরের খবর জানিয়ে গেছেন। ডাউনিং স্ট্রিটে কী হচ্ছে, কার সঙ্গে কী আলোচনা চলছে—সবকিছুরই একটি ধারাবাহিক বিবরণ তিনি এপস্টেইনকে দিচ্ছিলেন। এদিকে বাইরে বসে এপস্টেইনের পরামর্শ ছিল একটাই—গর্ডন ব্রাউনকে বাদ দিতে হবে।
গর্ডন ব্রাউনকে সরানোর চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল আরও আগে, ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর। ওই দিনই লর্ড ম্যান্ডেলসনকে ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে আবার সরকারে ফিরিয়ে আনা হয়। টনি ব্লেয়ারের শাসনামলে দুবার পদত্যাগে বাধ্য হওয়া এই ব্লেয়ারপন্থী রাজনীতিককে ফিরিয়ে এনে ব্রাউন তাঁর দুর্বল সরকারকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন।
সেদিনই এপস্টেইন লর্ড ম্যান্ডেলসনকে অভিনন্দন জানান। বানান ও ভাষায় ভুল থাকলেও বার্তার অর্থ ছিল স্পষ্ট। তিনি লেখেন, ‘এটি ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ। আর্থিক সংকট এবং ইন্টারনেট যুগের বাস্তবতায় সরকার পরিচালনার ধরন নতুন করে ভাবার এটাই সময়।’
এপস্টেইন লেখেন, ‘গর্ডন ব্রাউন একজন বৃদ্ধ মানুষের মতো ভাবেন এবং পুরোনো সমাধান দিয়ে নতুন সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, লর্ড ম্যান্ডেলসনই হবেন নতুন ধরনের লেবার রাজনীতির স্থপতি। পরের বছরের জুনে লর্ড ম্যান্ডেলসন কার্যত উপপ্রধানমন্ত্রী হন এবং একই সঙ্গে ব্যবসায় মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করতে থাকেন। এদিকে এপস্টেইন তখন নীরব ছিলেন, কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এক নাবালককে যৌন কাজে প্রলুব্ধ করার অপরাধে কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন।
তবে জেলে থাকার সময়ও সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। মুক্তির কয়েক সপ্তাহ আগেই লর্ড ম্যান্ডেলসন নিউইয়র্কে এপস্টেইনের বিলাসবহুল টাউনহাউসে যা, যা ম্যানহাটানের অন্যতম দামি বাড়িগুলোর একটি। এমনকি কারাগারে থেকেও এপস্টেইন তাঁর ধনী বন্ধুদের জন্য ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডস এবং ডাউনিং স্ট্রিটে বিশেষ সফরের ব্যবস্থা করছিলেন, যা আয়োজন করা হতো লর্ড ম্যান্ডেলসনের মাধ্যমে।
২০০৯ সালের অক্টোবরে এপস্টেইন মজা করে, নাকি পুরোপুরি গুরুত্ব দিয়েই লর্ড ম্যান্ডেলসনকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি লেখেন, রাজপরিবারের কারও সঙ্গে বিয়ে হলে এবং পরে তালাক হলে, পিয়ারেজ বাতিল হয়ে যেতে পারে এবং তখন ম্যান্ডেলসনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ খুলে যাবে।
নভেম্বর মাসে এসে এপস্টেইন আরও স্পষ্টভাবে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। তিনি গর্ডন ব্রাউনের পরিবর্তে লর্ড ম্যান্ডেলসন ও ডেভিড মিলিব্যান্ডকে নিয়ে যৌথ নেতৃত্বের কথা বলেন। তাঁর ধারণা ছিল, ভোটাররা আসলে লর্ড ম্যান্ডেলসনের পক্ষেই ভোট দেবে।
একই সময় এপস্টেইনের আরেকটি লক্ষ্য ছিল অর্থমন্ত্রী অ্যালিস্টার ডার্লিংকে সরানো। ডার্লিং তখন বড় বড় ব্যাংক ও তাদের কর্মকর্তাদের বিপুল বোনাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এপস্টেইনের কাছে নিজের ঘনিষ্ঠ মানুষকে অর্থমন্ত্রী বানানো ছিল অনেক বেশি সুবিধাজনক। তিনি লর্ড ম্যান্ডেলসনকে লেখেন, একজন রাজনীতিক হিসেবে এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। জবাবে ম্যান্ডেলসন লেখেন, প্রধানমন্ত্রী এতে পুরোপুরি আপত্তি জানিয়েছেন এবং তাঁকে সেটাই মেনে নিতে হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে এপস্টেইন বারবার গর্ডন ব্রাউনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে লর্ড ম্যান্ডেলসনকে উৎসাহিত করেন। কিন্তু ম্যান্ডেলসন লেখেন, প্রধানমন্ত্রী খুব সহজে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং সামান্য ইঙ্গিত পেলেই প্রতিক্রিয়া দেখান।
২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এপস্টেইন তাঁকে সরাসরি বলেন, ‘গর্ডন ব্রাউনের অবস্থান আর টেকসই নয় এবং সত্য কথা বলাই সবচেয়ে ভালো পথ।’ ম্যান্ডেলসন জবাবে লেখেন, তিনি যদি সরকারে থাকেন, মানুষ বলবে তিনিই একমাত্র বড় নেতা এবং পুরো নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্ব তার ওপর পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নিজেই নষ্ট করে ফেলতে পারেন।
এপস্টেইন তাঁকে সতর্ক করে দেন, শুধু প্রধানমন্ত্রীর বক্তা হয়ে থাকলে শেষ পর্যন্ত তাঁর গায়েই দুর্গন্ধ লেগে যাবে। ম্যান্ডেলসন তখন লেখেন, গর্ডন ব্রাউন ‘সত্য সহ্য করতে পারেন না’ এবং ‘তাঁর দীর্ঘ সময় মানসিক চিকিৎসা দরকার।’
নির্বাচনের ঠিক আগে এপ্রিল মাসে ম্যান্ডেলসন লেখেন, গর্ডন ব্রাউনকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা খুব কঠিন। পরদিন তিনি জানান, রচডেলে এক বৃদ্ধ নারী ভোটারকে অভিবাসন নিয়ে প্রশ্ন করার কারণে ‘গোঁড়া’ বলার ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে এবং এতে নির্বাচনের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেছে।
নির্বাচনের দিন ম্যান্ডেলসন লেখেন, লেবার পার্টি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের জন্য প্রার্থনা করছেন। নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে যখন সারা দেশ উৎকণ্ঠায়, তখন লর্ড ম্যান্ডেলসন নিয়মিতভাবে এপস্টেইনকে আলোচনার ভেতরের খবর জানাচ্ছিলেন।
মে মাসের শুরুতে এপস্টেইন তাঁকে মনে করিয়ে দেন, মানুষ শেষটাই মনে রাখে। জবাবে ম্যান্ডেলসন লেখেন, সামনে কেবল ধ্বংসই দেখা যাচ্ছে। ১০ মে তিনি লেখেন, অবশেষে গর্ডন ব্রাউনকে সরে যেতে রাজি করানো গেছে। পরদিন তিনি নিশ্চিত করেন, দিনের শেষে তিনি সরকার থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন এবং ‘সব শেষ হয়ে গেছে।’
এভাবেই নিউ লেবার প্রকল্পের সমাপ্তি ঘটে। একই সঙ্গে শেষ হয় লর্ড ম্যান্ডেলসনের মন্ত্রিসভা জীবন। তবে এই পতনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাঁর ব্যক্তিগত ও আর্থিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
দ্য টেলিগ্রাফ থেকে সংক্ষেপিত

স্থানীয় সময় সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাতে ইউক্রেনজুড়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে তাপমাত্রা নেমে এসেছিল মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঠিক এমন দুর্যোগ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশটির রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
১ ঘণ্টা আগে
ঘুমানোর ভান করে উড়োজাহাজে নারী সহযাত্রীর গায়ে বারবার হাত রাখছিলেন ভারতীয় এক যাত্রী। তারপর যৌন হয়রানির অভিযোগে যেতে হলো আদালতে। যুক্তরাষ্ট্রের এক অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে এ ঘটনায় ঘটেছে।
৪ ঘণ্টা আগে
পরিচয় গোপনের শর্ত লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠায় জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত হাজারো নথি নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে)। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রকাশিত নথিতে ত্রুটিপূর্ণ সম্পাদনার (রিডাকশন) কারণে তাঁদের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে।
৫ ঘণ্টা আগে
রাজস্থানের আজমিরে বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ও ফিলিস্তিনের পক্ষে স্টিকার লাগানোর ঘটনায় এক ব্রিটিশ যুগলকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে গুরুতর হিসেবে দেখে গোয়েন্দা বিভাগ জেলা পুলিশকে সতর্ক করে। এরপর দুই ব্রিটিশ নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
৫ ঘণ্টা আগে