Ajker Patrika

তরুণীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, গবেষণায় জানা গেল কারণ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ১৭: ২০
তরুণীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, গবেষণায় জানা গেল কারণ

বিশ্বজুড়ে তরুণী ও কম বয়সী নারীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রকোপ নজিরবিহীনভাবে বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকেরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের তুলনায় তরুণীদের মধ্যে রোগটি অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কম বয়সে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হলে তা অত্যন্ত দ্রুত ও মারাত্মক রূপ নেয়, যা আক্রান্ত ব্যক্তিকে অল্প বয়সেই হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের মতো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের অন্যতম শীর্ষ স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা ডায়াবেটিস ইউকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা এটিকে একটি ‘সতর্কবার্তা’ বা ‘ওয়েক-আপ কল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এই ঝুঁকি এড়াতে প্রসব-পরবর্তী নারীদের স্বাস্থ্যসেবার মান দ্রুত উন্নত করা জরুরি।

পরিসংখ্যান কী বলছে

গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৪০ বছরের কম বয়সী নারীদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। এর বিপরীতে, ৪০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগ বাড়ার হার ছিল ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, বয়স্ক নারীদের তুলনায় তরুণীদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার গতি দ্বিগুণের বেশি।

একই সময়ে ৪০ বছরের কম বয়সী পুরুষদের মধ্যে ডায়াবেটিস আক্রান্তের হার বেড়েছে ৩৪ শতাংশ, যা তরুণীদের তুলনায় অন্তত ১৩ শতাংশ কম।

মূল কারণ

চিকিৎসকদের মতে, তরুণীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বাড়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus বা GDM)। এটি এমন এক ধরনের ডায়াবেটিস, যা সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে প্রথম প্রকাশ পায়। গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা থেকে নিঃসৃত হরমোনের কারণে শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।

যদিও সন্তান প্রসবের পর এই ডায়াবেটিস সাধারণত এমনিতেই সেরে যায়, তবে এটি পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে ১১ শতাংশ প্রসবের পাঁচ বছরের মধ্যে ‘প্রি-ডায়াবেটিস’ বা ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থায় পৌঁছান। ১৫ শতাংশ নারী সন্তান প্রসবের ১০ বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।

অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৫৭ শতাংশ নারী তাঁদের জন্য বাধ্যতামূলক বার্ষিক ‘এইচবিএওয়ানসি’ (HbA1c) রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি (৩৩ শতাংশের বেশি) নারী অভিযোগ করেছেন, সন্তান প্রসবের পর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার পক্ষ থেকে তাঁদের সম্পূর্ণ ‘পরিত্যক্ত’ বা অবহেলিত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

তরুণদের ক্ষেত্রে কেন বেশি বিপজ্জনক

বিশেষজ্ঞরা ঐতিহ্যগতভাবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসকে বয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন। তবে তরুণ বা কম বয়সীদের ক্ষেত্রে এই রোগের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

গবেষকদের মতে, ৪০ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে রোগটি অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে। এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে রোগীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে শুরু করে এবং অনেক কম বয়সেই স্ট্রোক, অন্ধত্ব বা কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতা তৈরি করে।

গবেষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে মা ও শিশু উভয়ের জন্যই তা মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনে। শিশুর জন্য যেসব ঝুঁকি তৈরি করে: জন্মের সময় শিশুর অতিরিক্ত ওজন (ম্যাক্রোসোমিয়া), যা প্রসবের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে; নবজাতকের হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা জন্মের পরপরই রক্তে শর্করার মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া; শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বা রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোম; নবজাতকের জন্ডিস; পরবর্তী জীবনে ওই শিশুর স্থূলতা (ওবেসিটি) এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি।

মায়ের জন্য ঝুঁকি: গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বা ‘প্রি-এক্লাম্পসিয়া’র ঝুঁকি; জটিলতার কারণে সিজারিয়ান অপারেশনের (সি-সেকশন) প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যাওয়া;

৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে স্থায়ীভাবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি; পরবর্তী গর্ভাবস্থায় আবারও গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও করণীয়

ডায়াবেটিস ইউকের গবেষকেরা বলছেন, এই স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় প্রসব-পরবর্তী সেবার ঘাটতিগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে, নিম্ন আয়ের ও সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর নারীদের প্রতি বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন, কারণ, এই স্তরের মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের শিকার হন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের নিয়মিত পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম বা নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু গর্ভাবস্থাকে নিরাপদ করবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত