পিথাগোরাসের উপপাদ্য পিথাগোরাসের নয়, এত দিন কি ভুল জানতেন

গণিতের ক্লাসে সমকোণী ত্রিভুজের কথা উঠলেই যে নামটি সবার আগে মনে পড়ে, সেটি পিথাগোরাস। ত্রিভুজের তিন বাহুর মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, যা তাঁর নামেই পরিচিত—পিথাগোরাসের উপপাদ্য। উপপাদ্যটির বক্তব্য হলো, কোনো সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের ওপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল বাকি দুই বাহুর ওপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্র দুটির ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান। গাণিতিক সূত্র আকারে এটিকে লেখা হয়: a² + b² = c²।

কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই উপপাদ্য যে পিথাগোরাসেরই আবিষ্কার সেটা নিশ্চিত হওয়া গেল কীভাবে? তাঁর জন্মের বহু আগেই মানুষ এই গাণিতিক সম্পর্ক জানত— এমনও তো হতে পারে!
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক হাজার বছর আগের পৃথিবীতে। ঘুরে দেখতে হবে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, ভারত ও চীনের গণিতচর্চার ইতিহাস। তবেই বোঝা যাবে, কেন একটি গাণিতিক উপপাদ্য আজও একজন গ্রিক দার্শনিকের নামেই পরিচিত।
পিথাগোরাস: সংখ্যা ও জ্যামিতির এক দার্শনিক
সময়টা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী। প্রাচীন গ্রিসের সামোস দ্বীপে জন্ম নেন দার্শনিক ও গণিতবিদ পিথাগোরাস (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫৭০–৪৯৫ অব্দ)। তাঁর জীবন ও কাজ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। পরবর্তী সময়ে লেখা বিভিন্ন বিবরণ থেকে তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা গেলেও সেগুলোর সবকিছু নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
পিথাগোরাস ও তাঁর অনুসারীরা বিশ্বাস করতেন, সংখ্যার সাহায্যে প্রকৃতির অনেক রহস্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তাঁরা দর্শন, গণিত ও সংগীতসহ বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা করতেন। তাঁদের ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটি গোষ্ঠী, যা পিথাগোরীয় সমাজ নামে পরিচিত।
প্রচলিত বর্ণনায় পিথাগোরাসের নামের সঙ্গে সমকোণী ত্রিভুজের একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক সম্পর্ক যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু তিনি নিজে ঠিক কখন এবং কীভাবে এই সম্পর্ক আবিষ্কার করেছিলেন, কিংবা তাঁর অনুসারীদের কেউ এর প্রমাণ দিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য নেই। তবে পিথাগোরাসের জন্মের বহু আগের কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এমন গাণিতিক সম্পর্কের ব্যবহার পাওয়া যায়। অর্থাৎ, উপপাদ্যটির সঙ্গে সম্পর্কিত জ্ঞান প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যেই প্রথম সৃষ্টি হয়েছিল—এমন ধারণার সপক্ষে নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
মেসোপটেমিয়ার মাটির ফলক: পিথাগোরাসের আগেই গাণিতিক সম্পর্কের ব্যবহার
আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে, বর্তমান ইরাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতা। সে সময়ের মানুষ জমি পরিমাপ, স্থাপনা নির্মাণ ও দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশের জন্য উন্নত গণিতচর্চা করত। তাদের এই জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় মাটির তৈরি বিভিন্ন ফলক থেকে।
এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘প্লিম্পটন ৩২২’। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১৮০০ অব্দের এই মাটির ফলকটি প্রাচীন ব্যাবিলনীয় গণিতচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এতে কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা সংখ্যার সারি রয়েছে। সংখ্যাগুলোর মধ্যে এমন সম্পর্ক দেখা যায়, যা বর্তমানে পিথাগোরীয় ত্রয়ী নামে পরিচিত।

পিথাগোরীয় ত্রয়ী হলো এমন তিনটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা, যেগুলোর প্রথম দুটি সংখ্যার বর্গের যোগফল তৃতীয় সংখ্যার বর্গের সমান। যেমন, ৩, ৪ ও ৫ একটি পিথাগোরীয় ত্রয়ী। কারণ, ৩² + ৪² = ৯ + ১৬ = ২৫ = ৫²। একইভাবে ৫, ১২ ও ১৩-এর ক্ষেত্রেও সম্পর্কটি সত্য। এ ধরনের সংখ্যার সম্পর্ক সমকোণী ত্রিভুজের বাহুগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যেমন, কোনো সমকোণী ত্রিভুজের দুই উল্লম্ব বাহুর দৈর্ঘ্য ৩ ও ৪ একক হলে অতিভুজের দৈর্ঘ্য হবে ৫ একক।
প্লিম্পটন ৩২২ ফলকটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আবিষ্কৃত হয়। পরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে আসে। ১৯৪৫ সালে গণিতবিদ অটো নিউগেবাউয়ার ও আব্রাহাম স্যাকস ফলকটির গাণিতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তাঁদের মতে, ১৫টি সারিতে ফলকটিতে খোদাই করা ৬০টি সংখ্যার সঙ্গে পিথাগোরীয় ত্রয়ীর সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, সংখ্যাগুলো সমকোণী ত্রিভুজের পরিচিত সমীকরণ a² + b² = c² মেনে চলে। এরপর থেকে এর উদ্দেশ্য ও সংখ্যাগুলো কীভাবে আবিষ্কৃতি হয়েছিল, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
২০১৭ সালে Historia Mathematica সাময়িকীতে প্রকাশিত গণিতবিদ ড্যানিয়েল এফ. ম্যানসফিল্ড এবং এন. জে. ওয়াইল্ডবার্গারের গবেষণাপত্রে ফলকটিকে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়দের অনুপাতভিত্তিক ত্রিভুজ-সম্পর্কিত গণিতচর্চার নিদর্শন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাঁদের মতে, এতে এমন একটি সংখ্যাভিত্তিক পদ্ধতির নিদর্শন রয়েছে, যা আধুনিক ত্রিকোণমিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
পিথাগোরাসওয়েবসাইটে এ নিয়ে সুইডিশ গণিতবিদ সাইমন রেব্রান্ড এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এর কৃতিত্ব পিথাগোরাসকে দেওয়া হলেও এরকম কোনো প্রমাণ নেই যে তিনিই প্রথম এটি সমাধান করেন।’ পিথাগোরাসের আগেই এই উপপাদ্য ব্যাবিলনীয়রা ও চীনা গণিতবিদেরা সমাধান করেছেন বলে নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া মার্কিন গণিতবিদ ব্রুস র্যাটনারের ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘Pythagoras: Everyone knows his famous theorem, but not who discovered it 1000 years before him’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে পিথাগোরাসের উপপাদ্যের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাপত্রটি স্প্রিঙ্গারের অন্তর্ভুক্ত Journal of Targeting, Measurement and Analysis for Marketing জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাপত্রটির শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘পিথাগোরাস: সবাই তাঁর বিখ্যাত উপপাদ্যটি জানে, তবে কেউ জানে না তাঁরও হাজার বছর আগে এটা কে আবিষ্কার করল’।
ব্রুস র্যাটনার বলেন, ব্যাবিলনীয়রা বর্গের কর্ণের দৈর্ঘ্য ও এর বাহুগুলোর সম্পর্ক জানত: d = √2। তাঁর ভাষ্যে, ‘এটিই সম্ভবত প্রথম জানা অমূলদ সংখ্যা। অন্যদিক থেকে ভাবলে এর আরেকটি অর্থ দাঁড়ায়— পিথাগোরাসের উপপাদ্যখ্যাত নিয়মটির সঙ্গে তারা পরিচিত ছিল। অন্তত এর বিশেষ ব্যবহার, বর্গের কর্ণের দৈর্ঘ্য, d² = a² + a² = 2a² তারা জানত (d বর্গের কর্ণ ও a বর্গের বাহু)। সেটি বিখ্যাত পিথাগোরাসের আরও প্রায় হাজার বছর আগের কথা।’
পিথাগোরাসের উপপাদ্যের আরেক ধরনের প্রয়োগ আছে। এর ইংরেজি নাম ‘পিথাগোরিয়ান ট্রিপল’। বাংলায় বলা যায়, পিথাগোরাসের ত্রয়ী।
তবে ফলকটির উদ্দেশ্য নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই এটি থেকে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত গাণিতিক নিয়ম জানত—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলেও, তারা আধুনিক অর্থে উপপাদ্যটির সাধারণ প্রমাণ দিয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এতটুকু স্পষ্ট যে, পিথাগোরাসের জন্মের এক হাজার বছরেরও বেশি আগে ব্যাবিলনীয়রা সমকোণী ত্রিভুজের বাহুগুলোর মধ্যে বিশেষ সম্পর্কযুক্ত সংখ্যার হিসাব জানত। ফলে এই গাণিতিক জ্ঞানকে কেবল পিথাগোরাসের একক আবিষ্কার হিসেবে দেখা কঠিন।
বৈদিক ভারতের দড়ি ও জ্যামিতিক বেদি
এবার নজর দেওয়া যাক প্রাচীন ভারতের দিকে। বৈদিক যুগে বিভিন্ন ধর্মীয় যজ্ঞের জন্য নির্দিষ্ট আকার ও মাপের অগ্নিবেদি নির্মাণ করা হতো। এসব বেদি তৈরিতে সঠিক দৈর্ঘ্য, কোণ ও জ্যামিতিক আকৃতি নির্ধারণ করা জরুরি ছিল। সেই কাজে দড়ি ব্যবহার করে মাপজোখের পদ্ধতি গড়ে ওঠে। এটি সংরক্ষিত রয়েছেশুল্বসূত্রগুলোতে । ‘শুল্ব’ শব্দটির অর্থ পরিমাপ বা মাপবার ফিতা। শুল্বসূত্রে যজ্ঞের বেদি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জ্যামিতিক নিয়ম ও পরিমাপের পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।
এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৌধায়ন শুল্বসূত্র যা প্রাচীন ভারতীয় গণিতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর রচনাকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য না থাকলেও সাধারণভাবে একে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের কোনো এক সময়ের রচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেকের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম শতাব্দীতে ভারতীয় মহর্ষি ও গণিতবিদ বৌধায়ন রচনা করেন ‘বৌধায়ন শুল্বসূত্র’। তিনি এই গ্রন্থে লেখেন, ‘দীর্ঘস্যা ক্ষণয়া রজ্জুঃ পার্শ্বমানী তির্যঙ্মানী চ যৎ পৃথক্পৃথগ্ ভূতে কুরুতস্তদুভয়ং করোতি।’ বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, একটি আয়তক্ষেত্রের কর্ণের ওপর যে দড়ি টানা হয়, তার ওপর অঙ্কিত ক্ষেত্রফল আয়তক্ষেত্রের দুই বাহুর ওপর পৃথকভাবে অঙ্কিত ক্ষেত্রফলের যোগফলের সমান।

বৌধায়ন কেবল সূত্রই লেখেননি, তিনি (৩, ৪, ৫), (৫, ১২, ১৩), (৮, ১৫, ১৭) এবং (১২, ৩৫, ৩৭)-এর মতো বহু জ্যামিতিক ত্রয়ী ব্যবহার করে বেদির দৈঘ্য ও কোণ ঠিক করতেন। মূলত যজ্ঞের বেদির দৈর্ঘ্য ও কোণ বজায় রাখার প্রয়োজন থেকেই এসব নিয়মের ব্যবহারিক গুরুত্ব তৈরি হয়।
এ ছাড়া স্প্রিঙ্গার প্রকাশিত Handbook of the History and Philosophy of Mathematical Practice-এ প্রকাশিত ‘Ancient Indian Mathematics: Sulbasutras – A Mathematical Review’ শীর্ষক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, শুল্বসূত্রগুলোতে বিভিন্ন জ্যামিতিক নির্মাণ ও নীতির উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে পিথাগোরাসের উপপাদ্য নামে পরিচিত সম্পর্কটিও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, প্রাচীন ভারতে জ্যামিতির এই সম্পর্ক শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান ছিল না; ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের মতো ব্যবহারিক কাজেও এর প্রয়োগ ছিল।
প্রাচীন চীনের গণিত: গৌগু উপপাদ্য
দূর প্রাচ্যের চীনেও কিন্তু এই জ্যামিতির চর্চা ছিল। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দে রচিত বিখ্যাত চীনা গণিত গ্রন্থ ‘ঝৌবি সুয়ানজিং’-এ এক প্রাচীন আলোচনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে ডিউক অব ঝৌ এবং তাঁর মন্ত্রী শ্যাং গাওয়ের মধ্যে একটি জ্যামিতিক সংলাপ নথিভুক্ত আছে। সেখানে শ্যাং গাও একটি সমকোণী ত্রিভুজের বাহুগুলোর হিসাব দিয়ে লেখেন—লম্ব (Gou) যদি ৩ হয় এবং ভূমি (Gu) যদি ৪ হয়, তবে অতিভুজ (Cian) হবে ৫। চীনের ইতিহাসে এই জ্যামিতিক নিয়মটি আজও ‘গৌগু উপপাদ্য’ (Gougu Theorem) নামে পরিচিত।

তবে ‘ঝৌবি সুয়ানজিং’ ঠিক কবে রচিত হয়েছিল, তা নিশ্চিত নয়। অনেকের ধারণা, গ্রন্থটির বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সংকলিত। চীনা গণিতের এই ঐতিহ্যও দেখায় যে, সমকোণী ত্রিভুজের বাহুগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক বিভিন্ন সভ্যতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে কোন সভ্যতা প্রথম এই নিয়মটি আবিষ্কার করেছিল, তা নির্ধারণ করার মতো পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
তাহলে পিথাগোরাসের নামেই উপপাদ্যটির নাম কেন?
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ব্যাবিলনীয়, ভারতীয় ও চীনা গণিতচর্চায় এই সম্পর্কের নজির থাকলেও উপপাদ্যটি পিথাগোরাসের নামে পরিচিত হলো কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে প্রাচীন গ্রিক গণিতের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
পিথাগোরাসের জীবন ও গাণিতিক অবদান সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ও সমসাময়িক নথি খুব সীমিত। কারণ, পিথাগোরিয়ান জ্ঞান শেখানো হতো মুখে মুখে। লেখার চল ছিল না সেভাবে। ফলে তাঁর অনুসারীদের নামে প্রচলিত অনেক ধারণা ও কাজ পরবর্তী সময়ে পিথাগোরাসের নামে প্রচলিত রয়েছে। যার কারণে কোন আবিষ্কারটি তিনি নিজে করেছিলেন আর কোনটি তাঁর অনুসারীদের অবদান, তা আলাদা করে চিহ্নিত করাও কঠিন। সমকোণী ত্রিভুজের এই সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে।
অনেকে বলেন, ব্যাবিলন ও প্রাচীন ভারতের গণিতবিদেরা প্রকৌশল ও দৈনন্দিন ব্যবহারিক কাজে বর্তমান পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁদের নিজস্ব গাণিতিক নিয়ম প্রয়োগ করতেন। তবে পিথাগোরাস ও তাঁর গ্রিক অনুসারীদের অবদান হিসেবে জ্যামিতিক উপপাদ্যকে যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
উপপাদ্যটির একটি আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিডের ‘এলিমেন্টস’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ৪৭তম প্রস্তাবে। ইউক্লিড পিথাগোরাসের পরবর্তী সময়ের গণিতবিদ। তাঁর গ্রন্থে জ্যামিতির বিভিন্ন বক্তব্যকে সংজ্ঞা, স্বীকার্য ও পূর্ববর্তী প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুক্তিসংগতভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তবে ইউক্লিডই যে প্রথম এই উপপাদ্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাঁর গ্রন্থে প্রমাণটি সংরক্ষিত থাকার কারণে এটি প্রাচীন গ্রিক জ্যামিতির ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ধারণা করা হয় যে পিথাগোরাস যেহেতু ব্যাবিলনে গিয়েছিলেন, তিনি সেখান থেকে এটি শিখে এসে গ্রিসের মানুষদের মাঝে তা ছড়িয়ে দেন এবং পরবর্তীকালে গ্রিস থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন বইয়ে তাঁকেই এর কৃতিত্ব দেওয়া হয়। আর এভাবেই বিশ্বজুড়ে এটি পরিচিতি পায় ‘পিথাগোরাসের উপপাদ্য’ হিসেবে। তবে অনেকে মনে করেন, গণিতের ইতিহাস কীভাবে লেখা হয়েছে, তা বিবেচনা করলেও কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। উনিশ শতকে আধুনিক গণিতের ইতিহাস রচনার সময় ইউরোপীয় গবেষকেরা মূলত প্রাচীন গ্রিকদের লিখিত নথি ও গাণিতিক কাজকে ভিত্তি করে ইতিহাস সাজিয়েছিলেন। ফলে বিশ্বগণিতের ইতিহাসে গ্রিকদের অবদান বেশি গুরুত্ব পেলেও ব্যাবিলনীয় ও ভারতীয় গণিতের প্রাচীন অবদান তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, পিথাগোরাসের উপপাদ্যের ইতিহাস কোনো একজন মানুষের আবিষ্কারের গল্প নয়; বরং এটি কয়েকটি প্রাচীন সভ্যতার গণিতচর্চার সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘ ইতিহাস। তবে এটা জানা যায় না যে এই জ্যামিতিক সূত্র কি একবারই আবিষ্কার হয়েছে নাকি বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় আবিষ্কার হয়েছে।
পিথাগোরাস সূত্রটি অন্য কোথাও থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রহণ করেছিলেন নাকি তিনি স্বাধীনভাবে নতুন করে এটি আবিষ্কার করেছিলেন, তা নিশ্চিত বলা যায় না। তবে আজকের গণিতবিদ ও ইতিহাসবিদদের মতে, পিথাগোরাস সমকোণী ত্রিভুজের এই সূত্রের একক ‘আবিষ্কারক’ নন, বরং তিনি ছিলেন এর প্রাতিষ্ঠানিক প্রবক্তা বা প্রমাণক। জ্যামিতির এই জাদুকরী নিয়মটি মানবজাতির একটি যৌথ জ্ঞান অর্জনের ইতিহাস, যার পেছনে ব্যাবিলন, ভারত, চীন এবং গ্রিস—সব সভ্যতারই অনন্য অবদান রয়েছে।









