Ajker Patrika

ফ্যাক্টচেক /কিস্তি নিয়ে এনজিওকর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনাকে হিন্দু তরুণীকে ধর্ষণ বলে প্রচার

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৩: ১৮
কিস্তি নিয়ে এনজিওকর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনাকে হিন্দু তরুণীকে ধর্ষণ বলে প্রচার

এক বাংলাদেশি হিন্দু তরুণীকে তাঁর বাবার সামনেই মুসলিমরা ধর্ষণ করেছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

Faraz Pervaiz’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ইংরেজি ক্যাপশনে ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, এক হিন্দু তরুণী তাঁর বাবার সামনে ধর্ষণের শিকার হয়ে বিবরণ দিচ্ছেন এবং পাশে তাঁর বাবা কাঁদছেন। গত ২৩ আগস্ট শেয়ার করা ২৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি ইতিমধ্যে ৪ লাখ ৫২ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে এবং এতে সাড়ে ৯ হাজারের বেশি রিয়েকশন ও ৪ হাজার ৫০০ রিপোস্ট রয়েছে।

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ২৮ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বলছেন, ‘আমার অবস্থা, আমার অবস্থা।’ এ সময় তাঁকে ‘আমাকে কী করছে’—এমন কথাও বলতে শোনা যায়। ভিডিওতে ওই নারীর পাশে থাকা একজন ব্যক্তিকেও কান্নাজড়িত কণ্ঠে কিছু বলতে দেখা যায়। তবে ভিডিওতে কিংবা এক্স পোস্টের ক্যাপশনে ঘটনার স্থান বা সময় সংক্রান্ত কোনো তথ্যের উল্লেখ নেই।

এ ছাড়া মূলধারার কোনো গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে হিন্দু তরুণীকে বাবার সামনে ধর্ষণের খবরের সত্যতা মেলেনি।

তবে অনুসন্ধানে ‘Daily Bangla Post’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ১৫ মে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যার সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। প্রচারিত ভিডিওটির ক্যাপশনে বলা হয়েছে, কিস্তির টাকা না পেয়ে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করার অভিযোগ উঠেছে এনজিওকর্মীদের বিরুদ্ধে।

৪ মিনিট ২৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে ওই নারী ও তাঁর সঙ্গে থাকা যুবককে এনজিওকর্মীদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ করতে শোনা যায়। তবে ভিডিওতে এনজিওকর্মীরা পাল্টা অভিযোগে বলেন, ওই নারী ঋণ নিয়ে কিস্তির টাকা দিচ্ছেন না। উল্টো নিজেকে ভুক্তভোগী সাজানোর চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া ভিডিওতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি কুমিল্লার।

বাংলা পোস্টের ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট
বাংলা পোস্টের ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

অধিকতর অনুসন্ধানে কুমিল্লার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘কুমিল্লা প্রতিদিন’-এ চলতি বছরের ১৩ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কুমিল্লা শহরের গোয়ালপট্টি এলাকায় ‘পল্লী মঙ্গল কর্মসূচি’ নামের একটি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার কিস্তির টাকা পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় শ্যামল চন্দ্র সরকার ও তাঁর স্ত্রী রিনা রানী সাহাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে এনজিও কর্মীদের বিরুদ্ধে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঘটনায় জিম্মাদারসহ চারজনের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শ্যামল চন্দ্র সরকার। ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, রিনা রানী সাহা নামের এক গৃহপরিচালিকা পল্লী মঙ্গল কর্মসূচি থেকে ৮০ হাজার টাকার ঋণ গ্রহণ করেন। তিনি নিয়মিতভাবে মাসিক ৮ হাজার টাকা করে ছয়টি কিস্তি পরিশোধ করলেও পরবর্তী তিনটি কিস্তি সময়মতো দিতে পারেননি। রিনা রানী সাহার স্বামী শ্যামল চন্দ্র সরকার পেশায় রংমিস্ত্রি।

অভিযোগে বলা হয়, গত ৩০ এপ্রিল রাত আনুমানিক ১০টার দিকে পল্লী মঙ্গল কর্মসূচির মাঠকর্মী মিরাজ হোসেন, রাহিদ, ইতি দেবনাথ ও রোকসানা আক্তার গোয়ালপট্টি এলাকায় তাঁদের ভাড়া বাসায় যান। এ সময় দম্পতি আগামী মাস থেকে বকেয়া কিস্তি পরিশোধের আশ্বাস দিলেও অভিযুক্তরা বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ইতি দেবনাথ ও রোকসানা আক্তার রিনা রানী সাহাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন। স্ত্রীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে শ্যামল চন্দ্র সরকারকেও মারধর করা হয়।

এ ছাড়া ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযুক্তরা দম্পতির পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন এবং রিনা রানী সাহার শাখা ভেঙে দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। পরে আশপাশের লোকজন এসে তাঁদের উদ্ধার করেন।

ঘটনার রাতেই কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লী মঙ্গল কর্মসূচির কর্মকর্তা মিরাজ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমরা কাউকে মারধর করিনি। ঋণের টাকা না দেওয়ার জন্য ওই দম্পতি নাটক সাজিয়েছেন।’

ভুক্তভোগী শ্যামল চন্দ্র সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঘটনার পর পুলিশ আমাদের ডাকলেও জিম্মাদার থানায় উপস্থিত না হওয়ায় কোনো সমাধান হয়নি।’

কম্পেরিজন: আজকের পত্রিকা
কম্পেরিজন: আজকের পত্রিকা

এ ছাড়া, Faraz Pervaiz নামের অ্যাকাউন্টটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অ্যাকাউন্টটি কানাডা থেকে পরিচালিত। এর আগেও ওই অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশকে নিয়ে ভিত্তিহীন তথ্য শেয়ার করার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশে বাবার সামনে হিন্দু তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়েছে দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার। মূলত কুমিল্লায় এক এনজিওর কিস্তির টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে হিন্দু দম্পতিকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগের পুরোনো ঘটনাকে আলোচিত দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত