দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে ইসলাম। মাতৃভূমির ভালোবাসা লালন করা ইসলামি মূল্যবোধের অংশ। প্রত্যেক মুসলমানেরই দেশপ্রেমিক নাগরিক হওয়া উচিত। মহানবী (সা.) নিজের দেশ, মাটি ও মানুষকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। ছোটবেলায় চাচা আবু তালিবের সঙ্গে এবং বড় হয়ে বিবি খাদিজার ব্যবসা পরিচালনা করতে সিরিয়া গমন ছাড়া হিজরতের আগপর্যন্ত তিনি কোনো দিন মক্কার বাইরে পা রাখেননি।
নবুয়ত লাভের পর ইসলাম প্রচারে মক্কার কাফিরেরা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাঁর ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালায় এবং তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তবু তিনি স্বদেশভূমি মক্কা ছেড়ে যেতে চাননি। কাফিরেরা মহানবী (সা.)-কে চিরতরে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর ঘর অবরোধ করলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন।
মহানবী (সা.)-এর হৃদয়ে দেশপ্রেম এতই প্রবল ছিল যে, মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হলেও তিনি মক্কার মায়া ত্যাগ করতে পারছিলেন না; বারবার পেছনে ফিরে মক্কার দিকে তাকাচ্ছিলেন এবং চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলছিলেন, ‘কত চমৎকার শহর তুমি হে মক্কা! আমি তোমায় কত ভালোবাসি! যদি তোমার সন্তানেরা আমাকে তোমার কোল থেকে বের করে না দিত, তবে কস্মিনকালেও আমি তোমার কোল ত্যাগ করতাম না।’
মহানবী (সা.) মাতৃভূমিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন বলেই পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং মক্কা নগরীকে জড়িয়ে শপথ করেছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘আমি শপথ করছি এই নগরীর; আর তুমি এই নগরীর অধিবাসী।’ (সুরা বালাদ, আয়াত: ১-২)
শুধু মহানবীই (সা.) নন, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং কল্যাণ কামনার মনোভাব লালন করা মুসলিম উম্মাহর পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এরও আদর্শ ছিল। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো, যখন ইবরাহিম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক, এ ভূখণ্ডকে নিরাপদ শহরে পরিণত করুন এবং এর অধিবাসীদের নানা ধরনের ফলমূলের মাধ্যমে জীবিকা দান করুন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৬)
মদিনায় হিজরত করার পর মহানবী (সা.)-এর জীবনের নানা ঘটনায় তাঁর প্রবল দেশপ্রেম ফুটে ওঠে। তিনি মদিনায় হিজরত করলেন, ষোলো কিংবা সতেরো মাস বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ পড়লেন; কিন্তু তাঁর মন পড়ে রইল মক্কার দিকেই। নামাজের সময় হলেই তিনি আকাশের দিকে তাকাতেন, যেন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেন। এবং সত্যিই একদিন আসরের সময় মহানবী (সা.)-এর জন্য মুসলমানদের কিবলা মক্কার দিকে ফিরিয়ে দিলেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আমি তোমাকে বারবার আকাশের দিকেই তাকাতে দেখি। অতএব তোমাকে সেই কিবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব, যা তুমি পছন্দ করো। এখন তুমি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ করো। …’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৪)
শুধু তা-ই নয়, মহানবী (সা.) মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করলেন, মদিনার আনসাররা তাঁকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসলেন; তারপরও মাতৃভূমি মক্কার জন্য তাঁর প্রাণ কাঁদত। হিজরতের ছয় বছর পার না হতেই তিনি মক্কায় ফেরার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন।
পরবর্তী সময়ে বহু বাধাবিপত্তি পেরিয়ে অষ্টম হিজরিতে বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন।
মহানবী (সা.) ঘোষণা দেন, ‘মাতৃভূমির ভালোবাসা ইমানের অঙ্গ।’ মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষাকারী এবং দেশের আজাদির জন্য জীবন উৎসর্গকারীকে শহীদের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন তিনি। এমনকি প্রয়োজনের মুহূর্তে সীমান্ত পাহারা দেওয়াকে এক বছরের ইবাদতের সমতুল্য বলেও ঘোষণা করেন। এভাবেই ইসলাম দেশপ্রেমকে সত্যিকার অর্থে মহান মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের নিখাদ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাতৃভূমির কল্যাণে কাজ করার তৌফিক দান করুন।
ড. মো. আবদুল কাদির, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান
আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










