Ajker Patrika

কত দূর এগোল মানুষ!

মানবর্দ্ধন পাল
আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২২, ১০: ২৬
কত দূর এগোল মানুষ!

বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও আর্টফিল্ম নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের কথা মনে পড়ছে। তিনি ১৯৯৮ সালে ‘চিত্রা নদীর পারে’ নামে একটি টেলিফিল্ম নির্মাণ করেছিলেন। এর প্রেক্ষাপট ছিল সাতচল্লিশের দেশভাগের ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অপরিসীম আত্মগ্লানি ও অমানুষিক জীবনযন্ত্রণা। যাঁরা এই বস্তুনিষ্ঠ শৈল্পিক সিনেমাটি দেখেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই এর সমাজসত্য উপলব্ধি করে আত্মদংশনে বিদ্ধ হয়েছেন। সেই চলচ্চিত্রের ঘটনাপ্রবাহের স্থানটি ছিল চিত্রা নদীর পারের নড়াইল। কী অপরিসীম অপমান ও যন্ত্রণায় তিলে তিলে দগ্ধ হয়ে একটি হিন্দু পরিবার দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল, তারই মর্মন্তুদ কাহিনি ‘চিত্রা নদীর পারে’ চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত হয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না শুনেছি, কিন্তু এবার যেন তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে চলছে।

এই প্রেক্ষাপটে লিখতে বাধ্য হচ্ছি, শঙ্কা, ভয়, ঘৃণা, অপমান, লজ্জা, সংশয়, নিরাপত্তাহীনতা, অতর্কিত হামলা ইত্যাদি যত ধরনের ঝুঁকি আছে জীবনে, তা দীর্ঘদিন ধরে আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। সেসবের তাপ এবং ধোঁয়া এত দিন অনুভব করলেও তা প্রকাশ করতে পারিনি। ছাইচাপা ছিল কিংবা ছিল সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো মনের গভীরে। ভেতরে দগ্ধতার ঘা ছিল, দহনের জ্বালা ছিল, বেদনার বিষ ছিল—সবই অপ্রকাশিত। ধৈর্য ধরে সহ্য করে নিচ্ছিলাম বেদনার হিমবাহ ও আত্মগ্লানি। কিন্তু এখন তা অগ্ন্যুৎপাতের জ্বালামুখ খুঁজছে।

আমি ভীতসন্ত্রস্ত যে, আমি ফেসবুক চালাই সক্রিয়ভাবে। আমি শঙ্কিত যে ফেসবুকে লেখালেখি করি। আমি সংশয়াকুল যে আমার নামটি প্রমাণ করে, আমি অমুসলিম। আরও স্পষ্ট করে লিখলে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু। একেবারে চাঁছাছোলা এবং উলঙ্গ করে লিখলে সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু। পেছন থেকে ‘মালাউন’ শব্দটি শোনা আমার মজ্জাগত। পিতামাতা সনাতনী ছিলেন এবং তাঁদের ঔরসে ও গর্ভে জন্মেছি বলে সেটা আমার দোষ নয়। কিন্তু সেই দোষেই এখন আমি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের দেশে দোষী—অলিখিতভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। যে যা-ই ভাবুন, আমি মনেপ্রাণে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ বলেই মনে করি। বিশ্বাস করি, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’। হৃদয়ে লালন করি, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। যদিও এখন আমাদের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি নেই কিন্তু ‘সকল ধর্মের সমান অধিকার’ তো আছে। সংবিধানসম্মত সেই নাগরিক অধিকারটুকুই আমি নিশ্চিন্তে ভোগ করতে চাই। অন্য দশজনের মতো সমান অধিকার নিয়ে আমি বাস করতে ও বাঁচতে চাই। প্রচলিত আইনে দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি মাথা পেতে নিতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু বিচারবহির্ভূত অপমান, লাঞ্ছনা, লুটপাট, খুন, বিত্তবিনাশ, অগ্নিসংযোগ, চোখের জল, বুকফাটা আর্তনাদ আমি চাই না। পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকার আমি চাই। কেবল কাগুজে অধিকার  নয়—প্রায়োগিক অধিকার।
যখন শিক্ষার্থী বা শিক্ষক ছিলাম, তখন বৃহস্পতিবারটি ছিল পরম আনন্দের। পরদিন শুক্রবার ছুটির দিন, ‘কী করি আজ ভেবে না-পাই, পথ হারিয়ে কোন বনে যাই...’। কিন্তু এখন সপ্তাহান্তে ঠিক এই বৃহস্পতিবারটি এলেই মনে সন্দেহ, সংশয়, ভয়ভীতির দমবন্ধ করা ধোঁয়া ঘিরে ধরে! এই বুঝি আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক হলো কিংবা কোনো অজানা দুর্বৃত্ত আমার নামে একটি ভুয়া আইডি খুলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মে আঘাত দিয়ে কোনো পোস্ট দিল! আর ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে পরদিন শুক্রবার শুরু হয়ে গেল দক্ষযজ্ঞের চেয়েও ভয়ংকর তুলকালাম কাণ্ড। হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ—তা ছড়িয়ে গেল আশপাশের সংখ্যালঘুর বাড়িঘর, মন্দির, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। কিছুদিন পরপর ধর্মান্ধতার এমন প্রতিকারহীন আক্রমণের আশঙ্কা বৃহস্পতি ও শুক্রবারের শান্তিময় ছুটির আমেজ করছে আতঙ্কগ্রস্ত! এতে কি শুক্রবারের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে না?

মানবর্দ্ধন পালএর আগে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম অবমাননার যত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তার জন্য সংখ্যালঘু অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হয়নি। ফেসবুকের ভুয়া আইডি থেকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তা করা হয়েছে। কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, কুমিল্লার নানুয়ারদিঘির পাড়, দিনাজপুরের সাঁওতালপল্লি, সুনামগঞ্জের শাল্লা, রংপুর, নড়াইলের লোহাগড়ার সাহাপাড়াসহ পূর্বাপর সব ঘটনার সূত্রপাতই এক রকম। পরিণতিটাও অভিন্ন। দেখা যাচ্ছে ষড়যন্ত্রের কোনো ভিন্ন প্রক্রিয়া নেই। সেই পুরোনো ট্র্যাডিশন বয়ে চলেছে—রকমফের নেই। সেই ফেসবুক, সেই ভুয়া আইডি, ধর্ম নিয়ে সেই কটূক্তি! এসব কারা করছে, কেন করছে, এর অন্তরালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী, তা এখন বুঝতে কারও বাকি নেই। এই অপকর্মের উদ্দেশ্য অসৎ—ধর্মরক্ষা নয়, স্বার্থবুদ্ধির প্ররোচনা। এসবের শিকড়-বাকড় যেমন গভীরে, তেমনি ইন্ধনদাতারও অভাব নেই! গাছের গোড়া কেটে ওপরে পানি ঢালার রাজনীতি-বিলাস এবং ক্ষমতালিপ্সুদের ‘সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো—এমন দ্বিমুখী নীতির কলাকুশলীরও অভাব নেই! নইলে অভিযুক্তকে আইনের হাতে তুলে দিলেই হয়, নির্বিচারে সম্প্রদায়বিশেষের ওপর হামলা ও লুটপাট কেন? এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা বাংলা সিনেমার মতো। সব অপকর্ম শেষ হলে সদলবলে তাদের উপস্থিতি, সান্ত্বনাদান, বিচার ও নিরাপত্তাবিধানের অসত্য অঙ্গীকার এবং কিছু আর্থিক সাহায্য প্রদান। অবশেষে বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রতা। তারপর আবার যেই-সেই—থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। ভাঙা ঘর মেরামত করা যায়, কিন্তু ভাঙা হৃদয় জোড়া দেওয়া যায় না! একবার ভেবে দেখুন তো, এ দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরূপ পরিবেশে জিয়ল মাছের মতো বেঁচে আছে কি না? তাদের কি এত বড় বুকের পাটা আছে যে সংখ্যাগুরুর ধর্ম অবমাননা করে? তা হলে এ দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতো, একপেশে নির্যাতন হতো না। বলা হয়ে থাকে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা দেশের আমানত। কথা মিথ্যা নয়। আমানত তো থাকে ব্যাংকে বা লকারে। তবে তা কিন্তু ইচ্ছেমতো ব্যবহার বা খরচও করা যায়! এখন অবস্থাদৃষ্টে তা-ই কি মনে হয় না?

এসব প্রতিকারহীন হিংস্রতা ও মানবতার অপমানের কথা ভাবলে চোখ ফেটে এখন আর জল আসে না, রক্ত আসে। অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ও শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের আদর্শ ও অঙ্গীকার নিয়ে স্বাধীন হয়েছে রক্তস্নাত বাংলাদেশ। দেশের তেরো শ নদী দিয়ে কেবল শীতল জলই গড়ায়নি, বয়ে গেছে অপরিমেয় তপ্ত রক্তস্রোতও। ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হলো, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে গেল, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়ন হলো না! বরং অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে। বাস্তবায়ন দূরে থাক; বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মুখে দেওয়া হচ্ছে চুনকালি! তাই ভাবি, ষড়যন্ত্রের ইস্যু যেহেতু ফেসবুক, আত্মরক্ষার স্বার্থে না হয় ফেসবুক বন্ধ করেই দিই। তবু যদি নিরাপদে বাঁচি কিছুকাল! নিজেকেই প্রশ্ন করি, এত চোখধাঁধানো উন্নয়ন ও শিক্ষাবিস্তারের ঢাকঢোল পেটানোর পরও মানসিকভাবে উদারনৈতিক হয়ে এ দেশে কত দূর এগোল মানুষ?

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক ও গ্রন্থকার

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত