মানবজাতির পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর মধ্যে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক অন্যতম। মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ হলো দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের দুটি বাহু, দুটি হাতিয়ার এবং বিশ্ব অর্থনীতির দুটি চাকা। এ চাকা দুটি পরস্পর সমান্তরাল গতিতে না ঘুরলে বা না ঘোরাতে পারলে স্থবির হয়ে পড়ে সমগ্র অর্থনীতি। তাই মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক ও গতি সমান তালে হতে হবে। শ্রমিক-কর্মচারীরা মজুরির জন্য কাজ করেন, আর মালিকপক্ষ নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য শ্রমিকদের খাটায়। শ্রমিক-কর্মচারী ও মালিকপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করলে আর্থসামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে।
শ্রমিক ও কর্মচারীকে দেখতে হবে কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ, সুবিধা-অসুবিধা; আর মালিকপক্ষকে দেখতে হবে শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থ ও সুবিধা-অসুবিধা। একজন শ্রমিক কী রকম হবে, এ ব্যাপারে ইসলামি দিকনির্দেশনা হলো—শ্রমিক-কর্মচারী কোনো অবস্থাতেই মালিকের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না। বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে জানা যায়, দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের শ্রমিকেরা মালিকের অনুপস্থিতিতে আমানতের খেয়ানত করে এবং মালিকের সফলতা কামনা করে না। অথচ মালিকের অনুপস্থিতিতে কর্মচারী যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে মালিক যেমন উপকৃত হয়, তেমনি ব্যবসার উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। তাই আসুন, শ্রমিক ও মালিক সম্পর্ক উন্নয়নে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত চরিত্র উন্নয়ন করি, নিজেকে পরের জন্য তৈরি করি এবং নিজের দায়িত্বকে আমানত মনে করি।
আল্লাহর নিয়মে মানুষের মধ্যে কেউ মালিক, আবার কেউ শ্রমিক। পৃথিবীর কর্মচাকা বেগবান রাখার জন্যই আল্লাহর এ ব্যবস্থাপনা। শ্রমিক তো মালিকের অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ। মহানবী (সা.) বলেন, ‘একজন কর্মচারী তার মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল। আর সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি)
আর শ্রমিক যদি মালিক ও আল্লাহর হক আদায় করে, তবে তার জন্য রয়েছে মহা পুরস্কারের ঘোষণা। মহানবী (সা.) বলেন, ‘একজন কর্মচারী যখন আল্লাহর হক আদায় করার পাশাপাশি তার মালিকের হক আদায় করে, তবে তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে।’ (বুখারি)
কর্মচারীদের অধিকার সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা যা খাবে তাদের তা-ই খাওয়াবে। তোমরা যা পরবে, তাদের তা-ই পরাবে। যদি তারা এমন অপরাধ করে, যা তোমরা ক্ষমা করতে পারো না, তবে তাদের বিদায় করে দেবে; তবু তাদের শাস্তি দেবে না।’ (আহমদ)
হজরত ওমর (রা.) দাসের সঙ্গে সমান আচরণ করতে গিয়ে নিজে উটের পিঠে চড়েছেন এবং চাকরকেও উটের পিঠে চড়িয়েছেন। অপরদিকে যুবক মুহাম্মদ (সা.) খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসা পরিচালনা করে বহু গুণ মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যা ছিল সম্ভাব্য লভ্যাংশের বহু গুণ বেশি। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে যদি মালিকদের মধ্যে খলিফা ওমরের আদর্শের আশা করি, তবে শ্রমিকদেরও ব্যবসায়ী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অর্জন করতে হবে। তাই মালিকদের জন্য আবশ্যক হলো, শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে সম্মানিত করা এবং তাদের অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখা। কোনোভাবেই তাদের গালিগালাজ করা যাবে না। হাদিসে বর্ণিত আছে, একদিন মহানবী (সা.) দেখলেন, আবু বকর (রা.) কোনো অন্যায়ের কারণে কোনো এক দাসকে ধমকাচ্ছেন। তখন মহানবী (সা.) বললেন, ‘তুমি কি সিদ্দিক নাকি অভিশাপকারী?’ এ কথা তাঁর মনে এমন প্রভাব বিস্তার করে যে, সেদিন তিনি ওই দাসকে মুক্ত করে দিলেন। অথচ কোনো কোনো মালিক আজ গালিগালাজকে কাজ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি মহানবী (সা.)-এর ১০ বছর খেদমত করেছি। এই সময়ে তিনি কোনো দিন আমাকে বলেননি, ‘এখনো করোনি? কেন করেছ? করলে না কেন?’ (আহমদ)
আজকাল বসতবাড়ি, অফিস ও কারখানায় গৃহকর্মী ও শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে তা হিসাব কষে দেখা দরকার। হজরত আইয়ুব (আ.)-এর ৫০০ দাস-দাসী ছিল; কোনো দিন কারও সঙ্গে তিনি কটুবাক্য ব্যবহার করেননি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল, কখনো বেতন-ভাতা নিয়ে কোনো কর্মচারীকে আন্দোলন করতে হয়নি। কারণ, ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত মজুরি তিনি তাদের প্রদান করেছেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো।’ (ইবন মাজাহ)
যে পরিমাণ বেতন হলে মোটামুটি পারিবারিক ও সাংসারিক খরচ পরিচালনা করতে পারে, সে পরিমাণ বেতন নির্ধারণ করা এবং তা সময়মতো পরিশোধ করা মালিকপক্ষের কর্তব্য। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) কোনো শ্রমিকের কাজ ও তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ না করা পর্যন্ত কাউকে কাজে লাগাতে নিষেধ করেছেন।’ (আহমদ)
আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বার্থেই মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক মধুর ও সুদৃঢ় করতে হবে। মালিক ও শ্রমিক সম্পর্ক উন্নয়নে ইসলামের আলোকে আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। যেমন মানুষ হিসেবে মালিক-শ্রমিক ভাই ভাই এ কথার স্বীকৃতি দেওয়া এবং একে অপরের প্রতি সহনশীল হওয়া। মালিকপক্ষ সব সময় শ্রমিকের অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখবে এবং তাদের অধিকার সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দিয়ে দায়িত্বশীলের পরিচয় অটুট রাখবে। পাশাপাশি উভয় পক্ষই ধর্মীয় অনুভূতি ও সময়জ্ঞান বজায় রেখে কাজ করা, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে কাজের ফাঁকে ইবাদতও করা যায়। এ ছাড়াও মালিকপক্ষ যদি সন্তোষজনক বেতন নির্ধারণ করে, ওভারটাইম ও বকেয়া বেতন পরিশোধ করে, বোনাস বা উৎসাহ ভাতা সময়মতো প্রদান করে, চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, নির্ধারিত সময় শেষে পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু করে, বৃদ্ধ ভাতা, অবসর ভাতা ও পারিতোষিকের ব্যবস্থা চালু করে তবে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের উৎসাহ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ইসলামের আলোকে মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ ও পরিবারে যেমন শান্তি ও সুখ নেমে আসবে, তেমনি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন আরেক ধাপ ত্বরান্বিত হবে। তাই উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ক মধুর ও হৃদ্যতাপূর্ণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণ সময়ের দাবি।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়










