ক্যাচের সঙ্গে ম্যাচও ফসকাল বাংলাদেশ

শারজায় দুই দলের ড্রেসিংরুমই প্রেসবক্সের বেশ কাছে। খোলা প্রেসবক্স থেকে বেশ বোঝা যাচ্ছিল দুই দলের ডাগআউটের চেহারা কীভাবে বদলাচ্ছে। কখনো বাংলাদেশ দলের ডাগআউটে স্বস্তি তো কখনো সেটি শ্রীলঙ্কার। শেষ পর্যন্ত শারজায় বিজয়ের হাসি লঙ্কানদেরই। বাংলাদেশ দলের সুপার টুয়েলভ শুরু শ্রীলঙ্কার কাছে ৫ উইকেটের হারে।
১৭২ রান তাড়া করতে নামা শ্রীলঙ্কা যখন স্বচ্ছন্দ ব্যাটিংয়ে ৮ ওভারে ১ উইকেটে ৭১ রান তুলে ফেলেছে, ডাগআউটে বাংলাদেশ দলের কোচিং স্টাফ, ম্যানেজমেন্ট আর একাদশের বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের মুখে তখন চিন্তার গাঢ় ছাপ। নবম ওভারে সাকিব আল হাসান চার বলে দুই লঙ্কান ব্যাটার পাথুম নিশাঙ্কা অর অভিষেক ফার্নান্দোকে ফেরালে স্বস্তি ফিরে আসে বাংলাদেশ দলে। সাকিব-নাসুমদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে শ্রীলঙ্কার ওপর চাপ যখন বাড়ছে, তখনই বিরাট ভুল করে বসলেন লিটন দাস।
গতকাল লিটনের মাথাটা সম্ভবত একটু বেশিই গরম ছিল। ১৬ রানে আউট হয়ে ফেরার সময় লঙ্কান পেসার লাহিরু কুমারার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর ফিল্ডিংয়ে আভিস্কা ফার্নান্দো আউট হতেই ব্যাটারের উদ্দেশে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটি যে ভালো ছিল না—দূর থেকে আম্পায়ারদের সতর্কবার্তায় তা বোঝা গেল। অবশ্য এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাই মনে হতো যদি লিটনের পারফরম্যান্সটা ভালো হতো। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হাতছাড়া করেছেন দুটি ক্যাচ। যখন প্রতিপক্ষকে আরও চেপে ধরার সময়, তখনই এমন দুটি ভুল! ১২.৩ ওভারে আফিফ হোসেনের বলে লিটন যখন ক্যাচ ছাড়েন, ভানুকা রাজাপক্ষের রান ১৪। ১৪.৩ ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের বলে চারিথ আসালাঙ্কার ক্যাচ লিটনের হাত থেকে যখন ফসেকেছে, তাঁর রান তখন ৬৩।
লিটনের পিচ্ছিল হাতের সৌজন্যে সুযোগ পাওয়া আসালাঙ্কা-রাজাপক্ষে পঞ্চম উইকেটে গড়লেন ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেওয়া ৮৬ রানের জুটি। পরে ৩০ বলে ৪৬ রানের সমীকরণ মেলাতে রাজাপক্ষে বেছে নিলেন সাইফউদ্দিনের করা ১৬তম ওভার—দুই ছক্কা, দুই চারে ওভারে উঠল ২২ রান। সাইফউদ্দিনের ওভারেই ম্যাচের ফল অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল। শেষ ২৪ বলে ২৪ রান শ্রীলঙ্কা আরামে মিলিয়েছে ৭ বল আর ৫ উইকেট হাতে রেখে। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে আসা মুশফিকুর রহিমও বললেন, লিটনের ক্যাচ হাতছাড়ার বড় মূল্যই দিতে হয়েছে তাঁদের, ‘লিটন আমাদের অন্যতম সেরা ফিল্ডার। ওদের দুই ব্যাটার খুব ভালো ব্যাটিং করছিল। আমাদের একটা ব্রেক থ্রু দরকার ছিল…আমরা সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি!’
অথচ শারজার এই ম্যাচটা মুশফিকেরই হওয়ার কথা ছিল। গত কিছুদিনে ‘রান পাচ্ছেন না, রান পাচ্ছেন না’ শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত মুশি ছন্দে ফিরতে বেছে নিয়েছেন ‘প্রিয় প্রতিপক্ষ’ শ্রীলঙ্কাকেই। শারজার উইকেট সাধারণত রানপ্রসবা হয় না, এটাই ধারণা ছিল। স্পিনাররা ভালো সহায়তা পেতে পারেন ভেবে পেসার তাসকিন আহমেদকে বসিয়ে একাদশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদকে। কিন্তু শারজার গতকালকের উইকেটের চরিত্র কিছুটা ভিন্নই দেখা গেল। ভালো উইকেটে মোহাম্মদ নাঈমকে নিয়ে মুশফিক তৃতীয় উইকেটে গড়লেন ৫১ বলে ৭৩ রানের জুটি। নাঈম পেয়েছেন টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় ফিফটি।
ফিফটির সুযোগ হাতছাড়া করেননি মুশফিকও। ৩২ বলে করেছেন ফিফটি। উদ্ভাবনী সব শটে খেলে অভ্যস্ত মুশফিক বাউন্ডারি মেরেছেন ৫টি। ইনিংসের দুটি ছক্কা এসেছে প্রিয় ‘স্লগ সুইপে’। ৩৭ বলে অপরাজিত ছিলেন ৫৭ রানে। ৩৭ বলের মাত্র দুটি রক্ষণাত্মক শট, বাকি ৩৫ বলেই আক্রমণাত্মক শট খেলে শারজার গ্যালারিতে উপস্থিত বাংলাদেশি দর্শকদের বিনোদিত করেছেন, দলের স্কোরটাও নিয়ে গেছেন ১৭০ রানের ওপরে। শেষ ২৪ বলে বাংলাদেশ যে ৪২ রান তুলেছে, অর্ধেকই এসেছে মুশির ব্যাট থেকে।
শ্রীলঙ্কাকে পেলেই তাঁর ব্যাট কথা বলবে—গত পাঁচ-ছয় বছরে এটিই যেন নিয়ম বানিয়ে ফেলেছেন মুশফিক! টি-টোয়েন্টিতে যেখানে তাঁর গড় ২০.৩৮ আর স্ট্রাইকরেট ১১৬.২০, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তা ৪২.২৮ আর ১৪৯.৪৯। লঙ্কানদের বিপক্ষে গতকালও দুর্দান্ত ইনিংস এল মুশফিকের কাছ থেকে—অথচ ফিল্ডিংয়ের ভুলে পরে শেষ পর্যন্ত সেটা বৃথাই গেল! সংবাদ সম্মেলনে বিষণ্ন মনে বলা মুশফিকের কথাটাই বলতে হচ্ছে, ‘ভালো খেলে হারলে সেই ভালো খেলার কোনো অর্থ নেই!’
বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৭১/৪
শ্রীলঙ্কা: ১৮.৫ ওভারে ১৭২/৫
ফল: শ্রীলঙ্কা ৫ উইকেটে জয়ী









