এই সময়ে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে অনেক উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা দেশের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। অর্থনীতি, রাজনীতির নানা বিষয় পরিষ্কার করা, অনেক প্রচারকে প্রশ্নের মধ্যে নিয়ে আসা সর্বজনের দিক থেকে জরুরি কাজ।
বর্তমানে বাংলাদেশে যা কিছু ঘটছে তার সঙ্গে বৈশ্বিক জোট-সম্পর্কিত। এ দেশে যা কিছু ঘটে তার সুবিধাভোগী যেমন দেশের মধ্যে, তেমনি দেশের বাইরেও আছে। বৈশ্বিক জোটের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জেপি মর্গান বা গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতো ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠান, যারা মূলত বহুজাতিক পুঁজির ব্যবস্থাপনা, তাদের স্বার্থ দেখার জন্য বিভিন্ন স্থানে কাজ করে। নীতি প্রভাবিত করা তো বটেই, তথ্যবিকৃতিও তারা করে থাকে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদের বর্তমান চেহারা খেয়াল করলে বোঝা যায়, বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকের পাশাপাশি মিডিয়া—সবগুলো একটার সঙ্গে অন্যটা যুক্ত। কারণ মিডিয়ায় কোনটা ফোকাস হবে, কোনটাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, সেগুলো আসলে নিয়ন্ত্রিত হয় এসব বহুজাতিক কোম্পানি এবং সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ও অ্যাজেন্ডা থেকে। সুতরাং সিএনএন, বিবিসি, এএফপি, রয়টার্সের রিপোর্ট—সবই এই ছাঁকনির ওপর নির্ভর করে।
এখন আমরা ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের খবর টেলিভিশনে দেখি, ইউক্রেনে আক্রান্ত মানুষের রিপোর্ট টেলিভিশনে আসে, ইউক্রেনে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এসব খবর আসে, যা খুব দরকারি। কিন্তু মিডিয়ার এই ভূমিকা যদি সব সময় থাকত, আমরা যদি ইরাক আক্রমণের সময় মার্কিনদের বর্বরতার খবর মিডিয়ায় পেতাম, এভাবে যদি আফগানিস্তানের খবর আমরা জানতাম, ইয়েমেনে সৌদি আরব যখন আক্রমণ করছে, সেটা জানতাম, তাহলে পৃথিবীতে যুদ্ধের পরিবেশই থাকত না। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে মিডিয়া উল্টোটা করেছে, কারণ তাদের স্বার্থ ছিল আগ্রাসীর পক্ষে। লাখ লাখ মানুষ নিহত হলেও তাদের খবরে তা গুরুত্ব পায়নি।
মিডিয়া কোনটাকে ফোকাস করবে, কোন দেশকে সামনে আনবে, কোন দেশের অর্থনীতিকে তারা সংকটগ্রস্ত বলবে, কোন দেশের অর্থনীতি বিকাশমান বলবে—এসবের সঙ্গে আসলে বহুজাতিক পুঁজির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটা সম্পর্ক থাকে। এসব হলো খুবই সংগঠিত ব্যাপার। এসব কোনো মিডিয়ার সাংবাদিকের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের লাইনের বাইরে গেলে বড় বড় সাংবাদিকের চাকরি চলেও যায়।
উন্নয়ন ও দুর্ভিক্ষের বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও কিন্তু তা না-ও হতে পারে। উন্নয়ন কীভাবে হচ্ছে, সেটা বোঝার বিষয়, তার ওপরই নির্ভর করে পরিণতি কী হবে। উন্নয়নের শ্রেণি ভিত্তি আছে, সেটাকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উন্নয়ন ও দুর্ভিক্ষ একই সঙ্গে আসতে পারে। বাংলাদেশে দুটি বড় দুর্ভিক্ষ হয়—একটা ১৯৪৩ এবং অন্যটি ১৯৭৪ সালে। স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে ১৯৭৪ সালে যে দুর্ভিক্ষ হয়, সেটা কারও কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। সে সময় একটা বন্যা হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ করে দেয়। অনেকে জানেন কিউবার সঙ্গে শুধু একটা আলোচনা হয়েছিল, সেখানে পাট রপ্তানি করা হবে, সে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে গমের চালান আসত, সেটা বন্ধ করে দেওয়া হলো। সেই সময়ে দুর্ভিক্ষ হয়। পরে অমর্ত্য সেন যে গবেষণা করেছেন এবং আমরা যেসব তথ্য পাই, তাতে দেখা যায়, ১৯৪৩ ও ৭৪ সালের কোনো বছরেই খাদ্য উৎপাদনে কোনো ঘাটতি ছিল না। ওই দুই বছরে বরং অন্য বছরগুলোর তুলনায় বেশি খাদ্য উৎপাদন হয়েছিল। তাহলে খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে চিন্তা করলে সে সময় দুর্ভিক্ষ হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। তাহলে দুর্ভিক্ষ কেন হলো? কারণ, সে সময় খাদ্য সরবরাহের চেইনে সমস্যা ছিল, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছিল না। তখন হঠাৎ করে খাদ্যের দাম অসম্ভব রকম বেড়ে যায়। সে সময় দুধ, লবণ কেনার জন্য লাইন বেড়ে গিয়েছিল। সেটার জন্য কিন্তু উৎপাদনের ঘাটতির কোনো ব্যাপার ছিল না। এটার সঙ্গে যারা খাদ্যশস্য গুদামজাত করেছে, সেখানে সরকারের লোকজন ছিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ছিল। এ অবস্থায় সরকারি হিসাবে ৬৭ হাজার এবং বেসরকারি হিসাবে প্রায় ১০ লাখ লোক মারা গিয়েছিল।
এত দিন পরে সারা পৃথিবীতে এখন যা অবস্থা তাতে ১৯৪৩ ও ৭৪ সালের মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা এমনিতেই কমে গেছে। কারণ, যোগাযোগব্যবস্থা আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। তাই যোগাযোগের কারণে সে রকম বিপর্যয় হওয়ার কথা না। তাহলে হঠাৎ করে কেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম দুর্ভিক্ষের কথাটি তুললেন? তাঁর আগে কিন্তু কেউ দুর্ভিক্ষের কথাটি বলেনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কেন এ কথাটি বললেন বা এতে কী রাজনীতি আছে, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
আমাদের জনসংখ্যা ও উৎপাদনের দিকটা দেখি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। সেই সময় আমাদের খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল এক কোটি টনের মতো।
এখন বাংলাদেশে জনসংখ্যা আদমশুমারি অনুযায়ী ১৬ কোটি। যদি আদমশুমারি নিয়ে সন্দেহ থাকে তাহলেও ১৭-১৮ কোটি জনসংখ্যা হয়। সে হিসাবে জনসংখ্যা ১৯৭২ সালের তুলনায় দুই গুণের বেশি বেড়েছে। কিন্তু এখন খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি টন গম ও ধান মিলিয়ে। মানে প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাহাত্তর সালের তুলনায় মাথাপিছু খাদ্যের প্রাপ্যতা বেশি বেড়েছে। সে হিসাবে সবার তো বেশি বেশি খাবার খাওয়ার কথা। তাহলে ঘটনা কী হলো? খাদ্যপ্রাপ্যতা বাড়ল, উৎপাদন বাড়ল। তাহলে এখানে ম্যালথাসের থিওরি সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হলো। তাঁর তত্ত্ব মতে, খাদ্যশস্য যে পরিমাণে বাড়বে, তার তুলনায় জনসংখ্যা বেশি বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশে উল্টোটা হয়েছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার চেয়ে খাদ্য উৎপাদন বেশি বেড়েছে। কিন্তু সরকারি তথ্যমতেই, এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির কালে মানুষের মাথাপিছু ক্যালরি ও পুষ্টির পরিমাণ কমেছে। কেন? খবরে আরও দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় খাবার কিনতে পারছে না, ফলে তাদের কখনো না কখনো অনাহারে থাকতে হচ্ছে।
তারপরও ১৯৭৪ সালের মতো দুর্ভিক্ষ হওয়ার কোনো আশঙ্কা আমি দেখি না। কিন্তু পরিস্থিতি যা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আমরা অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখব দেশে অনাহারী মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কারণ, মানুষ খাদ্য কিনতে পারছে না, মানে ক্রয়ের ক্ষমতা নেই। শাকসবজি-তেল-চাল থেকে সবকিছু কোথাও না কোথাও আছে, মাঝেমধ্যে কোনো কোনো জিনিসপত্রের কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেসব কোথাও না কোথাও মজুত আছে। কিন্তু তা ক্রয়ের ক্ষমতা মানুষের নেই, মানে তার প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এটা মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে। সহজে একটা হিসাব করেন, গার্মেন্টসে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা। কিন্তু আরও বহু কারখানা আছে যেখানে আরও কম টাকায় কাজ করানো হয়। বহু কারখানা আছে, যেখানে কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এখন গার্মেন্টসের যদি ৮ হাজার টাকা ধরি তাহলে এক বছর আগে এই টাকায় যা কেনা যেত, সেটা এখন কোনোভাবেই সম্ভব না। তার মানে আগে ৫ হাজার টাকায় যা কেনা যেত, এখন সেটা কিনতে ৮ হাজার টাকা লাগবে। মানে ৮ হাজার টাকার আয় ৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। দ্রব্যমূল্য ও অন্যান্য জিনিসের দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষের মধ্যে এই চাপটা তৈরি হয়েছে। অনেক মানুষ খাদ্যের জোগান করতে গিয়ে চিকিৎসা এবং ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশে এখন যে উন্নয়নের ধরন তার শ্রেণি ভিত্তি খুব স্পষ্ট, কিন্তু রাজনীতিতে শ্রেণির বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ শ্রেণির রাজনীতি এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমরা যেটাকে সমস্যা হিসেবে দেখছি যেমন, দুর্নীতি, সম্পদ পাচার—এসব তো একটা শ্রেণির উত্থান, সংহত হওয়ার, তাদের রাজনীতি ও আধিপত্যের প্রকাশ। এখন তাকে মোকাবিলা করার জন্য শ্রেণির রাজনীতি লাগবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা থেকে আমরা অনেক দূরে চলে গেছি। বৈশ্বিক দুষ্ট জোট, দেশের ভেতর লুটেরা নির্যাতক গোষ্ঠী মোকাবিলায় শ্রেণির রাজনীতি সামনে নিয়ে আসা খুব জরুরি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ










