Ajker Patrika

জ্বালানির পর খাদ্য নিয়ে শঙ্কা

অরুণ কর্মকার
আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২২, ১০: ১০
জ্বালানির পর খাদ্য নিয়ে শঙ্কা

সরকারি গুদামে ইতিমধ্যে প্রায় ২০ লাখ টন খাদ্যশস্যের মজুত গড়ে তোলা হয়েছে। রাশিয়া থেকে কেনা ৫ লাখ টন গমের ১ লাখ টন ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। আমদানির পাইপলাইনে আরও খাদ্যশস্য রয়েছে। তারপরও দুশ্চিন্তা রয়েছে প্রয়োজন অনুযায়ী গম আমদানি নিয়ে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক মাস ধরেই বলে আসছেন এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় যুব দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি আবারও বলেছেন খাদ্যসংকট তথা দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা। এর পরদিন জাতীয় সংসদেও খাদ্য ব্যবস্থাপনাসহ সংকটের আশঙ্কার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশে জ্বালানির সংকট অব্যাহত রয়েছে। রপ্তানিমুখী টেক্সটাইল, গার্মেন্টসসহ সব ধরনের শিল্প জ্বালানির সংকটে জর্জরিত। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয় কমেছে বলে খবর বেরিয়েছে।

অক্টোবরের খবরও ভিন্নতর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। খুব শিগগির এই সংকট কাটছে না। কারণ, বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। আর দেশে বৈদেশিক মুদ্রার টানাটানি থাকায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না।

চলমান এই জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে আগামী বছরের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে—যে বিষয়ে বারবার বলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছর পৃথিবীর অনেক দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেবে। দেখা দিতে পারে দুর্ভিক্ষও। এর বড় কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধরত ওই দুটি দেশ থেকে পৃথিবীর মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ গম এবং বিপুল পরিমাণ ভুট্টা ও ভোজ্যতেল রপ্তানিতে দীর্ঘ মেয়াদে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।

জাতিসংঘের উদ্যোগে ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্য রপ্তানির যে চুক্তি রাশিয়া করেছে, তাতে দেখা গেছে, ইউক্রেন থেকে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য রপ্তানি হয়েছে তার মাত্র ৫ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছেছে। বাকি ৯৫ শতাংশই ইউরোপ তাদের ভান্ডারে পুরেছে। এই অভিযোগ তুলে রাশিয়া চুক্তিটি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছিল। অবশ্য দেশটি আবার সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। কিন্তু ওই অঞ্চল থেকে শস্য রপ্তানির অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।

সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের আরেকটি কারণ দেশে দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা খাদ্য জাতীয়তাবাদ। সংকটের আশঙ্কায় প্রতিটি দেশ তাদের নিজ নিজ খাদ্যশস্য রপ্তানির ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যেই বিধিনিষেধ আরোপ করছে। আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই মুহূর্তে তাদের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে চিনি রপ্তানির ওপর। একইভাবে কখনো চাল, পেঁয়াজ, কখনোবা গম রপ্তানিতে তারা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে থাকে নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তার প্রয়োজনেই। পৃথিবীর আরও অনেক দেশ এখন নিজেদের রপ্তানি পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। ফলে অর্থ থাকলেও সব সময় বিশ্ববাজারে খাদ্য না-ও মিলতে পারে। এ ছাড়া একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতি।

এসব কারণে আগামী বছর আমাদের দেশেও খাদ্যঘাটতি যেমন থাকতে পারে, তেমনি খাদ্যের দামও হতে পারে অনেক বেশি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে গমের সরবরাহ কম থাকবে। দামও হবে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ বছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের তারতম্য আমাদের আমন চাষ কিছুটা হলেও ব্যাহত করেছে। অবশ্য কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বিলের মধ্যেও আবাদ হওয়ায় আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে। এর চূড়ান্ত হিসাব মিলবে আরও কিছুদিন পরে।

আমাদের দেশের প্রধান ফসল বোরো। দেশে উৎপাদিত মোট খাদ্যশস্যের অর্ধেকের বেশি আসে বোরো থেকে। এই ফসল একান্তভাবেই সেচনির্ভর। আর প্রায় ৯০ শতাংশ সেচযন্ত্র বিদ্যুৎ-চালিত।

তাই চলমান জ্বালানি সংকটের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে (না হওয়ার মতো কোনো কারণ এখন পর্যন্ত দেখা বা অনুমান করা যাচ্ছে না), বোরো ধানের উৎপাদনও ব্যাহত হবে।

আমাদের দেশটা আয়তনে ছোট। আবার জনসংখ্যা অনেক বেশি। ফলে খাদ্যসহ নিজেদের প্রয়োজনীয় সব কৃষিপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভর 
করতে হয়। কিন্তু বিশ্ববাজার যখন অস্থিতিশীল, প্রাপ্যতা নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা, তখন আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে খাদ্যঘাটতির শঙ্কা থেকেই যায়। আমরাও তার বাইরে নই।

অবশ্য সরকার এই সম্ভাব্য খাদ্যঘাটতির বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক দিন আগে থেকেই যে দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি চাষাবাদের আওতায় এনে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়ে আসছেন, তা আগেই উল্লেখ করেছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয় মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি চালাচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ সম্ভাব্য সব উৎস থেকে খাদ্য আমদানির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

সরকারি গুদামে ইতিমধ্যে প্রায় ২০ লাখ টন খাদ্যশস্যের মজুত গড়ে তোলা হয়েছে। রাশিয়া থেকে কেনা ৫ লাখ টন গমের ১ লাখ টন ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। আমদানির পাইপলাইনে আরও খাদ্যশস্য রয়েছে। তারপরও দুশ্চিন্তা রয়েছে প্রয়োজন অনুযায়ী গম আমদানি নিয়ে। বিশ্ববাজারে গমের প্রাপ্যতা ও দাম সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রার দামও। অথচ যেকোনো সামগ্রী আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অপরিহার্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক হিসাব থেকে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় চার মাসে দেশে খাদ্যশস্য (চাল, গম ও ডাল) আমদানি গত সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম হয়েছে। এই সময়ে আমদানি কমেছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ।

এর কারণ মূলত বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং তার অনিবার্য অভিঘাত হিসেবে টাকার মান কমে যাওয়া। এই সংকটের কারণে ব্যবসায়ীদের ঋণপত্র (এলসি) খুলতে নানা হয়রানি ও বিলম্ব হচ্ছে। অনেক ছোট ছোট আমদানিকারক খাদ্য আমদানি থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে খাদ্য আমদানি কমেছে। আমদানি কমার অর্থ হলো খাদ্যশস্যের স্বাভাবিক সরবরাহ ও বাজারে তার প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং মূল্যবৃদ্ধি। এই প্রবণতাগুলো এখনো যে একেবারে দৃশ্যমান নয়, তেমন নয়।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশ করেছে তাদের ‘ফুড সিকিউরিটি সিচুয়েশন, মে ২০২২’। তাতে বলা হয়েছে, প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্যস্বল্পতার সম্মুখীন। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘গ্লোবাল মার্কেটস আউটলুক রিপোর্ট’-এ বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রার মান অব্যাহতভাবে কমতে থাকায় খাদ্য ও জ্বালানির দাম তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে বা যাচ্ছে। প্রতিবেদনের এসব কথা আমাদের জীবনে ইতিমধ্যে বাস্তব হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভাব্য সংকটে আমাদের রক্ষাকবচ হতে পারে। পাশাপাশি খাদ্যশস্যের মজুতদারি, সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর মতো অসাধু কর্মকাণ্ডও কঠোর নজরদারিতে রাখা এবং তা বন্ধ করা জরুরি।

লেখক: অরুণ কর্মকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নতুন শত্রু খুঁজছে ইসরায়েল, তালিকার শীর্ষে পাকিস্তান-তুরস্ক

পুলিশ সদস্যকে তেলের পাম্পে জরিমানা, জেলা পুলিশের বিবৃতি

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিনিময়ে ২০ বিলিয়ন ডলার নগদ পাচ্ছে ইরান

হরমুজ প্রণালি ‘পুরোপুরি উন্মুক্ত’ ঘোষণা করল ইরান

শিশুর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে দুই ভাইকে পিটিয়ে হত্যা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত