Ajker Patrika

দেশটা কি ঠিক পথে হাঁটছে?

অর্ণব সান্যাল
আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২২, ১০: ৩৮
দেশটা কি ঠিক পথে হাঁটছে?

শিরোনামের প্রশ্ন শুনেই কোনো পক্ষে ফেলে দেবেন না দয়া করে। অনুযোগ করতেই পারেন, উন্নতি কি চোখে পড়ে না? ‘কানা’ বলতেও পারেন চাইলে। কারণ এ দেশে সহমতের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে ভিন্নমতে গেলেই এসব গঞ্জনা সইতে হয়। সোচ্চারে এগিয়ে যাওয়ার স্লোগানের মধ্যে অন্য সুর ধরলেই অনেকে তাই ‘বেসুরো’ আখ্যা দিয়ে বসে। কিন্তু সুর-অসুরের ‘মান’ সংজ্ঞা কে দেবে আসলে?

অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে তাতে বলতে হয়, যেকোনো কিছুর বিষয়ে ‘শেষ কথা’ বলবে শুধু শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা পক্ষই। সংখ্যাগরিষ্ঠতাই এ দেশে একমাত্র ‘সঠিক’ বলে প্রমাণিত হয়ে আছে অনেক দিন ধরে। সেটা যেমন ভোটের ময়দানে, তেমনি মতামতের ‘ধুয়ো’ তোলার ক্ষেত্রেও। হঠাৎ একটি ইস্যুতে ‘গেল গেল’ রব ওঠে এ দেশে।

যা যাওয়ার, তা যে আগেই গেছে—সেটি স্বীকারের বদলে, আমরা এখন ‘যাচ্ছে’ ভেবেই সময়টা কাটাই। সেই সমস্বর রবে যদি গলা না মেলানো যায়, তখনই আবার সংখ্যালঘু হয়ে যেতে হয়। আগে মাঠ-ময়দান ছিল এমন ধারার সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের ক্ষেত্র। এখন সেই কাজের অনেকটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয় এবং বিপজ্জনকভাবেই হয়।

সম্প্রতি একটি শিশুর ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে বেশ আলোড়ন উঠেছে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এক সুপরিচিত ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা করতে চায় না সে—ভিডিওটিতে তেমনটাই দেখা ও শোনা যায়। ভিডিওতে একজন সাংবাদিককে বুম ধরে রাখতে দেখা যায়, ভিডিওতে আছে একটি খেলাবিষয়ক ওয়েব নিউজ পোর্টালের লোগোও। যদিও সেই পোর্টালের ফেসবুক পেজে এই ‘নির্দিষ্ট’ ভিডিও ফুটেজটি পাওয়া যায়নি। তবে ওই একই প্রতিবেদকের ওই একই জায়গায় নেওয়া শিশুটির ভিডিও সাক্ষাৎকার রয়েছে। সংবাদ দেখা বা শোনা এবং এ নিয়ে কাজ করা—উভয় পক্ষের যে কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজটিও ওই পোর্টালেরই করা। হয়তো ছড়িয়েছে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক উপায়ে। তবে যেভাবেই ছড়াক, তাতে ওই সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটি একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুকে ভিক্টিমাইজড করার দায় থেকে রক্ষা পেতে পারে না। ভিক্টিমাইজড কীভাবে করা হচ্ছে তা বুঝতে, যাঁরা ভিডিওটি শেয়ার করছেন, তাঁদের নানাবিধ মন্তব্য পড়লেই হবে। কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠনও এই ভিডিও শেয়ার করছে ইচ্ছাকৃতভাবে। গুগলে একটু বুঝেশুনে সার্চ করলেই পাওয়া যাবে সব।  

এই ভিডিওটি যাঁরা শেয়ার করছেন দেদার, তাঁরা ‘গেল গেল’ রব তুলেছেন। বলছেন, ‘কী সব্বোনাশ! শিশুরাও সাম্প্রদায়িক হয়ে যাচ্ছে। দেশটা রসাতলে গেল…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এই প্রথম বুঝি এমনটা শোনা বা দেখা গেল। ‘গেল গেল’ অবস্থাটি যে দীর্ঘদিনে তৈরি এবং এর এমন প্রভাবও যে অনেক দিনের—প্রকারান্তরে আমরা এ সত্যটাই এড়িয়ে যাচ্ছি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, গত শতকের নব্বইয়ের দশকে যেমন আমি স্কুলে পড়ার সময় এমন বক্তব্য সহপাঠীদের কাছ থেকে পেয়েছি, একইভাবে পেয়েছি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়—এমনকি পেশাজীবনেও। কারও কারও আফসোস দেখলে বোধ হয়, হুট করেই বুঝি সমাজটা এমন হয়ে গেছে! কিন্তু চোখ বন্ধ রাখলেই তো আর প্রলয় বন্ধ থাকে না।

সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো, এ সমাজের বড়রা এখন একটি শিশুর ওপর দায় চাপাচ্ছেন! ওই শিশুটির যে বয়স, তাতে তাকে যা শেখানো হবে তা-ই সে বলবে, বিবেচনাবোধ তার পোক্ত হয়নি যে। অর্থাৎ, সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটি আসলে সমাজের গভীরে, পারিবারিক শিক্ষার গহিনে। আর সেসব প্রভাবক তো এক দিনে এই রূপ পরিগ্রহ করেনি। তাতে এ দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির ও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থারও যোগ আছে। কিন্তু সমস্যার মূলে হাত না দিয়ে, একটি শিশুকে ভিক্টিমাইজড করে কী হবে? নাকি ওতেই দায় সারতে চান আমাদের দেশের তথাকথিত ইস্যুভিত্তিক জনগণ? সংবাদমাধ্যমেরও কি তবে শুধু এক আকাশ ভিউ পেলেই পেশাগত দায়দায়িত্ব ভুলে যেতে হবে?

এই অঞ্চলে এমনতর ইস্যু নতুন কিছু নয়। এই তো কিছুদিন আগেই পাওয়া গেল কপালের টিপ ও পোশাক নিয়ে হেনস্তার খবর। তাতেও আবার ভেদাভেদ আছে। আছে সংস্কৃতি নিয়ে ক্যাচাল, ধর্মীয় বাতাবরণ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু দিন শেষে কোনো পক্ষই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়ে একমত হয় না। এই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কারও কাছে বেলেল্লাপনা, কারও কাছে বেঁচে থাকার শর্ত। আসল কথা হলো, ব্যক্তিস্বাধীনতা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। এর জন্য কাউকেই কাঠগড়ায় তোলা বা দুটো গালি দেওয়া যায় না।

অন্যেরটা দেখে নিজের পছন্দ না হলে চুপ করে থাকাই শ্রেয়। অথবা রাগ উঠলে মনে মনে গজগজ করতেই পারেন। কিন্তু প্রকাশ্যে কটু কথা বলার অধিকার কারোরই নেই। কিন্তু যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতাই পুরোপুরি পাখা মেলতে পারে না, সেখানে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ঘরে ঘরে জন্মাবে—এমনটা আশা করা বাতুলতা মাত্র।

ফলে মোহনায় এসে মিলে যাওয়ার বিষয়ে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতেই তৎপর। এটা প্রগতি বা অগ্রগতি—দুই ক্ষেত্রেই আছে প্রকটভাবে। কারণ আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চাই। অন্যকে জোর করে হলেও নিজের পথে আনতে চাই। জবরদস্তিতে যে মন পাওয়া যায় না, তা বাংলা সিনেমায় নায়ক-নায়িকা ও খলনায়কের মাধ্যমে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তবে টিভিতে পাওয়া সেই শিক্ষা আমরা মনে স্থান দিই না কখনো। ফলে বারবার ন্যায়-অন্যায় ভুলে সর্বত্র কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষের প্রাধান্য বিস্তারের খেলা চলে এবং তার বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দৃশ্যমান। এতে বিভক্তি উজ্জ্বল হওয়া ছাড়া আর কিছু হয় না।

বিভক্তি বাড়ানোয় লাভ অবশ্যই থাকে। সেই লাভ রাজনৈতিক হয়, অর্থনৈতিকও হয়। বিভক্তি সৃষ্টি করে অন্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তারের এই ঐতিহ্য আমাদের অনেক দিনের। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে। এটি আমাদের সমাজে দিনকে দিন আরও পোক্ত হচ্ছে। কারণ এ দেশে কোনো সরকারই সব মত ও পথের নাগরিকদের এক ছাতার তলায় আনার প্রকৃত চেষ্টা করেনি। এমনকি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, নাগরিক সমাজ বা সংস্কৃতি অঙ্গনই-বা কতটুকু করেছে? বরং কখনো দাঁড়িপাল্লার এক পাশে ভার বেশি হয়েছে, কখনো অন্য পাশে।

ফলে দাঁড়িপাল্লার কাঁটা কখনো ভারসাম্যে স্থিত হয়নি। অরাজনৈতিক সরকার রাজনীতিকে চাপে রাখতে চেয়েছে, এমনকি তার না-ফেরা নিশ্চিত করারও চেষ্টা চালিয়েছে। এর বিপরীতে রাজনৈতিক সরকার আবার বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষকে কোণঠাসা করতে চায়। তবে এই শতাব্দীর শুরু থেকে সেই ‘কোণঠাসা’ শব্দটি রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিকভাবে ‘নিকেশ’-এ পরিণত হয়েছে। কেউ এই নিকেশ করায় যতি চিহ্ন টানতে চাননি। ফলে তা এখন হামলা-মামলায় চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে।

এতে করে একটি মতকে গায়ের জোরে সবার মত বানানোর চেষ্টাই চল হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তা ক্ষমতাকাঠামো থেকে ধীরে ধীরে সমাজের সর্বত্র বিস্তার লাভ করছে। কারণ সমাজের মানুষেরা মনে করছে, যেহেতু নীতিনির্ধারকেরাই এ পদ্ধতিতে চলছেন, সুতরাং এমনটা করাই যায়। এতে আর ভিন্নমতকে নিকেশ করায় যে কোনো পদক্ষেপ নিতে নৈতিক বাধা থাকছে না।      

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি বা রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের এই ‘ঘুঁটা’ দেওয়া নতুন কিছু নয়। ভারতে নরেন্দ্র মোদির সরকার দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি মদদে তা করে আসছে। পাকিস্তানেও হয়। এ দেশেও হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উপায়ে, নানা সময়ে। এর মাধ্যমে মূলত জনগণে বিভক্তি প্রকট করা হয়। আর সেই ফাঁকে পোক্ত হয় ক্ষমতার ভিত। লাগাতার কিছু সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে ভাবনার বিষয়, এ দেশে সেই একই প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে ‘ভিলেজ পলিটিকস’-এও পাকা আসন নিয়ে নিচ্ছে। ফলে বিভক্তি পৌঁছে যাচ্ছে সমাজের তৃণমূলে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া বন্ধে কার্যকর ও সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সচেতন বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নিচ্ছে না। গলার জোর পাওয়া যাচ্ছে শুধু জাকারবার্গের দুনিয়াতেই।

সুতরাং ভিন্ন মতকে বিনা নোটিশে অন্তরীণ করার বিষয়টি আটকানোর জন্য এ দেশের ওপরতলা থেকে সংস্কার প্রয়োজন। নিজের চিন্তা ও বিবেক পরিষ্কার না হলে অন্যকে শেখাব কীভাবে? তখন কয়েক বছরের শিশুটির মতো অন্যের ঘাড়েই দায় চাপাতে হবে। যদিও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ ও প্রাধান্য বিস্তারের এই ভয়ংকর খেলা থামানোর জন্য কোনো রেফারিই আর অবশিষ্ট নেই।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসেও তাই প্রশ্ন করতেই হচ্ছে, দেশটা কি তাহলে ঠিক পথে হাঁটছে?

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত