Ajker Patrika

মহিউদ্দিন আহমদ: সাহসী মানুষ

মানবর্দ্ধন পাল
আপডেট : ২২ জুন ২০২২, ১০: ৫১
মহিউদ্দিন আহমদ: সাহসী মানুষ

‘মহিউদ্দিন’—এ দেশে খুব কমন নাম। আপনার পরিচিত অনুজ-অগ্রজ ও সমবয়সী অনেককেই পাবেন, যাদের নাম মহিউদ্দিন। কমন নামের কোনো জৌলুশ নেই, চাকচিক্য নেই। কিন্তু মোস্ট-কমন নামও অনেক সময় গুণে-মানে-কৃতিতে-কীর্তিতে আনকমন হয়ে যায়! এমন একজন কমন নামের মানুষ অথচ ব্যক্তিত্ব ও চারিত্র্যগুণে আনকমন মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব, কূটনীতিক, রাষ্ট্রদূত, কলাম লেখক এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন সাহসী মানুষ। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নামটি জড়িত। বলা যায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি স্বর্ণোজ্জ্বল পৃষ্ঠা। অনেক সুধীজনের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্মৃতিচারণে তাঁর কীতির কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মহান মানুষটি ২০ জুন (২০২২) সোমবার মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলো।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় নিতান্ত কাকতালীয়ভাবে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার।

আগের দিন বিকেলে বিশ্রামের অলস সময়ে অজানা নম্বর থেকে একটি কল পাই। ওপাশ থেকে একটি ভরাট কণ্ঠ ভেসে আসে। প্রমিত উচ্চারণে তিনি আদাব দিয়ে জানতে চান আমি মানবর্দ্ধন পাল কি না! আমি সম্মতি জানাই। ওপাশ থেকে তিনি বলেন, ‘আমি মহিউদ্দিন আহমদ, অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও রাষ্ট্রদূত।’ আমাকে নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত করতে তিনি জানান, আমার ফোন নম্বর তিনি কথাশিল্পী হরিশংকর জলদাসের কাছ থেকে নিয়েছেন এবং পরিচয়ও পেয়েছেন। আমার সাহচর্য ও সহযোগিতা পেলে তিনি অমর কথাশিল্পী অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মভিটা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান দেখতে আসবেন। পরদিন বৃহস্পতিবার আমার ওপর ভরসা করে কৈশোর থেকে বহু শ্রুত তিতাস এবং অদ্বৈতর জন্মস্থান দেখতে চলে এলেন। সঙ্গে তাঁর অবসর গ্রহণ করা এক অধ্যাপক বন্ধু নাসিরুল হক। বেলা ১১টায় বাসে তাঁরা এলেন। কথামতো আমি পৈরতলা বাসস্টপেজে উপস্থিত ছিলাম। পরিচয় পর্বের শেষে গেলাম সার্কিট হাউসে। হাত-মুখ ধুয়েই তাঁরা উঠতে চাইলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া দর্শনে। মহিউদ্দিন আহমদের বয়স তখন ৭৩। ১৮ বছর ধরে পেনশনভোগী তিনি কিন্তু কথাবার্তায়, চলনে-বলনে ৭৩ বছরের তরুণ। পলিত কেশ কিন্তু ছিপছিপে গড়ন, উচ্চতায় মধ্যমাপের কিন্তু সুঠাম দেহ।

সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়লাম। অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মভিটা, গোকর্ণঘাট, কালভৈরব মন্দির, সাহিত্য একাডেমি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষাচত্বর, আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনসহ দর্শনীয় স্থাপনা তাঁদের ঘুরিয়ে দেখালাম। দেখা ও কথা হলো অনেক সংস্কৃতিকর্মীর সঙ্গে। তিনি অদ্বৈতর জন্মভিটায় জেলে নারী-পুরুষ-শিশুদের সঙ্গে মিশলেন, কথা বললেন এবং ছবি তুললেন পরম আন্তরিকতায়। জেলেপাড়ার একটি দরিদ্র মেয়ে সরকারি মহিলা কলেজে পড়ছে জেনে আনন্দিত হয়ে আমার কাছে মেয়েটির জন্য তিনি বেশ কিছু টাকা পাঠিয়েছিলেন। আমি তা কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষ মহোদয়ের সামনে ওকে পৌঁছে দিয়েছিলাম। তখন জেনেছি, তিনি তাঁর প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ভাতার সম্পূর্ণ অর্থ এভাবেই প্রতি মাসে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করেন।

মহিউদ্দিন আহমদ কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন না, প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও খ্যাতিমান। তিনি যুদ্ধ করেছেন মেধা, মনন ও মসি দিয়ে। তিনি তখন ছিলেন লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি। একাত্তরে দেশমাতৃকার চরম সংকটে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্যে মহিউদ্দিন আহমদ ছিলেন সংশপ্তকের মতো। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোভনীয় চাকরির মায়া তিনি ত্যাগ করেছিলেন। জীবন ও মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে পাকিস্তান সরকারের চাকরি থেকে পদত্যাগ করে আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের। মুক্তিযুদ্ধের প্রথমার্ধেই মানচিত্রখচিত লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়েছিলেন ইংল্যান্ডের হাইকমিশনে। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি তাঁর মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাফল্যের আরেক ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু সেদিন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে পৌঁছেছিলেন লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে। স্বাধীনতার পূর্ণতাদানকারী সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মহিউদ্দিন আহমদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ফুল দিয়ে বরণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালের সেই ইতিহাসে তাঁর নাম নিশ্চয়ই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেদিন তাঁকে নিয়ে সারা দিন একসঙ্গে কাটালাম, সন্ধ্যায় মহানগর গোধূলিতে তাঁকে বিদায় দিলাম। আমার জীবনে সোনালি স্মৃতিময় একটি দিন কাটল। তার পরের বছরও তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় স্থান দেখতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কুল্লাপাথর এসেছিলেন সস্ত্রীক। ফোনে আমন্ত্রণ পেয়ে সেদিনও এই শ্রদ্ধেয় দম্পতির সঙ্গে সারা দিন কাটিয়েছি। সেখানে সারিবদ্ধভাবে শায়িত আছেন ৫০ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। কসবার কুল্লাপাথরে এক চত্বরে বাঁধানো সেই অর্ধশত শহীদের কবরস্থান ও স্মৃতিসৌধ নতুন প্রজন্মের জন্য এক পবিত্র দর্শনীয় স্থান। মহিউদ্দিনের জন্মদিন ছিল ১৯ জুন (১৯৪৪)। আর তাঁর মৃত্যুর তারিখটি ২০ জুন (২০২২)। এবারও তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানিয়ে রোগমুক্তি কামনা করেছিলাম। কিন্তু পরের দিনই লিখতে হচ্ছে এই অশ্রুসিক্ত লেখা!

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক ও গ্রন্থকার

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত