মামুনুর রশীদ

নিরোদ সি চৌধুরী একবার বলেছিলেন, ছাত্রদের যদি জিজ্ঞেস করা হতো তোমরা কেন লেখাপড়া করছ? তখন একই উত্তর দিত সবাই। দেশের হয়ে কাজ করার জন্য। পাল্টা প্রশ্ন আসত, আচ্ছা, এ কথা না হয় বুঝলাম, যারা পড়ালেখা শেষে শিক্ষক হবে, তারা না হয় ছাত্রদের দেশপ্রেমের বাণী শেখাতে পারবে।
উকিল-মোক্তাররা রাজনীতি করে দেশ উদ্ধার করে দেন। কিন্তু একজন দোকানদার সে কীভাবে দেশের কাজ করবে? উত্তর এল, মাপে কম দেবে না, বেশি মুনাফা করবে না, খাবারে ভেজাল মেশাবে না, এসব করেও তো দেশের কাজ করা যায়; অর্থাৎ মোটকথা, ছোটবেলা থেকেই জীবনের একটা লক্ষ্য স্থির করে ফেলা। এই ছিল সেই সময়কার মানুষের লক্ষ্য উপার্জনের উপায়।
যখন ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হচ্ছে, তখন কবি শঙ্খ ঘোষ বলছেন পাঠ্যপুস্তকগুলো ঠিকমতো দেখা দরকার। সেখানে কী সব পড়ানো হচ্ছে। যার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হয়। এই যে লক্ষ্য ঠিক করা, এ বিষয়টা আমাদের দেশে ষাটের দশকে একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবারই লক্ষ্য ছিল লেখাপড়া শিখে দেশকে উদ্ধার করতে হবে; বিশেষ করে পাকিস্তানিদের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। ওই সময় চীন, রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে, বাকি দেশগুলোতে যেখানে মানুষ মুক্তির জন্য লড়াই করছে, সেখানেও তারা এগিয়ে আসছে। আর তখন চীন রাশিয়া থেকে প্রচুর পরিমাণে আদর্শভিত্তিক বইপুস্তক এ দেশে সুলভ মূল্যে পাওয়া যেত। চিরায়ত রুশ সাহিত্যভান্ডার তখন বাংলাদেশের তরুণদের হাতের মুঠোয়। সে সময় নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ উপন্যাসের পাবেল চরিত্র সবার কাছে আদর্শ। সবাই পাবেল হতে চাইত; অর্থাৎ একটা মানুষের জন্য মানুষ—এ তত্ত্বটি কেমন করে অবলীলায় কিশোর বয়স থেকেই মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। ওই সময়কার রুশ উপন্যাসের একটা বড় প্রভাব পড়েছিল তরুণদের মধ্যে। যে কারণে তরুণেরা ভবিষ্যতের যেকোনো সংগ্রামে যুক্ত হতে চাইত।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিন পর্যন্ত এই ভাবনাগুলো কাজ করেছিল। কিন্তু সাতচল্লিশে দেশভাগের পর যে ধরনের হতাশা তরুণদের গ্রাস করল, তাতে নানান ধরনের বিকৃত রাজনৈতিক দলের উত্থান হলো। এর মধ্যেই সামরিক শাসন এসে ষাটের দশকের তরুণদের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল। বইপুস্তক ক্রমেই পাল্টে যেতে থাকল। সেই যে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর একাডেমি থাকল না। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কখনো কখনো রণক্ষেত্রে রূপ নিল। এই সময় সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা যুক্ত হলো, তারা নতুন করে একটা স্বপ্ন দেখল। সেই স্বপ্ন গণতন্ত্রের নতুন বিন্যাসে হারিয়ে যেতে থাকে। সংবিধানের নানান রকম কাটাছেঁড়া এবং পাঠ্যপুস্তকের নতুন বিষয়বস্তুর আবর্তে পড়ে প্রতিক্রিয়াশীল সম্পর্কে বেশি পরিশ্রম করতে হয় না।
শিক্ষাব্যবস্থাটাই নড়বড়ে হতে হতে গত ৩২ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল কোথাও আর সেই ইস্পাত পড়ার তরুণদের খুঁজে পাওয়া যায় না।
হেফাজতে ইসলামের উত্থান পর্বে কিছু মৌলবাদী বিদ্যা-ইচ্ছুককে দেখা যায়, যারা পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। সরকার আবার সবগুলো দাবিই মেনে নেয়। অভিযোগ আছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতৃত্বের মধ্যে এই আপসকামিতা রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যে শিশু-কিশোরেরা বলত লেখাপড়া হচ্ছে দেশের সেবা করার জন্য, সেই শিশুরা এখন কেমন? শিশুদের সব ধরনের সুকুমার চর্চাকে হত্যা করে ধর্মীয় শিক্ষার ওপর যে প্রবল জোর দেওয়া হচ্ছে, তাতে সে কখনোই বলবে না দেশের কাজ করার জন্য পড়ালেখা করছি। সেই শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করা যুবকটির মধ্যেও একই কথা—বাঁচতে হলে টাকা চাই, নিরাপত্তার অপর নাম টাকা, সুখের আরেক নাম হচ্ছে টাকা। অথচ সেই সব তরুণ কখনো টাকার কথা ভাবেননি।
টাকা একটু প্রয়োজন। নিরাপত্তার জন্য কিছু সঞ্চয় থাকতে পারে, কিন্তু না থাকলেও কোনো আক্ষেপ নেই। এখন রাজনীতির বড় বড় নেতা, আমলা, পেশাজীবী কেউ আর টাকাকে প্রয়োজনের বিষয় ভাবে না। টাকা উপার্জন করে (যেকোনোভাবে) সেই টাকা সঞ্চয় করতে হবে। কারও কারও কাছে দুর্দিনের জন্য, কারও কারও কাছে নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে বিপদে পড়েছে পাকিস্তানি কিছু ব্যবসায়ী। সুইস ব্যাংকের পাসওয়ার্ড কাজ করছে না।
বাংলাদেশেও পানামা পেপারস থেকে জানা গেল, দেশ থেকে প্রচুর টাকা পাচার হয়ে গেছে বিদেশে। অথচ পাসওয়ার্ডের অভাবে সেই টাকা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও বাংলাদেশ দুর্নীতিবাজ এবং টাকা পাচারকারীদের জন্য একটা অভয়ারণ্য। যত উন্নয়ন বাড়ে, তত দুর্নীতিও বাড়ে। এই প্রবণতা যে শুধু বাংলাদেশেই, তা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে। নিরাপত্তার জন্য এখন আর কেউ সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভাবে না, অর্থই যেন একমাত্র নিরাপত্তার বিষয়। এর সঙ্গেই জন্ম হয়েছে মানুষের লক্ষ্যহীন জীবনযাপন।
আমরা দেখেছি অতিদারিদ্র্যের জীবনযাপন করেও বহু মানুষকে সুখী। কারণ, তারা একটা লক্ষ্য নিয়ে জীবনযাপন করছে। প্রতিবেশীর দুঃখ-কষ্ট লাঘবে, গ্রামে শিক্ষাবিস্তারে কেউ বিপন্ন হলে তার পাশে দাঁড়ানো—এই সব কাজ করে তারা তৃপ্ত থাকত এবং জীবিকা থেকে যতটুকু অর্থ পাওয়া যায় তার বাইরে হুড়োহুড়ি করতে দেখা যেত না। এখন যার দুর্নীতি করার সুযোগ নেই, তারও সার্বক্ষণিক একটা চিন্তা কীভাবে কিছু টাকা কামানো যায়। যে পেশাগুলো শুধু সেবার জন্য নিয়োজিত ছিল, সেই পেশাগুলো এখন নিদারুণ পণ্যে পরিণত হয়েছে। যেমন চিকিৎসা। চিকিৎসা এখন আর সেবা নয়, একটি পণ্য। চারদিক থেকে তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে সবাই।
শিক্ষা এখন অদ্ভুতভাবে ব্যবসার মাঝে ডুবে গেছে। শিক্ষার্থীরা কিছু শিখছে না, কিন্তু শিক্ষকেরা কামিয়ে নিচ্ছেন প্রচুর অর্থ। একজন কোচিং শিক্ষকের বা একজন প্রাইমারি শিক্ষকের ঢাকা শহরে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি থাকবে—এটা কি আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগে কল্পনা করা সম্ভব ছিল? শিক্ষা-বাণিজ্যের ফলে সেসব এখন খুবই সম্ভব। কোটি কোটি টাকা সরকারি-বেসরকারি খাতে উড়ছে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা তো দূরের কথা, শিক্ষাই হচ্ছে না। কোচিং মাস্টাররা একটি বিষয় শুধু বোঝাচ্ছেন তা হলো, মুখস্থ কী করে করতে হয় এবং এই মুখস্থবিদ্যার লোকেরা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে চাকরিবাকরি করে আবার দুর্নীতির চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছে। কারণ তাদের কাছে শিক্ষার প্রকৃত আদর্শ পৌঁছায় না। প্রচুর বই কাঁধে নিয়ে রাতদিন তা মুখস্থ করে শিক্ষাটাকে অন্তরে না নিয়ে কোনোমতে গলাধঃকরণ করে ছেড়ে দিচ্ছে পরীক্ষার খাতায়। মানবিক গুণ ও আদর্শবিবর্জিত এই জীবনব্যবস্থাই তাদের বাকি জীবনের পাথেয়। পৃথিবীর সব দেশেই যারা শাসক তারা শিক্ষাব্যবস্থাটাকে প্রাণপণে ধরে রাখার চেষ্টা করে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে শাসকগোষ্ঠীর প্রশংসা করার কিছুই নেই। কিন্তু শিক্ষাকে সে ধরে রেখেছে। সেখানে দুর্নীতির কোনো স্থান নেই এবং শিশুকাল থেকে শিক্ষার শেষ দিন পর্যন্ত কোনো ধরনের দুর্নীতি সেখানে ঢুকতে পারে না। জাপান, কোরিয়ায়ও শিক্ষাকে ধরে রাখার একটা কঠোর ব্রত তারা পালন করে।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত সুপ্রাচীন, যদি আমরা সেই বৈদিক যুগ থেকে বিবেচনা করি। তারপর অনেক ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা এসেছে। সবচেয়ে আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা এসেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে। সেটা দিয়েই নানা ধরনের সংশোধন করে চলছিল। প্রতিবেশী দেশে সেগুলো রক্ষা করারও একটা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বইপুস্তকগুলোতে কিছু কীট ঢুকেছে। আর আমাদের এখানে বইপুস্তকগুলোতে কীটের দংশন প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবু সেই ছোটবেলা পাঠ করা কুসুম কুমারী দাশের একটি কবিতার দুই লাইন উল্লেখ করে লেখা শেষ করছি।
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’
মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব

নিরোদ সি চৌধুরী একবার বলেছিলেন, ছাত্রদের যদি জিজ্ঞেস করা হতো তোমরা কেন লেখাপড়া করছ? তখন একই উত্তর দিত সবাই। দেশের হয়ে কাজ করার জন্য। পাল্টা প্রশ্ন আসত, আচ্ছা, এ কথা না হয় বুঝলাম, যারা পড়ালেখা শেষে শিক্ষক হবে, তারা না হয় ছাত্রদের দেশপ্রেমের বাণী শেখাতে পারবে।
উকিল-মোক্তাররা রাজনীতি করে দেশ উদ্ধার করে দেন। কিন্তু একজন দোকানদার সে কীভাবে দেশের কাজ করবে? উত্তর এল, মাপে কম দেবে না, বেশি মুনাফা করবে না, খাবারে ভেজাল মেশাবে না, এসব করেও তো দেশের কাজ করা যায়; অর্থাৎ মোটকথা, ছোটবেলা থেকেই জীবনের একটা লক্ষ্য স্থির করে ফেলা। এই ছিল সেই সময়কার মানুষের লক্ষ্য উপার্জনের উপায়।
যখন ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হচ্ছে, তখন কবি শঙ্খ ঘোষ বলছেন পাঠ্যপুস্তকগুলো ঠিকমতো দেখা দরকার। সেখানে কী সব পড়ানো হচ্ছে। যার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হয়। এই যে লক্ষ্য ঠিক করা, এ বিষয়টা আমাদের দেশে ষাটের দশকে একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবারই লক্ষ্য ছিল লেখাপড়া শিখে দেশকে উদ্ধার করতে হবে; বিশেষ করে পাকিস্তানিদের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। ওই সময় চীন, রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে, বাকি দেশগুলোতে যেখানে মানুষ মুক্তির জন্য লড়াই করছে, সেখানেও তারা এগিয়ে আসছে। আর তখন চীন রাশিয়া থেকে প্রচুর পরিমাণে আদর্শভিত্তিক বইপুস্তক এ দেশে সুলভ মূল্যে পাওয়া যেত। চিরায়ত রুশ সাহিত্যভান্ডার তখন বাংলাদেশের তরুণদের হাতের মুঠোয়। সে সময় নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ উপন্যাসের পাবেল চরিত্র সবার কাছে আদর্শ। সবাই পাবেল হতে চাইত; অর্থাৎ একটা মানুষের জন্য মানুষ—এ তত্ত্বটি কেমন করে অবলীলায় কিশোর বয়স থেকেই মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। ওই সময়কার রুশ উপন্যাসের একটা বড় প্রভাব পড়েছিল তরুণদের মধ্যে। যে কারণে তরুণেরা ভবিষ্যতের যেকোনো সংগ্রামে যুক্ত হতে চাইত।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিন পর্যন্ত এই ভাবনাগুলো কাজ করেছিল। কিন্তু সাতচল্লিশে দেশভাগের পর যে ধরনের হতাশা তরুণদের গ্রাস করল, তাতে নানান ধরনের বিকৃত রাজনৈতিক দলের উত্থান হলো। এর মধ্যেই সামরিক শাসন এসে ষাটের দশকের তরুণদের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল। বইপুস্তক ক্রমেই পাল্টে যেতে থাকল। সেই যে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর একাডেমি থাকল না। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কখনো কখনো রণক্ষেত্রে রূপ নিল। এই সময় সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা যুক্ত হলো, তারা নতুন করে একটা স্বপ্ন দেখল। সেই স্বপ্ন গণতন্ত্রের নতুন বিন্যাসে হারিয়ে যেতে থাকে। সংবিধানের নানান রকম কাটাছেঁড়া এবং পাঠ্যপুস্তকের নতুন বিষয়বস্তুর আবর্তে পড়ে প্রতিক্রিয়াশীল সম্পর্কে বেশি পরিশ্রম করতে হয় না।
শিক্ষাব্যবস্থাটাই নড়বড়ে হতে হতে গত ৩২ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল কোথাও আর সেই ইস্পাত পড়ার তরুণদের খুঁজে পাওয়া যায় না।
হেফাজতে ইসলামের উত্থান পর্বে কিছু মৌলবাদী বিদ্যা-ইচ্ছুককে দেখা যায়, যারা পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। সরকার আবার সবগুলো দাবিই মেনে নেয়। অভিযোগ আছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতৃত্বের মধ্যে এই আপসকামিতা রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যে শিশু-কিশোরেরা বলত লেখাপড়া হচ্ছে দেশের সেবা করার জন্য, সেই শিশুরা এখন কেমন? শিশুদের সব ধরনের সুকুমার চর্চাকে হত্যা করে ধর্মীয় শিক্ষার ওপর যে প্রবল জোর দেওয়া হচ্ছে, তাতে সে কখনোই বলবে না দেশের কাজ করার জন্য পড়ালেখা করছি। সেই শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করা যুবকটির মধ্যেও একই কথা—বাঁচতে হলে টাকা চাই, নিরাপত্তার অপর নাম টাকা, সুখের আরেক নাম হচ্ছে টাকা। অথচ সেই সব তরুণ কখনো টাকার কথা ভাবেননি।
টাকা একটু প্রয়োজন। নিরাপত্তার জন্য কিছু সঞ্চয় থাকতে পারে, কিন্তু না থাকলেও কোনো আক্ষেপ নেই। এখন রাজনীতির বড় বড় নেতা, আমলা, পেশাজীবী কেউ আর টাকাকে প্রয়োজনের বিষয় ভাবে না। টাকা উপার্জন করে (যেকোনোভাবে) সেই টাকা সঞ্চয় করতে হবে। কারও কারও কাছে দুর্দিনের জন্য, কারও কারও কাছে নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে বিপদে পড়েছে পাকিস্তানি কিছু ব্যবসায়ী। সুইস ব্যাংকের পাসওয়ার্ড কাজ করছে না।
বাংলাদেশেও পানামা পেপারস থেকে জানা গেল, দেশ থেকে প্রচুর টাকা পাচার হয়ে গেছে বিদেশে। অথচ পাসওয়ার্ডের অভাবে সেই টাকা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও বাংলাদেশ দুর্নীতিবাজ এবং টাকা পাচারকারীদের জন্য একটা অভয়ারণ্য। যত উন্নয়ন বাড়ে, তত দুর্নীতিও বাড়ে। এই প্রবণতা যে শুধু বাংলাদেশেই, তা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে। নিরাপত্তার জন্য এখন আর কেউ সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভাবে না, অর্থই যেন একমাত্র নিরাপত্তার বিষয়। এর সঙ্গেই জন্ম হয়েছে মানুষের লক্ষ্যহীন জীবনযাপন।
আমরা দেখেছি অতিদারিদ্র্যের জীবনযাপন করেও বহু মানুষকে সুখী। কারণ, তারা একটা লক্ষ্য নিয়ে জীবনযাপন করছে। প্রতিবেশীর দুঃখ-কষ্ট লাঘবে, গ্রামে শিক্ষাবিস্তারে কেউ বিপন্ন হলে তার পাশে দাঁড়ানো—এই সব কাজ করে তারা তৃপ্ত থাকত এবং জীবিকা থেকে যতটুকু অর্থ পাওয়া যায় তার বাইরে হুড়োহুড়ি করতে দেখা যেত না। এখন যার দুর্নীতি করার সুযোগ নেই, তারও সার্বক্ষণিক একটা চিন্তা কীভাবে কিছু টাকা কামানো যায়। যে পেশাগুলো শুধু সেবার জন্য নিয়োজিত ছিল, সেই পেশাগুলো এখন নিদারুণ পণ্যে পরিণত হয়েছে। যেমন চিকিৎসা। চিকিৎসা এখন আর সেবা নয়, একটি পণ্য। চারদিক থেকে তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে সবাই।
শিক্ষা এখন অদ্ভুতভাবে ব্যবসার মাঝে ডুবে গেছে। শিক্ষার্থীরা কিছু শিখছে না, কিন্তু শিক্ষকেরা কামিয়ে নিচ্ছেন প্রচুর অর্থ। একজন কোচিং শিক্ষকের বা একজন প্রাইমারি শিক্ষকের ঢাকা শহরে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি থাকবে—এটা কি আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগে কল্পনা করা সম্ভব ছিল? শিক্ষা-বাণিজ্যের ফলে সেসব এখন খুবই সম্ভব। কোটি কোটি টাকা সরকারি-বেসরকারি খাতে উড়ছে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা তো দূরের কথা, শিক্ষাই হচ্ছে না। কোচিং মাস্টাররা একটি বিষয় শুধু বোঝাচ্ছেন তা হলো, মুখস্থ কী করে করতে হয় এবং এই মুখস্থবিদ্যার লোকেরা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে চাকরিবাকরি করে আবার দুর্নীতির চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছে। কারণ তাদের কাছে শিক্ষার প্রকৃত আদর্শ পৌঁছায় না। প্রচুর বই কাঁধে নিয়ে রাতদিন তা মুখস্থ করে শিক্ষাটাকে অন্তরে না নিয়ে কোনোমতে গলাধঃকরণ করে ছেড়ে দিচ্ছে পরীক্ষার খাতায়। মানবিক গুণ ও আদর্শবিবর্জিত এই জীবনব্যবস্থাই তাদের বাকি জীবনের পাথেয়। পৃথিবীর সব দেশেই যারা শাসক তারা শিক্ষাব্যবস্থাটাকে প্রাণপণে ধরে রাখার চেষ্টা করে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে শাসকগোষ্ঠীর প্রশংসা করার কিছুই নেই। কিন্তু শিক্ষাকে সে ধরে রেখেছে। সেখানে দুর্নীতির কোনো স্থান নেই এবং শিশুকাল থেকে শিক্ষার শেষ দিন পর্যন্ত কোনো ধরনের দুর্নীতি সেখানে ঢুকতে পারে না। জাপান, কোরিয়ায়ও শিক্ষাকে ধরে রাখার একটা কঠোর ব্রত তারা পালন করে।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত সুপ্রাচীন, যদি আমরা সেই বৈদিক যুগ থেকে বিবেচনা করি। তারপর অনেক ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা এসেছে। সবচেয়ে আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা এসেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে। সেটা দিয়েই নানা ধরনের সংশোধন করে চলছিল। প্রতিবেশী দেশে সেগুলো রক্ষা করারও একটা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বইপুস্তকগুলোতে কিছু কীট ঢুকেছে। আর আমাদের এখানে বইপুস্তকগুলোতে কীটের দংশন প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবু সেই ছোটবেলা পাঠ করা কুসুম কুমারী দাশের একটি কবিতার দুই লাইন উল্লেখ করে লেখা শেষ করছি।
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’
মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব

গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে সর্বশেষ (৫৪ তম) সাক্ষীর জেরা শুরু হয়েছে। এই মামলাটির বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ।
০৬ অক্টোবর ২০২৫
‘দুই দিন আগেই বাড়ি থেকে পাথরঘাটায় চলে এসেছি। এখন পুরোনো জাল সেলাই করছি। এক সপ্তাহের বাজারও করে এনেছি। আজ বিকেলে সাগর মোহনায় যাব, গভীর রাত থেকে জাল ফেলব।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদরের বাইনচটকী এলাকার জেলে হোসেন আলী। গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কথা হয় তাঁর...
১২ জুন ২০২৫
ভারতের স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞার পর সীমান্তে আটকে থাকা তৈরি পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকগুলো ফেরত আনছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে যেসব ট্রাক বন্দরে ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলো ভারতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ট্রাক ঢুকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
১৯ মে ২০২৫
আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটি হচ্ছে গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক রত্নসম্ভার। গতকাল বুধবার হংকংয়ে বিখ্যাত আর্ট নিলাম কোম্পানি সাদাবি’স-এর এক নিলামে এগুলো তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
০৮ মে ২০২৫