Ajker Patrika

আঁধার কেটে আলো আসুক

মন্টি বৈষ্ণব
আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ১১: ৫৪
আঁধার কেটে আলো আসুক

নরসিংদীতে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এক ভুক্তভোগী তরুণীকে আমগাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে ১০ নভেম্বর। এ ঘটনায় মামলা করা হয়। এতে মো. মজিবুর রহমান (৬০) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। এই ঘটনা শুধু নরসিংদীতে ঘটছে না। পত্রিকার পাতা ওলটালেই দেখা যায় সারা দেশে অহরহ ঘটছে এ ধরনের ঘটনা।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অক্টোবর মাসের নারী ও কন্যা নির্যাতনবিষয়ক তথ্যে জানা যায়, মোট ৩৭১ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছে অক্টোবর মাসে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬২ কন্যাসহ ৯১ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২১ জন। পারিবারিক সহিংসতায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪ জন।

এই প্রেক্ষাপটে ‘নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস উদ্‌যাপন কমিটি’ ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিবছর ২৫ নভেম্বরকে ‘নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস’ পালন করে আসছে। এবারের এ দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘বাতাস ছুটুক, তুফান উঠুক, দমব না, থামব না’।

এই দিবসের পেছনে রয়েছে এক করুণ ইতিহাস। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর ডোমিনিকা রিপাবলিকের স্বৈরাচারী সরকার বিরোধী মিরাবেল ভগিনী ত্রয়কে সেনাসদস্যরা ধর্ষণ ও হত্যা করে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকান ও ক্যারিবীয় নারী সম্মেলন এই হত্যাকাণ্ডকে স্মরণ করে ২৫ নভেম্বরকে ‘নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস’ ঘোষণা করে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী নারীর ওপর সহিংসতা বেড়েছে। বলা যায়, পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রব্যাপী নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে নারীরা। নারীরা নিজেদের নিরাপদ মনে করছে না পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে অথবা রাস্তাঘাটে। এক অজানা ভয় সঙ্গে হাঁটছে নারীদের। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর চলার পথে নারীদের ভয় বেশি কাজ করে। এ সময় নারীরা নিজেদের আপনজনের সঙ্গে থেকেও নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছে না। গত আগস্ট মাসের শুরুতে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পার থেকে ছিনতাই করা বাসের যাত্রীদের সর্বস্ব লুটের পর নারী যাত্রীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আবার গাজীপুরে একটি যাত্রীবাহী বাসে চলন্ত অবস্থায় এক নারী যাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। সেদিন ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্বামী। ধর্ষণের আগে বাস থেকে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হয় ভুক্তভোগীর স্বামীকে।

নারীর ওপর এই সহিংসতা কিন্তু কোনো ব্যক্তির একার আচরণ নয়। এর মূলে রয়েছে সমাজে নারীকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা। এ ছাড়া নারী নির্যাতন বা নিপীড়নের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে না।

বিচারহীনতা সংস্কৃতির কারণে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ছে। যার ফলে অপরাধীরা এই ধরনের অপরাধে উৎসাহিত হচ্ছে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা যে বা যারা করুক না কেন, এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। দোষীদের আনার দরকার আইনের আওতায়।

আশার আলো হলো, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আমাদের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। শত বাধা পেরিয়ে পর্বতের চূড়ায় উঠছেন, খেলার মাঠে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয়লাভ করছেন, খেতখামারে কাজ করছেন। আবার স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করছেন আমাদের নারীরা।

আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য প্রকট। নারীকে ঘরে আর বাইরে দ্বৈত সত্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। তাই নারীর লড়াইটা পুরুষের তুলনায় অনেক ভিন্ন। নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে সম-অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। সব অন্ধকার কেটে গিয়ে নারীদের জীবনে আসুক আলো। এমন এক সমাজকাঠামো আসুক, যেখানে নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না।

উল্লেখ্য, নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে জাতীয় মহিলা সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে (১৪৫ নিউ বেইলি রোড, ঢাকা) নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল নামে একটি লিগ্যাল এইড সেল রয়েছে। সেখানে সপ্তাহে দুই দিন চার সদস্যের একটি কমিটির মাধ্যমে নির্যাতিত দুস্থ অসহায় নারীদের বিনা খরচে আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুস্থ অসহায় নারীদের আইনগত সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার দুজন আইনজীবী তালিকাভুক্ত আছেন, যারা জাতীয় মহিলা সংস্থা দ্বারা মনোনীত। নারীদের সহযোগিতার জন্য তাঁরা প্রস্তুত।

লেখক: মন্টি বৈষ্ণব, সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত