ভোরের কাগজ অফিসে কাজ শুরু করেছিলাম ১৯৯৬ সালে। অমিতদা তখন নিউজরুমের বস। প্রথমে বসকে বস হিসেবেই দেখতে শুরু করলেও কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারি অমিতদা আসলে অন্য প্যাটার্নের বস। এই বস কাজের সময় কঠিন-কঠোর, কাজ ফুরালেই গল্পবাজ, ফুর্তিবাজ মানুষ।
বাংলামোটরে অবস্থিত সেই সময়ের ভোরের কাগজ অফিস ছিল একটা বাজারের মতো জায়গা। যারা না দেখেছেন, তাদের বলে বোঝানো যাবে না, সেটা কেমন ছিল। তখন সংবাদপত্র অফিসের এই করপোরেট চেহারা ছিল না। সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কও ছিল আত্মিক। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, ভোরের কাগজের সেই সময়কার কাজের পরিবেশ আর কখনো, কোথাও হয়নি এবং হবেও না।
অমিত হাবিব ছিলেন বার্তা সম্পাদক। অফিসে সারাক্ষণ চিৎকার, চেঁচামেচি, হইচই, ঝগড়াঝাঁটি চলছে এবং এর মধ্যে থেকেই কাজও চলছে। অমিতদার হাত ধরে কাজ শিখেছেন আজকের অনেক বড় বড় সাংবাদিক। অমিতদা ছিলেন দলনেতা। একটা দুর্বল লেখাকে কীভাবে ঘষেমেজে ঝকঝকে রূপ দিতে হয়, অমিতদা সেটাই জানতেন।
সাহিত্য, গান, খেলাধুলা—হেন কোনো বিষয় নেই; যা নিয়ে তিনি তর্ক করতে পছন্দ করতেন না। আসলে তর্ক করতে ভালোবাসতেন তিনি। আমার সঙ্গে তুমুল এক গোলযোগ বাধল এসব কিচ্ছু নিয়ে নয়, সান্ধ্যকালীন নাশতা খাওয়ার চাঁদা তোলা ও আইটেম নিয়ে। সেদিন সন্ধ্যায় মুসলিম কনফেকশনারি থেকে আনা হবে আমিত্তি আর বনরুটি। চাঁদা ধরা হলো প্রতিজন মনে হয় ৪-৫ টাকা। ব্যস অমিতদা শুরু করলেন তাঁর আজাইরা যুক্তি-তক্কো। যেমন কেন এত টাকা, কেন আমিত্তি-বনরুটি, কেন অন্যকিছু নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি রাগ হয়ে আয়োজক কমিটির পদ থেকে একধরনের পদত্যাগ করলাম। পরে দেখি এই নিয়ে অমিতদার হাসাহাসির শেষ নেই। তিনি নাকি টিপু ভাইয়ের সঙ্গে বাজি লেগেছিলেন আমাকে রাগাবেন। আমি বোকা বনে গিয়ে বললাম, ‘কোনো মানে হয় এইসব করার, অমিতদা উফ।’
১৯৯৬ সালেই ভোরের কাগজ থেকে আমরা মাইক্রোবাস ভাড়া করে রাঙামাটি গিয়েছিলাম। সেই টিমে ছিলাম আমি, আমার ৪ মাসের মেয়ে অনসূয়া, অমিতদা, অলক, উৎপল শুভ্র, পিন্টু, প্রভাস আর মুক্তি। ট্যুরে অমিতদা আর শুভ্র দিনে ১০ বার করে ঝগড়া করেছে। ফেরার পথে শনির আখড়া থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত ননস্টপ ঝগড়া। কিন্তু পরের দিন সকালে আবার দুজনের গলাগলি বন্ধুত্ব এবং বিকেলে চা খেতে গিয়ে পাঁচ টাকার চায়ের বিল নিয়ে ৩০ মিনিট ঝগড়া। কথাগুলো প্রভাস মনে করিয়ে দিল। এমনই ইন্টারেস্টিং মানুষ ছিলেন অমিতদা।
ভোরের কাগজ পরিবার অমিতদাকে মনে রাখবে চিরদিন। সুমনা শারমীন সুমি, মুন্নী সাহা, জ. ই. মামুন, প্রভাস, মাইনুল, শ্যামলদা, আমিনুর রশীদ, আনিসুল হক, পিন্টু, অলক, সুমন ভাই, টিপু ভাই, তৌহিদ, সুমন কায়সার, আদিত্য কবীর, রীতা, শিবব্রত, জাকারিয়া, শুভ্র পিনাকী, সাখাওয়াৎ লিটন, সানাউল্লাহ লাবলু ভাই, নবনীতা চৌধুরীসহ এ রকম বহুজনের সময় কেটেছে অমিতদার সান্নিধ্যে। আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে ভোরের কাগজের বাংলামোটর অফিসের পুরো নিউজরুমটা দেখতে পাই।
সেই নিউজরুমে সবার মাথার ওপরে ছিলেন মঞ্জু ভাই। নিউজ বা নিউজের বাইরেও মঞ্জু ভাইয়ের সঙ্গেও যুক্তিতর্ক, গল্প লেগেই থাকত অমিতদার। অমিতদার ভাষার ওপর দখল, এডিটিং এবং রি-রাইটিং দক্ষতা ও সেন্স ছিল অসাধারণ। সব বিষয়ের ওপর দখল আছে—এমন এডিটর বা নিউজ এডিটর এখন কয়জন আছেন, আমি জানি না।
অমিত হাবিব ফিরে যাচ্ছেন ঝিনাইদহের মহেশপুরে। আশির দশকের প্রথমে ঢাকায় এসেছিলেন। এতগুলো বছর এই নগরে বসবাস করেও হয়তো এই নগরের বাসিন্দা তিনি হতে পারেননি। এই নগরে থেকেও আমাদের কাছে ‘নাগরিক না হওয়ার’ একটি গল্প দিয়ে শেষ করছি লেখাটা। একদিন অমিতদা খুব স্মার্টলি সাজগোজ করে অফিসে এলেন। চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। তাই দেখে কেউ একজন জিজ্ঞাসা করল, অমিতদা, ‘কি এত সাইজা চুলে তেল দিয়ে আসছেন আজকে?’ ব্যস, অমিতদার মেজাজ খারাপ। বিষম বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠা আপনাদের স্মার্ট বয় জাকারিয়া চুলে তেল মাখলেও আপনারা বলেন জেল মাখছে, আর আমি ঝিনেদা থেকে আসছি বলে জেল মাখলেও ভাবেন তেল মাখছি।’ এই জাতীয় অভিযোগ শুনে আমরা হেসে হেসে গড়িয়ে পড়তাম।
অমিতদাই আমাদের বলত, আপনারা নোটবুক দেখে দেখে এইসব হ্যাপি বার্থডে কালচার বাদ দেন। মনে থাকলে হ্যাপি বার্থডে জানাবেন, নইলে নয়। মানুষকে পছন্দ না হলেও হেসে হেসে কুশলাদি বিনিময় করাকে বা পকেটে টাকা নেই, তা-ও কাউকে বার্গার এনে খাওয়ানো ও পরে আফসোস করাকে ওনার মনে হতো ‘নাগরিক কপটতা।’
অমিতদা বলতেন, ‘এইসব নাগরিক কপটতা ছাড়েন, আরামে থাকতে পারবেন।’ আজ স্বীকার করতে লজ্জা নেই অমিতদা, আমরা অনেকেই এই নাগরিক কপটতা নিয়েই বেঁচে আছি। আর আপনি আজ সবকিছুর বাইরে চলে গেলেন।
শাহানা হুদা রঞ্জনা, সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন










