বর্তমান সমাজে মানব পাচার একটি ভয়াবহ সমস্যা। প্রলোভন দেখিয়ে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে কৌশলে অথবা জোর করে দেশের ভেতরে বা বাইরে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে শিশু, নারী বা পুরুষদের স্থানান্তর করাকে মানব পাচার বলে। মানব পাচারকারীরা চাকরি বা উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারী, শিশু বা পুরুষদের বিভিন্ন রকম প্রলোভন দেখিয়ে অথবা ফুসলিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যায়। এরপর তারা তাদের পতিতা, রক্ষিতা, যৌনদাসী বানায় কিংবা পর্নোগ্রাফি তৈরি ও উটের জকি বানানোর কাজে ব্যবহার করে। এ ছাড়াও তারা এসব নিরীহ মানুষের অঙ্গহানি করে ভিক্ষাবৃত্তি করতে বাধ্য করে এবং মাদক, চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করে।
মানব পাচার একটি জঘন্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যেসব অপরাধ সামাজিক শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, ইসলাম সেগুলোর ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করেছে এবং অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বিধান প্রতিষ্ঠা করেছে। মানব পাচারের এ ঘৃণ্য অপরাধ অতীতেও ছিল এবং বর্তমানেও আছে; তবে পাচারের কৌশল ও ধরন সময়ের বিবর্তনে ভিন্নতা পেয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মানব পাচারের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হজরত ইউসুফ (আ.) শিশুকালে তাঁর বাবা হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর খুবই আদরের সন্তান ছিলেন। ফলে তাঁর বৈমাত্রেয় ১০ ভাই তাঁকে বাবার কাছ থেকে অপহরণ এবং হত্যা অথবা পাচার করার সিদ্ধান্ত নেন। সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, (তারা বলল) ‘তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর অথবা তাকে কোনো দেশে পাচার কর, তাহলে তোমাদের বাবার আনুকূল্য কেবল তোমাদের জন্য থাকবে।’ তাঁদের মধ্য থেকে একজন বললেন, ‘তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর না, আর যদি কিছু করই, তাহলে তাকে কোনো কূপের গভীরে ফেলে দাও; যাত্রীদলের কেউ তাকে তুলে নিয়ে যাবে।’ (সুরা ইউসুফ:৯-১০)
উল্লিখিত আয়াত দুটিতে দুটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। একটি হলো, প্রতিশোধের আগুন নেভানোর জন্য কাউকে হত্যা করা অথবা তাকে এমন স্থানে পাচার করা, যার ঠিকানা কেউ বলতে পারবে না। দ্বিতীয়টি হলো, হত্যা না করে গুম করা, যাতে অন্য কোনো সম্প্রদায় তাকে পেয়ে যায় এবং ব্যবহার করতে পারে। ইসলাম উভয় অপকর্মকেই নিষিদ্ধ করেছে। কারণ, এতে মানুষের অধিকার হরণ করা হয় এবং অন্যায়ভাবে তার ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
মানব পাচারের বিভিন্ন কারণ থাকলেও এর মধ্যে অন্যতম হলো, মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ও আল্লাহভীতির অভাব। একজন মানুষ যখন নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে, আখিরাতে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে—এমন বিশ্বাস ভুলে যায় এবং যখন তার চক্ষুলজ্জা থাকে না তখন সে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। কারণ, নৈতিক অবক্ষয়প্রাপ্ত জাতি সমাজের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করে বেশি। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যখন তোমার লজ্জা চলে যাবে, তখন তুমি যা ইচ্ছা করতে পারবে।’ (বুখারি)
ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির যাবতীয় বিধান নৈতিকতার মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষ ধর্মীয় অনুশাসন অমান্য করে যখন স্বেচ্ছাচারিতায় নিমজ্জিত হয় তখন তারা দানবে পরিণত হয়। এমতাবস্থায় ভ্রাতৃত্ব, মানবতা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি লোপ পায়। তখন সমাজের গরিব, দুঃখী ও নিঃস্ব মানুষেরা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পাচারকারী প্রতারক চক্র কাউকে পাচারের সহযোগী বানায় আবার কাউকে পাচার করে। তাই পাচার প্রতিকারে ইসলামি নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র কোরআন-সুন্নাহর অনুশীলনের মাধ্যমে নৈতিক অবক্ষয় রোধ করে মানব পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব। মানব পাচার বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। মহানবী (সা.) বলেন, ‘মানব পাচারের চেয়ে বিশ্বাসঘাতকতা আর নেই যে তুমি এমন ব্যক্তির সঙ্গে মিথ্যার আশ্রয় নেবে, যে তোমাকে বিশ্বাস করে।’ (আবু দাউদ)
মানব পাচার একপ্রকার ধোঁকা ও প্রতারণা। ইসলামে প্রতারণা ও ধোঁকা চিরতরে নিষিদ্ধ। তাই মানব পাচারও একটি নিষিদ্ধ ও গর্হিত কাজ। মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়। জেনে রাখো, ধোঁকাবাজ ও প্রতারক জাহান্নামি।’ (মিশকাত) পাচারকারীরা ইহকাল ও পরকালে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। বাংলাদেশ সরকার মানব পাচার রোধ এবং পাচারকারীদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথম মানব পাচার প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করে। এ আইনের ৭ ধারা অনুসারে সংঘবদ্ধ মানব পাচার অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কমপক্ষে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই আইন ইসলামের বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। পাচার করা নির্যাতিত জনতার ক্ষমা ছাড়া পরকালে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না। বরং তাদের সামনেই পাচারকারীরা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
পাচারের জাঁতাকলে পড়ে যেসব নারী-পুরুষ ও শিশু অত্যাচারিত হয়েছে, তাদের জীবন ও সম্মান রক্ষায় আত্মনিয়োগ করা প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না? অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা বলছে—হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের বের করুন এ জনপদ থেকে, যার অধিবাসীরা অত্যাচারী এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন; আর নির্ধারণ করুন আপনার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী।’ (সুরা নিসা/ ৭৫)
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এসব নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইবাদত সমতুল্য। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাবার দাও, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা কর এবং বন্দীকে মুক্ত কর।’ (বুখারি)। মহানবী (সা.) নারী ও শিশুদের স্নেহ করতেন। তিনি স্ত্রী বা সন্তানদের কখনো প্রহার করেননি। অথচ তাঁর উম্মত হয়ে একটি গোষ্ঠী মানব পাচারের মতো নিকৃষ্ট কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। মানব পাচারের সঙ্গে যারা বিভিন্নভাবে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া সময়ের দাবি।
ড. এ. এন. এম. মাসউদুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়










