Ajker Patrika

দুর্নীতি সহ্য করা যাচ্ছে না

রহমান মৃধা
দুর্নীতি  সহ্য করা যাচ্ছে না

বাঙালি জাতির অতীত কেমন ছিল, শতভাগ বলতে পারব না। তবে তারা অতিথিপরায়ণ ছিল বলা যেতে পারে, তা না হলে ব্রিটিশদের জায়গা দিত বলে মনে হয় না। সময়ের সঙ্গে বাঙালি জাতি হারাতে শুরু করে ব্যক্তিত্ব, সঙ্গে নৈতিকতা। পরে ব্রিটিশের চামচা হয়ে যায়। ব্রিটিশরা চলে গেলেও চামচামি রয়ে গেছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘তেল’ মারার প্রবণতা আর সৃষ্টি করতে শিখেছে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, যা আজ জাতির স্বভাবে পরিণত হয়েছে।

উদাহরণ দিই। পথে কারও সঙ্গে কথা-কাটাকাটি বা ঝগড়া লেগেছে, আমরা কী বলি? ‘আমারে চেনোস আমি কে? আমার চৌদ্দপুরুষ কী করে?...’ ইত্যাদি। এখনো একজন চাষির ছেলের সঙ্গে যদি কোনো সচিবের মেয়ের প্রেম বা পরে বিয়ে হয়, বাংলাদেশ নিশ্চয়ই সেটা গিনেস রেকর্ড বুকে তুলে ধরতে চেষ্টা করবে! অথচ সুইডেনের রাজকন্যার বিয়ে হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত ফিটনেস ট্রেনারের সঙ্গে।

জাতির জন্য যাঁরা রাষ্ট্রের সেবা দেবেন বলে কর্মে ঢুকেছেন, তাঁরাই জাতিকে বাড়ির চাকর বানিয়ে শাসন-শোষণ করে দেশ পরিচালনা করছেন। আবার যে জনগণের ভোটে মন্ত্রী, এমপি হন, সেই জনগণকেই তাঁরা মানুষ বলে মনে করেন না। যাঁরা সম্মানিত হতে সাহায্য করলেন, তাঁদেরই তাঁরা অসম্মান করেন। এই মানসিকতা যত দিন জাতির মন থেকে বিলীন না হবে, তত দিন বাংলাদেশকে সোনার বাংলা করা সম্ভব হবে না।

দেশের দুটো জিনিস আমাকে কষ্ট দেয়—একটা রাজনীতি, অন্যটি দুর্নীতি। দুঃখের বিষয়, সব সেক্টরের মানুষ দুর্নীতির সঙ্গে কম-বেশি জড়িত থাকলেও যাঁরা বেশি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাঁরা সবাই রাজনীতি করেন। ব্যাপারটা এখন এমন—রাজনীতি করা মানে দুর্নীতি করা আর দুর্নীতি করা মানেই রাজনীতি করা। আমার এই অপ্রিয় সত্য কথাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে রাজনীতিবিদেরা খেপে যাবেন।

আমাকে গালিগালাজ করবেন, কিন্তু আমি সেটা নিয়ে চিন্তিত নই। কারণ পুরো লেখা পড়ার পর যদি ন্যূনতম জ্ঞান তাঁদের মগজে থাকে, তখন বুঝবেন কেন আমি এত বড় একটি মন্তব্য করেছি। তবে ঢালাওভাবে সব রাজনীতিবিদের কথা বলছি না। বলছি, যাঁরা দুর্নীতি করেন, তাঁদের কথা।

যদি বলি দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের অবদান সবচেয়ে বেশি? এ কথা তাঁরা মেনে নেবেন না। কারণ তাঁরা মনে করেন, তাঁদের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র! কিন্তু না, সেটা সঠিক নয়। বহির্বিশ্ব থেকে সরকার যে ঋণ সরকার করে, সেটা দিয়ে যে পরিমাণ উন্নতি হওয়ার কথা, সেটা হয়নি। তবে ঋণের পরিমাণ প্রতিটি নাগরিকের ঘাড়ে চেপে বসেছে।

মূলত আমরা যাঁরা দেশের বাইরে আছি আমাদের রেমিট্যান্স, দেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন গার্মেন্টস সেক্টর, দেশের মেহনতি মানুষ এবং জাতিসংঘ মিশনে নিযুক্ত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অর্জিত অর্থের ওপর দেশ চলমান। রাষ্ট্রের যেমন জবাবদিহি নেই, ঠিক তেমনি নেই কোনো গ্রহণযোগ্য ‘সোর্স অব ইনকাম’। তবে আমরা যারা দেশের বাইরে বিদেশি মুদ্রা কামাই করে দেশ গড়তে, দেশে নিজ নিজ পরিবারকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে চলছি, মূলত তাদের কারণে দেশ আজ সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। সে ক্ষেত্রে সরকারের কৃতিত্ব নেওয়ার কোনো কারণ নেই।

যেহেতু আমরা প্রকৃতপক্ষে দেশের অবকাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছি, সেহেতু আমরা দাবি করতেই পারি, জনগণের কাছে অতিসত্বর দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদেরা যেন আত্মসমর্পণ করেন। যথেষ্ট হয়েছে, দুর্নীতি আর সহ্য করা যাচ্ছে না।

লেখক:  রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত