Ajker Patrika

ইসলামে স্বাধীনতার তাৎপর্য

ড. মো. আবদুল কাদির
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২২, ১০: ২৩
ইসলামে স্বাধীনতার তাৎপর্য

আল্লাহ তাআলা মানুষকে জাগতিক জীবনে যত নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো স্বাধীনতা। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষই জন্মগতভাবে স্বাধীন। আমিরুল মোমেনিন হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব বলেন, ‘পৃথিবীর বুকে মানুষকে তুমি ক্রীতদাসে পরিণত করেছ, অথচ তার মা তাকে স্বাধীন মানুষরূপেই জন্ম দিয়েছেন।’ স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এটিই ইসলামের মূলনীতি।

মানুষ মহান সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারও দাস নয়। প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার অধিকার ইসলামে স্বীকৃত। কোনো অবস্থাতেই মানুষের এ জন্মগত অধিকার ক্ষুণ্ন করার অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। স্বীকৃত সব মানবিক অধিকার ও মর্যাদা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-পুরুষ-নারীনির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি সমানভাবে প্রযোজ্য। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘হে লোক সকল, জেনে রেখো, তোমাদের সকলের পালনকর্তা একজন। আর তোমাদের পিতাও একজন। জেনে রেখো, অনারবের ওপর আরবের আর আরবের ওপর অনারবের এবং কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের আর শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই—তাকওয়ার মানদণ্ড ব্যতীত। সকল মুসলমান একে অপরের ভাই।’

মহান আল্লাহ সব মানুষকে সমান মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাই ধর্ম-বর্ণ-অঞ্চল- ভাষা বা অন্য কোনো কারণে কোনো জনগোষ্ঠীকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা অথবা শোষণ করার এখতিয়ার কারও নেই। জুলুম, বঞ্চনা আর শোষণ থেকে আত্মরক্ষা করা এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় ও সচেষ্ট হওয়া মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ কাজকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা অত্যাচারিত হলে প্রতিরোধ করে (তারাই মুমিন)।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৯)

দেশের সব নাগরিকের কাছে তার মাতৃভূমি আমানতস্বরূপ। জীবন দিয়ে হলেও মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং দেশের সীমান্ত-চৌহদ্দি শত্রুর হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা মুমিনের অন্যতম ইমানি দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্বারোহী বাহিনী প্রস্তুত রাখবে। তা দিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখবে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬০)

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা কাজ করে, তাদের মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়ে মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় এক দিন সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত থাকা দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছু অপেক্ষা উত্তম।’ (বুখারি, হাদিস: ২৮৯২)

এ কারণেই মহানবী (সা.) মাতৃভূমির ভালোবাসাকে ইমানের অঙ্গ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এই ভালোবাসা শুধু মহানবী (সা.)-এরই সুন্নত নয়, মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এরও সুন্নত। তিনি তাঁর মাতৃভূমি ও দেশের নিরাপত্তা কামনা করে আল্লাহর দরবারে বিশেষভাবে দোয়া করেছেন এভাবে, ‘হে আমার প্রতিপালক, এই ভূখণ্ডকে তুমি নিরাপদ শহরে পরিণত করো এবং এর অধিবাসীদের নানাবিধ ফলমূল দ্বারা জীবিকা দান করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬)

মহানবী (সা.) মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষাকারী এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের শাহাদতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি ধর্ম রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজের প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৪২১)

স্বাধীনতা আল্লাহর অনন্য নেয়ামত। তাই স্বাধীনতা অর্জনের পর আমাদের দায়িত্ব হলো, তা অক্ষুণ্ন রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করা। আর স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে প্রয়োজন সমাজে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনের মাধ্যমে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করা এবং ঘুষ, দুর্নীতি, হত্যা, লুণ্ঠনসহ সব গর্হিত ও অন্যায় কাজের চির অবসান ঘটানো। তা না হলে স্বাধীনতা বিপন্ন হতে বাধ্য। স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে স্বাধীনতার প্রতি সুবিচার করতে হবে। রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটিয়ে সব নাগরিকের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত