Ajker Patrika

আবুল হাসনাতের আত্মশক্তির গরিমা

সৌভিক রেজা
আবুল হাসনাতের আত্মশক্তির গরিমা

মানুষের আত্মশক্তির ঐশ্বর্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানিয়েছিলেন, ‘নিজের মধ্যে যখন ঐশ্বর্যকে উপলব্ধি করি না, তখনই মনে করি, ঐশ্বর্য পরের মধ্যেই আছে। কিন্তু যে দীনতাবশত ঐশ্বর্যকে নিজের মধ্যে পাই নাই, সেই দীনতাবশতই তাহাকে অন্যত্র পাইবার আশা নাই।’ আবুল হাসনাতের মধ্যে এই উপলব্ধিটি আমৃত্যু বহমান ছিল। যে কারণে অপরের কাছে নিজেকে ছোট করে, কোনো ধরনের আত্মগরিমায় তুষ্ট থাকতে চাননি তিনি।

কবিতা রচনা থেকে শুরু করে প্রবন্ধ কিংবা চিত্র সমালোচনা—সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় নিজেকে প্রকাশ করা সত্ত্বেও আবুল হাসনাত সম্পাদক হিসেবে ছিলেন সবার কাছে আদর্শ। দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য পাতা সম্পাদনা তাঁকে লেখক-পাঠকের ভালোবাসা ও সম্মানের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। পটুয়া কামরুল হাসান সে কারণেই লিখেছিলেন, ‘হাসনাত সংবাদের জন্য একটি রত্ন।’ উজ্জ্বল রত্ন হলেও নিজেকে সব সময় খ্যাতির আড়ালে রাখতে পছন্দ করতেন আবুল হাসনাত। এই যে নিজেকে আড়ালে রাখার সক্ষমতা, এটি তাঁর আত্মশক্তিরই একটি প্রকাশ।

আমাদের সাহিত্য-জগতে আবুল হাসনাত আর ‘সংবাদ-সাময়িকী’ যেন অভিন্ন একটি নাম। যেমন অভিন্ন ছিলেন দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতা আর আহসান হাবীব। ‘দেশ’ পত্রিকা আর সাগরময় ঘোষ কিংবা ‘সমকাল’ আর সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন সমার্থক। তেমনি সমার্থক ছিলেন আবুল হাসনাত আর সংবাদ-সাময়িকী। আবুল হাসনাত এ-সম্পর্কে লিখেছেন, ‘স্বাধীনতা-উত্তরকালে ১৯৭৪ সালের জুলাই মাসে আমাকে যখন “সংবাদ” সম্পাদক আহমদুল কবির “সংবাদ সাময়িকী”র দায়িত্ব গ্রহণ করতে বললেন, আমি অনুভব করেছিলাম এ দায়িত্বের বিশালত্ব কত না বৃহৎ।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘আমি সে সময়ে ভেবেছি, যে করেই হোক সংবাদ সাময়িকীর একটি চরিত্র নির্মাণ করব ও উচ্চতায় নিয়ে যাব।’

সম্পাদক হিসেবে আবুল হাসনাতের কৃতিত্বের কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর একটি স্মৃতিচারণামূলক লেখায় জানিয়েছেন, ‘আবুল হাসনাত দীর্ঘদিন “সংবাদ”-এর সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করে “সংবাদ”-এর সাহিত্য সাময়িকীকে একটি বিশেষ উচ্চতায় দাঁড় করিয়েছেন।...অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে সম্পাদনা করতে পারতেন, যা ছিল আমাদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।...প্রবীণ লেখকদের যেমন সম্মান দেখাতে জানতেন এবং তাঁদের লেখা প্রকাশ করতেন, তেমনি তরুণদেরও তিনি উৎসাহিত করতেন এবং নিয়মিত লেখা প্রকাশ করতেন।’ সেই সঙ্গে তিনি এটিও বলতে ভোলেননি যে ‘সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে গুণটা বেশি থাকা দরকার, সেটা হলো ভালো লেখা চেনার ক্ষমতা এবং লেখাটিকে সঠিকভাবে তুলে ধরা। আবুল হাসনাত ভালো লেখা সহজে চিনতে পারতেন। তাঁর সম্পাদনার মুনশিয়ানার কারণে ভালো লেখা পেতে সমস্যা হতো না।’

শম্ভু মিত্র অনেক দিন আগে লিখেছিলেন, ‘আজকে আমাদের চারপাশে যখন চেয়ে দেখি, দেখি প্রত্যেকটা মানুষের চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে, ভেঙে গেছে তাদের জীবনবোধের মাপদণ্ডটা। চরম একটা বিশৃঙ্খলা অবস্থায় এসে পড়েছি আমরা। বুঝি না আমরা কী চাই, কী চেয়ে এসেছি এত দিন, শুধু তা-ই নয়, আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে, আমরা কিছু জানছি না, কিছু বুঝছি না।’ (পৌষ, ১৩৫৪)

আজকের দিনেও এ কথাগুলো দারুণভাবেই সত্যি বলে প্রতিভাত হয়। এর শুরু ঠিক আজকে নয়, সেই ১৯৭২ থেকেই। যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, স্বাধীনতা নিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে থাকে। এ বিষয়ে আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি, বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন যে মহান পথ সৃষ্টি করেছিল মুক্তিযুদ্ধের, তা প্রত্যক্ষণ ও অংশগ্রহণ জীবনের এক উজ্জ্বল সম্পদ হয়ে আছে। এই মহান সংগ্রামের আমি যে এক অংশী ছিলাম, তা আমার কাছে পরম গৌরবের বিষয়।’ তারপরই বেদনাভারাক্রান্ত মনে তিনি জানিয়েছেন, ‘এ গর্বও ম্লান হয়ে যায় আজ যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধ সমাজে সিঁড়ি ভাঙার সোপান হয়ে ওঠে। বড় কষ্ট পাই তখন, বেদনায় হৃদয় চূর্ণ হয়।’

এটা শুধু আবুল হাসনাতের একার অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ বা পর্যালোচনা নয়; তাঁর সমকালীন মানুষগুলোর অনেকেই সেই সব কথার সঙ্গে আজ আন্তরিকভাবে একমত পোষণ করবেন।

ফরাসি লেখক জুল রেনার একবার বলেছিলেন, ‘জীবন তা-ই, যা আমাদের চরিত্র নির্মাণ করে। আমরাই তাকে সাজাই, যেভাবে শামুক সাজায় তার খোল।’ এই লেখাটির শুরুতেই আমরা আত্মশক্তির যেসব অঙ্গীকারের কথা বলতে চেয়েছি, তার একটা সামগ্রিক চেহারা আবুল হাসনাতের জীবনের বিচিত্র কর্মের মধ্যে আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। সেই সঙ্গে এটিও স্বীকার না-করে উপায় নেই যে সেই আত্মশক্তির নিবিড় প্রকাশ আজকের দিনে রীতিমতো দুর্লভ।

১৭ জুলাই আবুল হাসনাতের জন্মদিন। মানুষটির স্মৃতির প্রতি জানাই শ্রদ্ধা ও সালাম!

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত