ইসরাতের নতুন ঠিকানা অক্সফোর্ড
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ইসরাত জাহান সিদ্দিকী। এবার বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিচ্ছেন ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়বেন ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টে মাস্টার অব পাবলিক পলিসি (এমপিপি) প্রোগ্রামে। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আজকের পত্রিকার আনিসুল ইসলাম নাঈম।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেড়ে ওঠা ইসরাতের। মা, বাবা এবং ভাইকে নিয়ে ছোট পরিবার। সেই ছোট্ট পরিসরে তাঁর বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ছিল নানা রঙে ভরা। মা-বাবা দুজনেই মানবাধিকারকর্মী, কাজ করেন উন্নয়ন ক্ষেত্রেও। ছোট থেকেই তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের অধিকার, বঞ্চনা আর জীবনযাপনের নানা সমস্যার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই প্রবণতা ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলেছে নিজের ভাবনা ও আগ্রহে। শৈশবে তাঁদের বাড়িতে বসত গানের আসর। লোকগানের টানে বহু মানুষ আসত সেখানে। মানুষের কথা, তাদের জীবনসংগ্রাম আর সংস্কৃতির নানা রূপের সঙ্গে পরিচিত হয়েই বড় হয়েছেন তিনি। সেই পরিবেশ ইসরাতকে শিখিয়েছে, সমাজকে বুঝতে হলে মানুষের কাছাকাছি যেতে হয়।
আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন
ইসরাতের শিক্ষাজীবনের শুরু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্রিসেন্ট কিন্ডারগার্টেনে। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মডেল গার্লস হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। মা চাইতেন যে মেয়ে চিকিৎসক হবেন। কিন্তু ইসরাতের ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। টান ছিল আইনের প্রতি, স্বপ্ন দেখতেন আইনজীবী হওয়ার। সেই আগ্রহ থেকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগে ভর্তি হওয়া। পড়াশোনার পরিসরে আইনের নানা দিক জানার পাশাপাশি তাঁর সামনে খুলে যায় মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক বৈষম্যকে বোঝার নতুন পথ।
পড়াশোনার বাইরেও মানুষের পাশে
শুধু শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি ইসরাত। শিশু ও নারীর অধিকার নিয়ে ছোটবেলা থেকেই যুক্ত ছিলেন নানা উদ্যোগে। ন্যাশনাল চিলড্রেনস টাস্কফোর্সের জেলা কমিটির সভাপতি, উই ক্যান বাংলাদেশের চেঞ্জমেকার এবং স্টুডেন্ট চেঞ্জমেকার ফোরামের জেলা আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়েও সক্রিয় ছিলেন বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনে। সেমিনার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের। স্নাতক স্তরে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং স্নাতকোত্তরে গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। ইসরাতের মতে, পড়াশোনা, সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড ও কাজের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষা পেয়েছেন তিনি। মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে অংশ নিয়েছেন ‘গণহত্যা, ন্যায়বিচার ও দায়মুক্তির প্রশ্ন’ শীর্ষক তৃতীয় উইন্টার স্কুল, হিউম্যান রাইটস সামার স্কুল এবং বিয়ন্ড রিফিউজ সামার স্কুলে। এই পথচলায় এসেছে একাডেমিক সাফল্যও। ২০১৮ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের সময় ‘ম্যাগনা কাম লাউড’ সম্মাননা পান তিনি। ২০১৯ সালে সম্পন্ন করেন এলএলএম। পরে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
অক্সফোর্ডের এমপিপি প্রোগ্রাম
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ইচ্ছা অনেক দিন ধরে ছিল ইসরাতের। তাঁর বিশ্বাস, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং ভিন্ন চিন্তার মানুষের সঙ্গে শেখার সুযোগ নিজের পরিচিত ভাবনার জগৎ আরও প্রসারিত করে। অক্সফোর্ডের মাস্টার অব পাবলিক পলিসি প্রোগ্রাম আকৃষ্ট করেছে জননীতিকে নানা দিক থেকে দেখার সুযোগের জন্য। এখানে আইন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে জননীতির প্রশ্নগুলো বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশা ও অভিজ্ঞতা থেকে আসা মানুষের সঙ্গে একই শ্রেণিকক্ষে শেখার সুযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর আগ্রহকে আরও স্পষ্ট করেছে। জেন্ডার জাস্টিস, নারীর ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এবং আইন ও নীতির কার্যকর প্রয়োগ—এই বিষয়গুলোতে আরও গভীরভাবে কাজ করতে চান তিনি। সেই লক্ষ্যে এমপিপি প্রোগ্রামে আবেদন বেছে নেন।
যেভাবে বৃত্তি-ভিসা
অক্সফোর্ডে যাওয়ার পথ অবশ্য মসৃণ ছিল না। আবেদন তৈরির সময় মেন্টর ও সুপারভাইজারদের সহযোগিতা পেয়েছেন ইসরাত। তাঁরা জীবনবৃত্তান্ত ও আবেদনের লিখিত অংশ পর্যালোচনা করেছেন, গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন এবং সুপারিশপত্র দিয়েছেন। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ অক্সফোর্ড থেকে আসে বহুপ্রতীক্ষিত অফার লেটার। সেই মুহূর্তের অনুভূতি বলতে গিয়ে তিনি জানান, সুযোগ পাওয়ার একটা বিশ্বাস মনে ছিল। কিন্তু নিজের ই-মেইলে অফারটি দেখার পরও তিনি কাঁপছিলেন। সেই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে ভর্তির সুযোগ পাওয়া মানে সব বাধা পেরিয়ে যাওয়া নয়। অক্সফোর্ডে পড়ার খরচ বহন করতে পূর্ণ বৃত্তির প্রয়োজন ছিল তাঁর। শেষ পর্যন্ত ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্ট তাঁকে জয়েন্ট জাপান/ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্র্যাজুয়েট স্কলারশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত করে। তারপর শুরু হয় বৃত্তির জন্য আলাদা আবেদন, নথিপত্র তৈরি এবং সুপারিশপত্র সংগ্রহের কাজ। ২০২৬ সালের ১ জুলাই আসে বৃত্তির সিদ্ধান্ত। এরপরও বাকি ছিল ভিসার অপেক্ষা। অবশেষে গত ২৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের ভিসা হাতে পান। ১২ অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু হয়েছে ইসরাতের।
বৃত্তিতে কী কী সুবিধা
ইসরাতের বৃত্তিতে টিউশন ফি সরাসরি পরিশোধ করা হবে। দৈনন্দিন খরচের জন্য রয়েছে মাসিক ভাতা। এ ছাড়া যাওয়া-আসার ইকোনমি ক্লাসের বিমানভাড়া, ভ্রমণ ভাতা এবং মৌলিক চিকিৎসাবিমার খরচও বৃত্তির আওতায় পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগও নির্ভর করবে ভিসার অনুমতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম এবং বৃত্তির শর্তের ওপর। এমপিপি প্রোগ্রামটি অত্যন্ত নিবিড় হওয়ায় পড়াশোনার বাইরে অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব না নেওয়ার পরামর্শ দেয় ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্ট।
নতুনদের জন্য কয়েকটি কথা
অক্সফোর্ডে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য ইসরাতের পরামর্শ, প্রথমে পছন্দের কোর্সের যোগ্যতা, আবেদনের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিতে হবে। আবেদনে শুধু দায়িত্বের তালিকা না দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা, কাজের প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। কেন নির্দিষ্ট কোর্সটি করতে চান এবং অর্জিত শিক্ষা ভবিষ্যতে কীভাবে কাজে লাগাবেন, তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। জীবনবৃত্তান্ত, প্রবন্ধ ও সুপারিশপত্র তৈরিতে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। পাশাপাশি বৃত্তির শর্ত, আবেদনের সময়সীমা এবং অর্থায়নের বিষয়ে আগেভাগে পরিকল্পনা করা দরকার।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
অক্সফোর্ডে পড়াশোনা ইসরাতের কাছে শুধু একটি আন্তর্জাতিক ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ নয়। এর মধ্যে রয়েছে নিজের কাজের পরিসর আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনাও। ভবিষ্যতে জেন্ডার জাস্টিস, নারীর ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন ও জননীতি নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। অক্সফোর্ড থেকে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কাজে লাগানো তাঁর লক্ষ্য।









