Ajker Patrika

খুলনার ৪৭৫ অপরাধীর তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে

  • বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য নিয়ে তালিকা তৈরি।
  • তালিকায় চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীসহ অপরাধীদের নাম।
  • ঈদের পর হতে পারে যৌথ অভিযানের ইঙ্গিত।
কাজী শামিম আহমেদ, খুলনা
খুলনার ৪৭৫ অপরাধীর তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে

খুলনা নগরে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদক কারবারে জড়িত ৪৭৫ জনের তালিকা তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। তালিকায় ২৮ চাঁদাবাজ, ৪৭ সন্ত্রাসী এবং প্রায় ৪০০ মাদক কারবারির নাম রয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পর তাদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু হবে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নতুন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশে সক্রিয় অপরাধীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে কেএমপি। পরে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

কয়েকটি ক্যাটাগরিতে এই তালিকা করা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদক বিক্রেতা, স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের নাম রয়েছে।

জানা গেছে, রাজনৈতিক ক্যাটাগরিতে মহানগর বিএনপির এক শীর্ষস্থানীয় নেতার নাম তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিপুল চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। শুধু সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেট থেকে প্রায় ২৭ কোটি টাকা আদায়ের তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ঘরানার এক আলোচিত ভূমিদস্যুর কাছ থেকেও পাঁচ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে ওই নেতার বিরুদ্ধে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের কয়েকটি বড় কাজেও তাঁর প্রভাব রয়েছে। বেনামে প্রায় ১০০ কোটি টাকার পাঁচটি কাজ বাগিয়ে নেওয়া; মামলা-বাণিজ্য; ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়; বাস, ট্রাকস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন বাজারে নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, খুলনা সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে মাসিক দুই লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নগরের দখলদারি ও মাদকের কারবার থেকেও নিয়মিত ভাগ পান ওই নেতা।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, খুলনা নগরে বর্তমানে আটটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়। কিশোর গ্যাং থেকে গড়ে ওঠা রোহান ও পলাশ গ্রুপ পরে ভেঙে গিয়ে একাধিক বাহিনীতে রূপ নেয়। পলাশ, গ্রেনেড বাবু ও নুর আজিম আলাদা বাহিনী গঠন করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। দৌলতপুর এলাকায় চরমপন্থী হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ ও নাসিমুল গণির নেতৃত্বে আলাদা গ্রুপ রয়েছে। সম্প্রতি টুটপাড়া এলাকায় আশিক গ্রুপ আলোচনায় এসেছে।

পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত নাসিম জেলে থাকায় তার গ্রুপ কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। গত বছরের ২৮ নভেম্বর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আবার সক্রিয় হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পুলিশের ধারণা, নগরে এখন আটটি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, খুলনা মহানগরের ৩০২টি বস্তিতে অস্ত্রধারীদের অবাধ বিচরণ। প্রায় প্রতিটি বস্তিতে দুজন করে প্রশিক্ষিত শুটার আছে। এসব এলাকায় গড়ে চারজন করে নারী মাদক বিক্রেতাও সক্রিয়।

পুলিশের হিসাবে, নগরের বিভিন্ন পাড়ামহল্লা ও বস্তিতে প্রায় ৪০০ মাদক কারবারি রয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ নারী।

কেএমপি কমিশনার মোহাম্মাদ জাহিদুল হাসান বলেন, অপরাধীদের নতুন তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে ঈদের পর কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা মাদক ব্যবসায়ী যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত এক মাসে খুলনা জেলা ও মহানগরে সাতটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশ্যে এসব হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে রূপসা উপজেলার জয়দেব গ্রামে ঘুমন্ত স্বামী মোহর আলী শেখকে কুড়াল দিয়ে হত্যা করেন তাঁর স্ত্রী হোসনে আরা। ঘটনার ১১ ঘণ্টা পর রমনগর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর দুই দিন পর দৌলতপুরের রেলগেট এলাকায় ইজিবাইক ছিনতাই করতে গিয়ে চালক রানা হাওলাদারকে হত্যা করা হয়। পরদিন নদী থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২৫ ফেব্রুয়ারি তেরখাদায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে বোমার আঘাতে আহত হন আব্দুল্লাহ আল মামুন। পরে ঢাকার বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ২৬ মার্চ খানজাহান আলী থানার আফিল গেট এলাকায় দুর্বৃত্তরা ঘের ব্যবসায়ী সোহেল শেখকে গুলি করে হত্যা করে। পরদিন দিঘলিয়ায় যুবদল নেতা মুরাদ খানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

১ মার্চ রাতে নগরের নিরালা কাঁচাবাজার এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন আজিজুর শেখ। ঢাকায় নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। ৪ মার্চ রাতে নগরের ডাকবাংলো মোড়ে পরিবারের সামনে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয় শ্রমিকনেতা মাসুম বিল্লাহকে। একই রাতে লবণচরা এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন রিকশাচালক হাবিবুর রহমান।

কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম বলেন, অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত