Ajker Patrika

পুঁজিবাজারে বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি: সরকারি চুক্তির অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে বিনিয়োগ ঝুঁকি

  • ১১টি মধ্যে পাঁচটিই অধিক ঝুঁকিতে।
  • পিপিএ শেষ, প্ল্যান্ট বন্ধ।
  • আদায় অযোগ্য পাওনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা
আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০: ২১
পুঁজিবাজারে বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি: সরকারি চুক্তির অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে বিনিয়োগ ঝুঁকি

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যচিত্র এখন শুধু দুর্বল তকমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এদের ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নিয়েই তৈরি হয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা। কোম্পানির সঙ্গে সরকারি ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) মেয়াদ শেষ ও নতুন চুক্তির অনিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ, আদায় অযোগ্য পাওনা বৃদ্ধি এবং সম্পদের অতিমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে সংকট স্পষ্ট। এ সম্পর্কিত হালনাগাদ আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ১১টি কোম্পানির মধ্যে অন্তত পাঁচটির ক্ষেত্রেই এসব ঝুঁকি আছে।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি জানিয়েছে, চুক্তি ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ করে; তাই কোম্পানিগুলোকে সঠিক তথ্য প্রকাশ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয় চুক্তি ছাড়া বিনিয়োগ টেকসই নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্ল্যান্টের উৎপাদন ব্যয় বেশি, অন্যদিকে গ্যাস-সংকট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। এ অবস্থায় পিপিএ শেষ হওয়া প্ল্যান্টগুলো চালু রাখা কঠিন। অডিট রিপোর্টে ‘গোয়িং কনসার্ন’ ঝুঁকি থাকলে বিনিয়োগকারীদের জানাতে হবে। ডিএসইর উচিত চুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা ও প্ল্যান্ট বন্ধ থাকার তথ্য প্রাইস সেনসিটিভ ইনফরমেশন হিসেবে প্রকাশ নিশ্চিত করা।

নিরীক্ষায় পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম সবচেয়ে প্রকট। বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে ৪ হাজার ৭১৫ কোটি টাকার ফরেন এক্সচেঞ্জ ক্ষতি মূলধনে যুক্ত, ২৭ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার প্রপার্টি, প্ল্যান্ট ও ইকুইপমেন্ট (পিপিই)­­ পরীক্ষা ছাড়া দেখানো, বিতর্কিত পাওনায় প্রভিশন না রাখার ফলে প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আড়াল হয়েছে। সুদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও দুর্বলতা আছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি ৮ ও ৫ টাকার বেশি লোকসানে থাকা কোম্পানিটি এখন জেড ক্যাটাগরিতে নেমেছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক মো. মুনিরুজ্জামান জানান, ভেন্ডর চুক্তি সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়াধীন, সুদ ব্যয় যাচাই করে প্রয়োজন হলে সমন্বয় হবে।

ডেসকোর ৫৬০ কোটি টাকার পাওনার মধ্যে ৩১১ কোটি প্রায় আদায় অযোগ্য, প্রভিশন রাখা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। বাতিল গুলশান সাবস্টেশন প্রকল্প এখনো সিডব্লিউআইপিতে দেখানো হচ্ছে। বড় লোকসানের কারণে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে লভ্যাংশ দিতে পারেনি ডেসকোও। এ প্রসঙ্গে কোম্পানি সচিব মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান জানান, বিহারি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের বকেয়া ২৬৩ কোটি টাকা নিয়ে মামলা চলমান থাকায় তা প্রভিশনে নেওয়া হয়নি। আর গুলশান সাবস্টেশন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হলে তা ১০ বছর মেয়াদে সমন্বয় করা হবে।

বারাকা পাওয়ার নিজস্ব সহযোগী প্রতিষ্ঠানে ১৫৫ কোটি টাকার বেশি জামানতহীন ঋণ দিয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের ৫১ মেগাওয়াট রেন্টাল কেন্দ্রটি চুক্তি শেষ হওয়ায় ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ, অথচ সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ পরীক্ষা মূল্যায়ন করা হয়নি। কোম্পানির এমডি ফাহিম আহমেদ চৌধুরী জানান, সরকার হঠাৎ চুক্তি স্থগিত করার কারণে বর্তমানে প্ল্যান্টটি বন্ধ রয়েছে।

খুলনা পাওয়ারের ইউনিট-২ ও ইউনিট-৩-এর পিপিএ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। আগস্ট থেকে প্ল্যান্ট পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সম্পদের মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং টানা পাঁচ বছর লোকসানের কারণে কোম্পানিটি জেড ক্যাটাগরিতে রয়েছে।

ডরিন পাওয়ারের তিনটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের পিপিএ শেষ হয়ে ভবিষ্যৎ আয় অনিশ্চিত, পাশাপাশি গ্র্যাচুইটি ও দেনা-পাওনার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকেরা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, সরকারি ক্রয় চুক্তির অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভাব বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোকে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় চুক্তি পুনরায় নবায়ন ও বাজারমুখী উদ্যোগ জরুরি। এতে কোম্পানিগুলো টেকসই হবে এবং এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত