Ajker Patrika

একদিন মানুষ আমাদের দেশ দেখতে আসবে

আদনান আল রাজীব
একদিন মানুষ আমাদের দেশ দেখতে আসবে

কানের একটি বিকেলের কথা দিয়েই শুরু করি।

সমুদ্রের পাশে ছোট ছোট পতাকা উড়ছে। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ হাঁটছে। কেউ সিনেমা দেখতে যাচ্ছে, কেউ সিনেমা নিয়ে কথা বলছে, কেউ চুপচাপ কফি খাচ্ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা আসলে খুব বড় নয়। মানুষও খুব আলাদা নয়।

একজন আফ্রিকার কোনো ছোট্ট শহরের গল্প বলছেন। একজন বলছেন লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা। আরেকজন উত্তর ইউরোপের দীর্ঘ শীত আর নিঃসঙ্গতার গল্প শোনাচ্ছেন। গল্পগুলো আলাদা। মানুষগুলোও আলাদা। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সবাই মন দিয়ে শুনছে।

কারণ, গল্পের ভাষা আলাদা হতে পারে, মানুষের অনুভূতির ভাষা আলাদা হয় না। সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই।

আমরা সিনেমাকে অনেক সময় শুধুই বিনোদন হিসেবে দেখি, কিন্তু সিনেমা তার চেয়ে অনেক বড় কিছু। একটি দেশের মানুষ কী খায়, কীভাবে হাসে, কীভাবে প্রেমে পড়ে, কী নিয়ে ভয় পায়—এসবের খবরও সিনেমা দেয়। সময়ের গল্প।

একজন বিদেশি দর্শক যখন বাংলাদেশের একটি সিনেমা দেখেন, তখন তিনি শুধু একটি গল্প দেখেন না; তিনি বাংলাদেশের উঠান দেখেন, নদী দেখেন, বৃষ্টির শব্দ শোনেন, মানুষের মুখ দেখেন। আমাদের স্বপ্ন, ভালোবাসা অথবা হতাশার সঙ্গে পরিচিত হন।

মানুষের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। সে অন্য মানুষের গল্প জানতে চায়। একটি গ্রামের মানুষ শহরের গল্প শুনতে চায়। শহরের মানুষ গ্রামের গল্প শুনতে চায়। একটি দেশের মানুষ আরেক দেশের জীবন সম্পর্কে জানতে চায়। এই কৌতূহল থেকে পৃথিবীটা একটু একটু করে ছোট হয়। সিনেমা সেই কাজটাই করে।

একটি ভালো চলচ্চিত্রের পাসপোর্ট লাগে না, ভিসা লাগে না। সেটি এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যায়। একজন বাংলাদেশি কোরিয়ার কোনো চলচ্চিত্র দেখে নিজের জীবনের কথা মনে করতে পারেন। আবার কোনো ইউরোপীয় দর্শক বাংলাদেশের গ্রামের গল্পে নিজের পরিবারের ছায়া খুঁজে পেতে পারেন।

এ কারণেই চলচ্চিত্রকে শুধু শিল্প বলা হয় না, একে একটি দেশের সফট পাওয়ারও বলা হয়।

আমরা প্রায়ই শক্তির কথা বললে অর্থনীতি কিংবা সামরিক শক্তির কথা ভাবি। কিন্তু পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে, যাদের কথা মানুষ প্রথমে তাদের সংস্কৃতির মাধ্যমে শুনেছে। কেউ কোনো দেশের গান শুনে সেই দেশকে চিনেছে। কেউ সাহিত্য পড়ে। কেউ সিনেমা দেখে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কথা ভাবুন। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ কোরিয়া সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছে প্রথমে তাদের সংস্কৃতির কারণে। সংস্কৃতি দরজা খুলে দেয়। তারপর আসে ব্যবসা, পর্যটন, বিনিয়োগ, সম্পর্ক।

চলচ্চিত্রও সেই দরজা খুলে দেয়।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে গেলে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে। বিভিন্ন দেশের প্যাভিলিয়ন। ছোট দেশ। বড় দেশ। নতুন দেশ। পুরোনো দেশ। সবাই নিজেদের গল্প নিয়ে গর্বিত। তাদের নির্মাতারা পুরস্কার জিতলে সেটি শুধু একজন নির্মাতার জয় থাকে না, ধীরে ধীরে সেটি দেশের জয় হয়ে যায়।

কারণ, তারা বুঝেছে, সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ কখনো অপচয় নয়।

ভালো একটি চলচ্চিত্র রাজনৈতিকভাবেও একটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর অনেক মানুষ কোনো দেশ সম্পর্কে প্রথম ধারণা পায় সেই দেশের চলচ্চিত্র থেকে। একটি দেশের সংবাদ হয়তো এক দিনের জন্য শিরোনাম হয়। কিন্তু একটি চলচ্চিত্র বছরের পর বছর মানুষের মনে থেকে যায়।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব কম নয়। একটি সিনেমা তৈরি করতে অসংখ্য মানুষের সংযোগ লাগে–লেখক, অভিনেতা, চিত্রগ্রাহক, শিল্পনির্দেশক, সংগীতশিল্পী, সম্পাদক, প্রযুক্তিবিদ। অনেক মানুষের জীবিকা এর সঙ্গে জড়িত।

এরপর আছে আরও বড় সম্ভাবনা।

কোনো দেশের গল্প যদি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেই দেশকে দেখতে যাওয়ার আগ্রহও তৈরি হয়। পৃথিবীর অনেক শহর শুধু সিনেমার কারণেই পর্যটনের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, বাংলাদেশের গল্পগুলোও একদিন হয়তো মানুষকে আমাদের নদী দেখতে নিয়ে আসবে। আমাদের পাহাড় দেখতে নিয়ে আসবে। হয়তো কোনো বিদেশি দর্শক শুধু একটি সিনেমা দেখে সুনামগঞ্জ দেখতে চাইবেন; কিংবা কক্সবাজারের কোনো ভোর।

অসম্ভব কিছু নয়।

বাংলাদেশের বড় শক্তি হলো, আমাদের এখনো অনেক গল্প বাকি আছে এবং পৃথিবী এখন নতুন গল্প খুঁজছে।

আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশের সিনেমা আন্তর্জাতিক হচ্ছে। আমার মনে হয়, বিষয়টি এখন আর স্বপ্নের মতো নয়। ধীরে ধীরে এটি বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

তবে তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা।

একটি দেশের চলচ্চিত্রশিল্প এক দিনে তৈরি হয় না। যেমন একটি গাছ এক দিনে বড় হয় না। তাকে পানি দিতে হয়। সময় দিতে হয়। যত্ন নিতে হয়।

চলচ্চিত্রও তেমন।

আজ যদি আমরা আমাদের গল্পগুলোকে গুরুত্ব দিই, নির্মাতাদের পাশে দাঁড়াই, নতুন কণ্ঠগুলোকে সুযোগ দিই, তাহলে তার ফল আমরা শুধু উৎসবের মঞ্চে নয়; দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক পরিচয়ের মধ্যেও দেখতে পাব।

শেষ পর্যন্ত সিনেমা মানুষের গল্পই বলে।

সেটি হাজার মাইল দূরের একজন মানুষকে আপনার খুব কাছের মানুষ বানিয়ে দিতে পারে।

সম্ভবত এ কারণেই পৃথিবী বদলে যায়। একেকটি গল্পের মাধ্যমে। একেকটি সিনেমার মাধ্যমে।

লেখক: প্রযোজক ও নির্মাতা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত