Ajker Patrika

রাতে রাতে ভরে উঠছে শীতলক্ষ্যার পেট

রাতুল মণ্ডল, শ্রীপুর
রাতে রাতে ভরে উঠছে শীতলক্ষ্যার পেট

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন মালিকানাধীন আকিজ-বশির গ্রুপ শীতলক্ষ্যা নদী জবরদখল করে বালু দিয়ে ভরাট করছে। রাত-দিন তিনটি ড্রেজার দিয়ে বিরতিহীনভাবে নদী ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না স্থানীয় কৃষকের কৃষিজমিও। শিল্পমালিকদের পালিত লাঠিয়াল বাহিনী কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এমনি একটি সরকারি (গোহালট) রাস্তা ব্যবহার করতে বাধা দিচ্ছে। প্রবেশমুখে বসানো হয়েছে কড়া পাহারা। মোবাইল ফোনে আমাকে এমন কর্মকাণ্ডের তথ্য দেন স্থানীয় লতিফপুর গ্রামের এক বাসিন্দা।

তথ্য পেয়ে ২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যমুনা টেলিভিশনের হোসাইন আলী বাবু, বাংলা টেলিভিশনের সুমন শেখ, দৈনিক ‘আমাদের সময়’-এর আব্দুল লতিফ, ঢাকা পোস্টের সিহাব খান, আনন্দ টেলিভিশনের আদনান মামুনসহ বেশ কয়েকজন সহকর্মী সরেজমিন দেখতে যাই। তথ্যদাতার তথ্যের সঙ্গে পরিস্থিতির মিল পেলাম। পাকা সড়ক থেকে নদীর দিকে যেতেই কয়েকজনের বাধা—ওই দিকে যাওয়া যাবে না। অনুমতি নিতে হবে। তাঁরা প্রশ্ন করলেন, আপনারা কারা?

মোটামুটি কথা-কাটাকাটি হলো। শেষে ঘটনাস্থলে যেতে সক্ষম হলাম আমরা। তথ্যের মিল ছিল শতভাগ। মোবাইল ফোনে নদী দখলের ছবি ও ভিডিও ধারণ করি আমিসহ অন্য সহকর্মীরা। এরপর যেন পুরো চিত্র পরিবর্তন হয়ে গেল। প্রবেশের ১৫ মিনিট পর আমাদের সামনে লাঠিসোঁটা হাতে এসে দাঁড়ালেন কয়েকজন। ভয় পেয়ে গেলাম আমরা। কাছে এলে তাঁদের দাপট আরও বেড়ে গেল। বলতে লাগলেন, ‘কই তোরা? দড়ি আন, এদের বেঁধে রাখি। কেমন সাংবাদিক এরা, দেখি ক্ষমতা।’ বারবার এমন বাক্য উচ্চারণ করছেন যে লোকটি, তাঁর পরিচয় জানার চেষ্টা করি। উপস্থিত একজন জানালেন, জামশেদ ভাই। তাঁর বড় ভাই মোর্শেদ যুবলীগ নেতা। এমপির সঙ্গে চলাফেরা।

দুই ঘণ্টার মতো নদীতীরে আমাদের আটকে রাখে জামশেদ-মোর্শেদ বাহিনী। এ সময় আমাদের এক সহকর্মী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ তে ফোন করলে ঘটনাস্থলে পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য এসে আমাদের উদ্ধার করেন। সহকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিবেদন তৈরির পর সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়ে অফিসে পাঠাই। ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ‘আজকের পত্রিকা’র শেষ পৃষ্ঠায় ‘রাতে রাতে ভরে উঠছে শীতলক্ষ্যার পেট’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় সেই সংবাদ। গাজীপুরের নদী পরিব্রাজক দলসহ পরিবেশকর্মীদের মাধ্যমে খবরটি দ্রুত পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। নজরে আসে তৎকালীন নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরীর। তিনি বেলা আড়াইটার দিকে আমাকে ফোন করে জানতে চান নদী দখলের বিস্তারিত। আমি সব তথ্য দিলাম তাঁকে। তিনি জানালেন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসককে ফোনে সব জানিয়েছেন তিনি।

ঘটনার এক দিন পর আমাকে ফোন করলেন তৎকালীন শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম। তিনি জানালেন, গোসিঙ্গা ইউনিয়নের লতিফপুরে অভিযান পরিচালনা করা হবে। আমি যেন দ্রুত সেখানে যাই। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সদস্য উপস্থিত। শুরু হলো মাপজোখ। নদীর সীমানা নির্ধারিত হলো, দখলের সত্যতা নিশ্চিত হলো। অভিযানের খবর পেয়ে গা ঢাকা দিয়েছে জামশেদ-মোর্শেদ বাহিনী। তবে সংশ্লিষ্ট আকিজ বশির গ্রুপের দায়িত্বে থাকা দুজনকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনায় আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বেঁচে যায় নদীর পাঁচ বিঘা জমি। নির্মাণকাজের পিলার সরিয়ে নেওয়া হয় তাৎক্ষণিকভাবে। আটক দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের গাড়িতে করে নেওয়া হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে। বেলা ৩টার দিকে আকিজ বশির গ্রুপের সংশ্লিষ্টরা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়ে দুজনকে ছাড়িয়ে নেয়।

এই জবরদখলের সংবাদ শুধু ‘আজকের পত্রিকা’য় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল।

লেখক: শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত