কারাগারে থেকেও যুবলীগের মিছিলে!
• যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ।
• পরিকল্পিতভাবে হয়রানির অভিযোগ ওসির বিরুদ্ধে।
• আসামি করে এখন ওসি বলছেন ‘টাইপ মিসটেক’।

রাজশাহীর তানোরে চাঁদা না দেওয়ায় এক চুল ব্যবসায়ীকে একের পর এক মামলায় হয়রানির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবদল কর্মী ও পুলিশের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার আগেই তাঁকে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আরেকটি মামলার আসামি করা হয়েছে। তবে এজাহারে মিছিলের যে সময় উল্লেখ করা হয়েছে, তখন তিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেছেন, ‘এটি টাইপ মিসটেক’।
ভুক্তভোগী ব্যক্তির নাম হাফিজুর রহমান (৪০)। তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের চন্দনকৌঠা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। চন্দনকৌঠা বটতলা মোড়ে তাঁর একটি দোকান রয়েছে। সেখানে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে নারীদের ঝরে পড়া চুল কেনেন তিনি। তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম একসময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। প্রায় দুই মাস আগে তিনি মারা গেছেন। তবে হাফিজুর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলে দাবি করেছেন।
হাফিজুরের অভিযোগ, স্থানীয় যুবদল কর্মী ইমরান আলী তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। টাকা না দিলে দোকান দখল করে নেওয়ার হুমকিও দেন। চাঁদা না পেয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর কয়েক সহযোগীকে নিয়ে ইমরান দোকানে গিয়ে তাঁকে মারধর করেন। এ ঘটনায় হাফিজুর তানোর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। তাঁর দাবি, তদন্তে গিয়ে পুলিশের এক এসআই অভিযোগের সত্যতা পেলেও ইমরানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।
এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর ভোররাতে তানোর থানার ওসি মাহমুদুল হাসান একদল পুলিশ নিয়ে হাফিজুরের বাড়িতে যান। হাফিজুরের অভিযোগ, পুলিশ তাঁর বাড়ির কাঠের দরজা লাথি মেরে ভেঙে ভেতরে ঢোকে। পরে তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬ জুন করা একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২৩ জুন কামারগাঁ ইউনিয়ন বিএনপি কার্যালয়ে হামলার অভিযোগে মামলাটি করেছিলেন মাহফিজুর রহমান নামের এক যুবদল নেতা। ওই মামলার এজাহারে হাফিজুরের নাম ছিল না। পরে তদন্তে তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে দাবি করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এ মামলায় ২১ দিন কারাভোগের পর আদালত থেকে জামিন পান হাফিজুর। গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৪৭ মিনিটে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এর আগে একই দিন রাত ৮টা ১০ মিনিটে তানোর উপজেলার পাগল দেওয়ান পাকা রাস্তার খাড়ির ধারে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিল করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়।
তানোর থানার এসআই জাহাঙ্গীর আলমের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ওই মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হাফিজুর এ মামলার ৯ নম্বর আসামি।
হাফিজুরের দাবি, মিছিলের সময় তিনি কারাগারে ছিলেন। কারাগারের ডেপুটি জেলার ফৌজিয়া আক্তার ববিও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
হাফিজুর বলেন, কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় ফটকে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন রাত ৯টা ৪৭ মিনিট। বিকেল ৫টা থেকে তিনি কারাগারের মুক্তি শাখায় বসে ছিলেন। তাঁর প্রশ্ন, রাত ৮টা ১০ মিনিটে তিনি কীভাবে মিছিলে অংশ নিলেন?
হাফিজুরের অভিযোগ, ইমরান আলীর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ করায় তাঁকে একের পর এক মামলায় আসামি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ আমার অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। কিন্তু যুবদল কর্মী বলে ইমরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ইমরানের কথায় ওসি আমাকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় আসামি করছেন। এক মামলায় জামিন পেতেই আরেকটি মামলা দেওয়ায় এখন পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে ইমরান আলী বলেন, হাফিজুরের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘পুলিশ কেন আমার কথা শুনে তাঁকে একের পর এক মামলা দেবে? আমি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচন করব। এ জন্য আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে। আমি কোনো চাঁদা চাইনি।’
ওসি মাহমুদুল হাসান বলেন, ইমরানের কথায় হাফিজুরের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাঁকে হয়রানি করার অভিযোগ সত্য নয়। চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে হবে বলে জানান তিনি।
কারাগারে থাকা অবস্থায় হাফিজুরকে নতুন মামলায় আসামি করার বিষয়ে ওসি বলেন, ‘একটা মিসিং হতে পারে। টাইপ মিসটেক হতে পারে। পুলিশের কাছে রং মেসেজও আসতে পারে। এভাবে কেউ ভুল করে আসামি হয়ে যেতে পারে। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া না গেলে তাঁকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হবে।’









