টিকটকে তান্ত্রিক সেজে প্রতারণা, নারীর সাড়ে ৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

টিকটকে তান্ত্রিক ও কবিরাজ পরিচয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগে মো. মিজানুর রহমান (২৫) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এক নারীর কাছ থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া গত ছয় মাসে কয়েক শ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা করছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
গত ১৬ অক্টোবর জামালপুর সদর উপজেলার চর যথার্থপুরের ভাটিপাড়া গ্রাম থেকে মিজানুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর কাছ থেকে দুটি মুঠোফোন ও একাধিক সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। আজ সোমবার রাজধানীর কল্যাণপুরে পিবিআইয়ের এসআইঅ্যান্ডও (অর্গানাইজড ক্রাইম-উত্তর) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবদুর রহমান।
পিবিআই জানায়, মিজানুর টিকটকের বিভিন্ন আইডিতে কখনো ‘জাফর কবিরাজ’, কখনো ‘জীবন কবিরাজ’ পরিচয় ব্যবহার করতেন। কখনো নিজেকে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের খাদেম বলেও পরিচয় দিতেন। তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধান, দাম্পত্য কলহ দূর করা, পছন্দের মানুষকে কাছে পাওয়া, সন্তানকে পড়াশোনায় মনোযোগী করা এবং ব্যবসায় লোকসান কাটিয়ে লাভের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিতেন তিনি।
এসব প্রচারের জন্য অন্যদের তৈরি তান্ত্রিকতা সংক্রান্ত ভিডিও ডাউনলোড করে নিজের টিকটক আইডিতে প্রকাশ করতেন মিজানুর। পরে আগ্রহীদের সঙ্গে ইমো ও মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাঁদের সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিতেন। কথিত কবিরাজি উপকরণ কেনা ও বিভিন্ন আচার পালনের কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নিতেন।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রতারণার শিকার এক নারী উত্তরা পশ্চিম থানায় করা মামলার বাদী। তাঁর পরিচয় গোপন রাখতে নুসরাত মরিয়ম (ছদ্মনাম) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। টিকটকে ‘তান্ত্রিক গুরু জীবন কবিরাজ’ নামের একটি আইডির মাধ্যমে মিজানুরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই নারী নিজের পারিবারিক সমস্যার কথা জানালে সমাধানের আশ্বাস দেন মিজানুর।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিকাশের একটি নম্বরে মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠান ওই নারী। কিন্তু সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তিনি টাকা ফেরত চান। এ সময় তাঁকে অলৌকিক শক্তির ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় গত ৪ জুলাই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন ভুক্তভোগী। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪১৯, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে উত্তরা পশ্চিম থানা মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে।
পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবদুর রহমান জানান, গত আগস্টে একই ধরনের একটি প্রতারণার ঘটনা তদন্তের পর এ-সংক্রান্ত প্রচারণা দেখে ওই নারী পিবিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে বিকাশে টাকা পাঠানোর তথ্য ও লেনদেনের রেকর্ড সংগ্রহ করে যাচাই করা হয়। পরে পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুলের নেতৃত্বে একটি দল অভিযান চালিয়ে মিজানুরকে গ্রেপ্তার করে।
পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিজানুর প্রকৃতপক্ষে কোনো তান্ত্রিক নন বলে স্বীকার করেছেন। তাঁকে জামালপুর থেকে ঢাকায় আনার পথে তাঁর ইমো নম্বরে ৪২ থেকে ৪৩ জন ফোন করেন। তাঁদের মধ্যেও প্রতারণার শিকার ব্যক্তি থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রায় ছয় মাস ধরে এ ধরনের প্রতারণায় জড়িত ছিলেন মিজানুর। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েক শ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকতে পারেন তিনি। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রথমে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা কিংবা ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা নেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮৫০, ১ হাজার ৫৫০, ১ হাজার ৮৫০ বা ২ হাজার ৫৫০ টাকার মতো নির্দিষ্ট অঙ্ক চাওয়া হতো। কেউ একপর্যায়ে টাকা দেওয়া বন্ধ করতেন, আবার কেউ একাধিকবার টাকা দিতেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘটনায় মিজানুরের একক ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনায় অন্য কারও সহযোগিতা থাকার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর অ্যাকাউন্ট পরিচালনা বা ভিডিও ডাউনলোডে কেউ সহযোগিতা করেছেন কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া জব্দ করা মুঠোফোন ও বিকাশ অ্যাকাউন্ট-সংশ্লিষ্ট সিমের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবদুর রহমান বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও মানুষের আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত তান্ত্রিক, কবিরাজ কিংবা অলৌকিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হতে তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও মানসিক সমস্যার সমাধানে তন্ত্র-মন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
পিবিআই জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।









