Ajker Patrika

ঢাকায় দৈনিক তৈরি ১৪ টন মেডিকেল বর্জ্য, অব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

সাইফুল মাসুম, ঢাকা
ঢাকায় দৈনিক তৈরি ১৪ টন মেডিকেল বর্জ্য, অব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের অফিসের সামনের দৃশ্য। উন্মুক্ত নানা ধরনের বর্জ্যের স্তূপে পড়ে আছে পরিত্যক্ত সিরিঞ্জ, ব্যবহৃত মাস্ক, স্যালাইনের খালি ব্যাগের মতো মেডিকেল বর্জ্য। গেটের পাশে এ ধরনের বর্জ্য রাখার নির্ধারিত স্থান থাকলেও একাধিকবার গিয়ে সেখানে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীর তৎপরতা দেখা যায়নি। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটের উল্টো পাশে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রে (এসটিএস) সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে ছিল মেডিকেল বর্জ্য। গত রোববার দুপুরে সেখানে কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মেডিকেল বর্জ্য থেকে প্লাস্টিকের অংশগুলো আলাদা করে নিচ্ছিলেন। সেখানে এ প্রতিবেদকের কথা হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী সালমানের সঙ্গে। তিনি আজকের পত্রিকাকে জানান, কাজ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হাতও কেটে যায়। তাঁরা জানান, এ থেকে সাধারণ অসুখ ছাড়াও বিপজ্জনক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। 

প্রসঙ্গত, এ হাসপাতাল এলাকাটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২১ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। গত সোমবার উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে থাকা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও দেখা গেল একই চিত্র। হাসপাতালের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত এসটিএসে সব ধরনের বর্জ্য মিশ্র অবস্থায় দেখা যায়। সেখানেও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মেডিকেল বর্জ্য থেকে প্লাস্টিকের উপাদানগুলো আলাদা করে রাখছিলেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী খাইরুল জানান, একটি সংস্থা বর্জ্যগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। 

শুধু রাজধানীর এই দুই হাসপাতালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এমন দশা, তা নয়। ঢাকার দুই সিটির আওতাধীন বেশির ভাগ হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিকের চিত্র কমবেশি একই। ঢাকার দুই সিটির মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে প্রিজম বাংলাদেশ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের তথ্য অনুসারে, রাজধানীতে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ টন মেডিকেল বর্জ্য তৈরি হয়। 

প্রিজম বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আনিসুর রহমান আজকের পত্রিকাকে জানান, ঢাকার দুই সিটিতে তাঁর প্রতিষ্ঠান কাজ করত। কিন্তু ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস শেষ দিকে আওয়ামী লীগের লোকজন দিয়ে মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করাতেন। এখন শুধু ডিএনসিসির মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে প্রিজম। আনিসুর রহমান বলেন, নানা কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে তাঁরা সফল হতে পারেননি। 

চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি বিধিমালা থাকলেও তা মানছে না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। কোনো কোনো বড় প্রতিষ্ঠান কিছুটা মানলেও সার্বিক পরিস্থিতি হতাশা ও উদ্বেগজনক। বিধিমালায় বলা হয়েছে, চিকিৎসা বর্জ্যের সঙ্গে অন্যান্য বর্জ্য মেশানো যাবে না। আবার চিকিৎসা বর্জ্যেরও নানা ধরনের জন্য আলাদা রঙের পাত্র ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু খুব কম হাসপাতালেই এমন ব্যবস্থা আছে। 

রাজধানীর পান্থপথের বেসরকারি হাসপাতাল হেলথ অ্যান্ড হোপের চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, দেশে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানসম্মত কোনো ব্যবস্থা নেই। মেডিকেল বর্জ্যদূষণ মানুষসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সারা দেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে তদারকি করে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাছিম আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রিজম নামে একটা সংস্থা মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে। ডিএসসিসির বেশির ভাগ হাসপাতালের বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার একটি প্রক্রিয়া চালু আছে। তবে বর্জ্য সংগ্রহে কিছু অসংগতি পাচ্ছি। মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি যাতে কমিয়ে আনা যায়, তার চেষ্টা করছি।’

এদিকে ডিএনসিসি মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এখনো ‘টার্ম অব রেফারেন্স’ (কাজের লক্ষ্য প্রক্রিয়া ইত্যাদি) তৈরির কাজ করছে বলে জানান প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফিদা হাসান। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ভালো মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। আমরা টার্ম অব রেফারেন্স তৈরিতে কাজ করছি, যাতে টেন্ডারের মাধ্যমে এ কাজের যোগ্য প্রতিষ্ঠান পেতে পারি।’

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত