Ajker Patrika

মায়ের প্রাণের বিনিময়ে বেঁচে ফেরা দুই যমজ শিশুর কান্না থামছে না

তাসনীম হাসান, চট্টগ্রাম
আপডেট : ১৯ জুন ২০২২, ২১: ২৮
মায়ের প্রাণের বিনিময়ে বেঁচে ফেরা দুই যমজ শিশুর কান্না থামছে না

খাটের ওপর মশারির নিচে শুয়ে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে তাকিয়া ইয়াসমিন তিন্নী। বিছানায় ছড়ানো নানা খেলনা। আছে দুধের বোতল। পাশে বসে ভাতিজির ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় ফুঁপি ফেরদৌস আরা বেগম। কখনো এসে দেখে যাচ্ছেন দাদি-বাবাও। সবাই আছে, শুধু নেই মায়ের পরশ। ঘুমের মধ্যে কেঁপে উঠলেও তাই মিলছে না মায়ের স্পর্শ। সেই ঘুম ভাঙলেই শুরু হয় অঝোরে কান্না। সেই কান্না থামাতে ফুপি মুখে দুধের বোতল এগিয়ে দেন। কিন্তু তাতে তৃপ্তি মিলছে কোথায়? একই কষ্টে পুড়ছে তিন্নীর যমজ বোন তাকিয়া ইয়াসমিন তানহাও। 

 এভাবেই সদ্য মা হারানো সাত মাস বয়সী দুই শিশুর বর্তমান অবস্থা আজকের পত্রিকাকে জানাচ্ছিলেন বাবা জয়নাল আবেদীন। তানহা আর তিন্নীর গল্প হয়তো এর মধ্যেই সবার জানা হয়ে গেছে। শুক্রবার মধ্যরাতে চট্টগ্রাম নগরীর পূর্ব ফিরোজশাহ কলোনির এক নম্বর ঝিল এলাকায় পাহাড়ধসে আলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে এই দুই শিশু। ঘরের ওপর পাহাড় আছড়ে পড়লে মা বুক দিয়ে শিশু দুটিকে বুকে আগলে রাখেন। তাতে শিশু দুটি বাঁচলেও মা শাহীনুর আকতার ছবি হয়ে গেছেন। এখন মা হারা দুগ্ধজাত দুই শিশু নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে পরিবার। বাজার থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন গুঁড়ো দুধ পানিতে মিশিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন স্বজনেরা। কিন্তু সেগুলো সেভাবে মুখে তুলছে না দুই শিশু। 

দুই শিশুর কান্না দেখে অসহায় বাবা জয়নুল আবেদীনের গলা বুজে আসে। কাতর কণ্ঠে তিনি আর্তি জানান এভাবেই, ‘কেউ কি আমার মেয়ে দুটোর বুকের দুধ খাওয়ানোর দায়িত্ব নেবেন! দুই মেয়ের কান্না তো আর সইতে পারছি না! কেউ এগিয়ে না এলে বাচ্চাদের বাঁচাতে পারব না।’ 

শুক্রবার রাতে শাহীনুর আকতার মারা যাওয়ার পর পাশের বাসার বিথি আক্তার নামের এক নারী দুই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু নিজেরও দুগ্ধজাত সন্তান থাকায় নতুন করে দুই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে বেশ বিপাকে পড়েন তিনি। এর মধ্যে শহরে দেখাশোনার তেমন কেউ না থাকায় শনিবার বিকেলে তিন্নীকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি মিরসরাইয়ের ব্রাহ্মণসুন্দরপাড়ায় নিয়ে যান জয়নাল। 

আর তানহাকে কাপ্তাইয়ে অবস্থিত নিজেদের বাসায় নিয়ে যান তার দুই চাচি। জয়নাল-শাহীনুর দম্পতির তরিবুল ইসলাম তানিম নামের চার বছরের আরও এক পুত্র সন্তান রয়েছে। দুই যমজ বোন মায়ের কি হয়েছে সেটি এখনো বুঝতে না পারলেও বুঝে গেছে তানিম। সেও ঘটনার পর থেকে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। 

 স্ত্রীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে দিশেহারা জয়নালগত বছরের ১ ডিসেম্বর জন্মের পর থেকেই তানহা আর তিন্নী-দুই বোনই বলতে গেলে ছিল অভিন্ন আত্মা। বাবা-মা আর ভাইয়ের আদরে একটু একটু করে বড় হচ্ছিল তারা। মায়ের মৃত্যুতে এখন দুই বোনের মধ্যেও হলো বিচ্ছেদ! 

শিশু চিকিৎসকেরা বলছেন, ‘এই বয়সী শিশুদের দিনে ৮–৯ বার মায়ের দুধ খাওয়ানো দরকার। বাজারের ফর্মুলা খাওয়ালে সমস্যায় পড়বে শিশুরা। মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।’ 

স্বাভাবিকভাবেই তাই স্ত্রীকে হারানোর পর শোক পালনের অবসরটুকুও মিলছে না জয়নালের। আফসোস নিয়ে শুধু বলতে থাকেন, ‘সাত মাসের দুই বাচ্চার তো মূল খাদ্যই হলো মায়ের বুকের দুধ। এখনো তারা বাইরের খাবারে অভ্যস্ত হয়নি। এ অবস্থায় সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখছি না।’ 

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত