মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪

সেকশন

 

চড়াই-উতরাই ২

শেরপাদের গ্রামে

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ১২:০৩
৩০ বার মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করে রেকর্ড গড়েছেন নেপালি পর্বতারোহী কামি রিতা। তিনি শেরপা সম্প্রদায়ের মানুষ। নেপালের উচ্চ হিমালয়ে বসবাস তাঁদের। পাহাড়ের খাঁজ, উপত্যকা আর তুষারে আটকে যাওয়া এক শেরপা গ্রামে ছিলেন লেখক। এ গল্প সেই গ্রামের।

শেরপাদের গ্রামে অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে হিমালয়ে ভোর এল। সূর্যের কোমল উষ্ণতায় হিমে জমে যাওয়া ঘরবাড়ি, গাছপালা, পাহাড়—সব যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতে লাগল। পাহাড়ে সংসারের ঘড়ি সূর্য ওঠার সঙ্গে শুরু হয়। বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে দেখি, বাড়ির কর্তা কোচি শেরপা ঘরের সামনে সবজিবাগানে কাজ করছেন। তাঁকে দেখে কেন যেন শেরপা মনে হয় না। মাঝারি উচ্চতার লিকলিকে এক সাদামাটা মানুষ। চেহারায় মঙ্গোলয়েড ছাপ থাকলেও দৈহিক গড়নের জন্য তাঁকে কেমন যেন বেমানান লাগছে। হিমালয়ের পুরুষদের, বিশেষ করে শেরপাদের সব সময় শক্ত-সমর্থ পেশিবহুল হিসেবে দেখে এসেছি এত দিন।

সকালের মিষ্টি রোদে উঠানে বসে তাঁর সঙ্গে গল্প শুরু হলো। কোচি শেরপা পেশায় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। দিদির সঙ্গে তিনি এ লজ চালাচ্ছেন। সাতসকালে এত সামাজিক প্রশ্ন-উত্তর পর্ব তাঁকে টানছিল বুঝতে পেরে তাঁর ঘরে ঢুকে গেলাম।

প্রথমেই রান্নাঘর। এখানেই দিদির সঙ্গে পরিচয় হলো। তাঁর দেহাবয়ব তাঁর স্বামীর বিপরীত। হিমালয়ের উত্তর দিকের প্রায় সব এথনিক নারীর মতো দশাসই তাঁর গড়ন। তিনি শেরপাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে আছেন—খাকি রঙের একটি গাউন ও কোমরে রেশমের হলুদ চওড়া বেল্ট। স্থানীয় ভাষায় এই পোশাকের নাম বাখু। স্বভাবচরিত্রেও যে দিদি আলাদা, তা মুহূর্তে বুঝে গেলাম। সদালাপী আর হাস্যোজ্জ্বল এই নারীর সঙ্গে আড্ডা জমে উঠল।

রুটি-তরকারি খেতে খেতে জানতে পারলাম, দিদির বাবা একজন বিখ্যাত শেরপা। তিনি এডমন্ড হিলারির অভিযানগুলোর রানার হিসেবে কাজ করতেন। ৭০ বছর আগের কথা, সেই যুগে ইন্টারনেট ছিল না। এমনকি হিমালয়ের এই অংশে টেলিফোন বা টেলিগ্রাফও ছিল না। সেই সময় এভারেস্ট বেসক্যাম্পে যেতে অভিযাত্রীদের যেখানে ১৮ দিন লেগে যেত, সেখানে রানাররা মাত্র ৮ দিনের মাথায় বেসক্যাম্পে থেকে চিঠিপত্র নিয়ে শহরে পৌঁছে দিতেন। শহর থেকে চিঠিপত্র নিয়ে আবার দুর্গম পথ পেরিয়ে অভিযাত্রীদের হাতে বিদেশ থেকে আসা চিঠি পৌঁছে দিতেন। এ রকম ১২ জন রানার হিলারির জন্য কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে দিদির বাবা ছিলেন একজন। তিনি হিলারির সঙ্গে এক বছর কলকাতায় কাজ করে গেছেন। গ্রামে দিদির এক ভাইও থাকেন।

রোলওয়ালিং উপত্যকার প্রবেশদ্বার, সিমিগাঁও গ্রাম। ছবি: লেখক দিদির রান্নাঘরটি চমৎকারভাবে সাজানো। একদিকে লাকড়ির চুলা আছে, গ্যাস সিলিন্ডার আরেক কোনায় ইন্ডাকশন চুলা। সেই সঙ্গে দেয়ালজুড়ে হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন সাজিয়ে রাখা। লাকড়ির চুলায় মূলত লম্বা সময় ধরে পানি গরম হতে থাকে। ধোঁয়া ওপরের চিমনি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। চুলার উল্টো দিকে কাঠের লম্বা বেঞ্চ দিয়ে ঢালাও বসার জায়গা। কাজকর্ম সেরে সূর্য ডুবলেই গ্রামের পুরুষেরা এই বেঞ্চগুলোর দখল নিয়ে রাকসি আর ছ্যাংয়ের সঙ্গে সন্ধ্যাকালীন আড্ডা জমে ওঠে।

রোলওয়ালিং উপত্যকার সবচেয়ে বড় গ্রাম বেদিং। ছবি: লেখক নাশতা শেষ করে গ্রামটা ঘুরে দেখতে বের হলাম। আমরা একেবারে রিজের ওপরে আছি। ঘর থেকে বের হলেই পুরো উপত্যকা দেখা যায়। পাহাড়ের পুরো ঢাল ধাপে ধাপে নিচে নেমে গেছে। শেরপাদের গ্রামে বসে বাতাসে দোল খাওয়া বাজরাখেতের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, মানুষ খুবই অদ্ভুত প্রাণী। তাঁর মতো প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বোধ হয় কম প্রাণীরই আছে। হাজার হাজার বছর আগের সুমেরীয়দের তৈরি ঝুলন্ত বাগান আসলে এভাবেই ধাপ কেটে বানানো হয়েছিল। আন্দিজের ইনকারাও এভাবেই ধাপ কেটে চাষাবাদ করত। বাংলাদেশের দক্ষিণেও বন্যার পানিতে কচুরিপানা দিয়ে ধাপ বানিয়ে তার ওপর চাষাবাদ করা হয়। আলাদা আলাদা প্রকৃতি, আলাদা আলাদা জাতি, কিন্তু সবার লক্ষ্য একটাই—প্রকৃতিতে টিকে থাকা।

ইয়াকের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছে শেরপা নারী। ছবি: লেখক নৃতত্ত্ববিদেরা ধারণা করেন, বৌদ্ধধর্মের মাহাযান ঘরানার মধ্যকার সংঘাতের ফলে প্রায় ৬০০ বছর আগে তিব্বতের খাম নামের এলাকা থেকে একটি গোষ্ঠী দলে দলে নিজেদের জন্মস্থান ছেড়ে হিমালয়ের দুর্গম দেয়াল টপকে চলে আসে দক্ষিণ দিকের নেপালে। বর্তমানে সেই জাতিকেই আমরা ‘শেরপা’ হিসেবে জানি। তারা প্রথমে বসতি করতে শুরু করে সোলো খুম্বু অঞ্চলে। একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ১৮৭০ সালের দিকে এক দল তাশি লেপচা গিরিবর্ত অতিক্রম করে এই রোলওয়ালিং উপত্যকায় আসতে শুরু করে।

তিব্বতে প্রায় ঢেউখেলানো সমতল জায়গাতেই চাষাবাদ হয়ে থাকে। তিব্বতের চওড়া উপত্যকাগুলোয় গ্রামের চারপাশ ঘিরে থাকে সমতলের মতো খণ্ড খণ্ড চাষের জমি। এমন জমিতে চাষাবাদ করার পদ্ধতি এক রকম। কিন্তু হিমালয় পেরিয়ে দক্ষিণে এলে পাবেন খাড়া পাহাড় আর অপ্রশস্ত উপত্যকা। এমন দুরূহ জায়গায় কীভাবে তারা প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিল, সে এক রহস্যই বটে।

সিমিগাঁওয়ের একটি শেরপা হোমস্টে। ছবি: লেখক গ্রাম চষে বেড়িয়ে, শুয়ে-বসে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। স্থানীয় লোকজনে বেঞ্চগুলো ভরে উঠতে লাগল। শুরু হলো পানাহার। আড্ডায় সিমিগাঁওয়ের গোড়াপত্তনের গল্পটা জানা গেল। বহুকাল আগে এই গ্রামের জায়গায় ঘন জঙ্গল ছিল। নধর শিকারের খোঁজে এই জঙ্গলে এক শিকারি এসেছিল। তার কাছে ছিল কিছু শুকনো শিমের বীজ। ফিরে যাওয়ার সময় বীজগুলো সে জঙ্গলে ছিটিয়ে দিল। পরের বছর শিকারি এই জায়গায় ফিরে এসে দেখে পুরো জায়গা শিমগাছে ভরে গেছে। সেখান থেকেই এই গ্রামের নাম সিমিগাঁও।

শেরপাদের সঙ্গে আড্ডায় সন্ধ্যাটুকু চমৎকার কাটল। বেশ রাত হয়ে যাওয়ায় বিদায় নিয়ে ফিরলাম দোতলার ঘরে। ভোরে ট্রেক শুরু হবে। গন্তব্য—ডোং ডাং।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     

    বাদল দিনে বাইরে বের হওয়ার আগে

    একটু খিচুড়ি হয়ে যাক আষাঢ়ে

    নোনা ইলিশের মুখরোচক ঝাল রসা

    ফ্রোজেন জলপাই দিয়ে ইলিশের ঝাল

    ইলিশের ভর্তা

    দেশি মিষ্টান্নের স্বাদ

    জামিনে মুক্তি পেলেন যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী পাপিয়া

    অস্ট্রেলিয়াকে অপেক্ষায় রেখে সেমিতে ভারত

    পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারী ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

    যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আগের অবস্থানেই, বেড়েছে প্রচেষ্টা

    ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়ে মালদ্বীপে ১৮ লাখ নতুন পর্যটক, পেছনে পড়ল সেশেলস 

    শরীফার গল্প: জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের মত নিয়ে নতুন গল্প যুক্ত করার নির্দেশ